যজুর্বেদ ২৫.৭ - মলদ্বার ও অন্ধসাপ
মহর্ষি দয়ানন্দ Vs পৌরাণিক সম্প্রদায়
পূষণং বনিষ্ঠুনান্ধাহীন্ত্স্থূলগুদয়া সর্পান্ গুদাভির্বিহ্রুতঽআন্ত্রৈরপো বস্তিনা বৃষণমাণ্ডাভ্যাং বাজিনং শেপেন প্রজাং রেতসা চাষান্ পিত্তেন প্রদরান্ পায়ুনা কূশ্মাঞ্ছকপিণ্ডৈঃ ॥
যজুর্বেদ ২৫.৭
সপদার্থান্বয়: হে মনুষ্যাঃ ! যূয়ং বনিষ্ঠুনা যাচনেন পূষণং পুষ্টিকরং, স্থূলগুদয়াস্থূলয়া গুদয়া সহ বর্ত্তমানানন্ধাহীন্ অন্ধান্ সর্পান্, গুদাভিঃ সহিতান্ বিহ্রুত বিশেষেণ কুটিলান্ সর্পান্ আন্ত্রৈঃ উদরস্থৈর্নাডীবিশেষৈঃ অপঃ জলানি, বস্তিনা নাভেরধোভাগেন বৃষণং বীর্যাধারম্, আণ্ডাভ্যাম্ অণ্ডাকারাভ্যাং বৃষণাবয়বাভ্যাং বাজিনম্ অশ্বং, শেপেন লিঙ্গেন রেতসা বীর্যেণ প্রজাং সন্ততিং, পিত্তেন চাষান্ ভক্ষণানি, প্রদরান্, উদরাবয়বান্ পায়ুনা এতদিন্দ্রিয়েণ শকপিণ্ডৈঃ শক্তেঃ সঙ্ঘাতৈঃ কূশ্মান্ শাসনানি নিগৃহ্ণীত॥
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী ভাষ্য: (পূষণম্) পুষ্টিকরম্ (বনিষ্ঠুনা) যাচনেন ['বনু, যাচনে' ধাতু০ ৮।৮]
(অন্ধাহীন্) অন্ধান্ সর্পান্ (স্থূলগুদয়া) স্থূলয়া গুদয়া সহ (সর্পান্) (গুদাভিঃ) (বিহ্রুতঃ) বিশেষেণ কুটিলান্ (আন্ত্রৈঃ) উদরস্থৈর্নাডীবিশেষৈঃ ['অমিচিমিদিশসিভ্যঃ ক্ত্রঃ' উণা০ ৪।১৬৫; 'অমতি জানাতি প্রাপ্নোতি যেন তৎ অন্ত্রম্' দয়া০ বৃ০]
(অপঃ) জলানি (বস্তিনা) নাভেরধোভাগেন (বৃষণম্) বীর্যাধারম্ (আণ্ডাভ্যাম্) অণ্ডাকারাভ্যাং বৃষণাবয়বাভ্যাম্ (বাজিনম্) অশ্বম্ ['অশূপ্রুষিলটিকণিখটিবিশিভ্যঃ ক্বন্' উণা০ ১।১৫১; 'অশ্নুতে ব্যাপ্নোতীতি অশ্বঃ তুরঙ্গো বহ্নির্বা' দয়া০ বৃ০; 'অশূ, ব্যাপ্তৌ সংঘাতে চ' ধাতু০ ৫।১৮; 'অশ্বম্ = মহান্তম্ = শরীরাত্মনোর্মহদ্বলং' যজু০ ২২।৪ ভাষ্যে দয়া০]
(শেপেন) লিঙ্গেন (প্রজাম্) সন্ততিম্ (রেতসা) বীর্যেণ (চাষান্) ভক্ষণানি (পিত্তেন) (প্রদরান্) উদরাবয়বান্ (পায়ুনা) এতদিন্দ্রিয়েণ (কূশ্মান্) শাসনানি । অত্র কশধাতোর্মক্প্রত্যযোঽন্যেষামপীতি দীর্ঘশ্চ ['কসি, গতিশাসনয়োঃ' ধাতু০ ২।১৪]
(শকপিণ্ডৈঃ) শক্তেঃ ['শক্লৃ, শক্তৌ' ধাতু০ ৫।১৬] সঙ্ঘাতৈঃ।
বাংলা সরলীকৃত অনুবাদ: হে মানবগণ! তোমরা
১.(বনিষ্ঠুনা) যাচনা দ্বারা (পূষণম্) পুষ্টিদানকারীকে,
২. (স্থূলগুদয়া) স্থূলগুদার সাথে বর্তমান (অন্ধাহীন্ = অন্ধ-অহীন্) অন্ধ-সর্পসদৃশ অন্ত্রকে,
৩. (গুদাভিঃ) গুদার সাথে(বিহ্রুতঃ সর্পান্) বিশেষ কুটিল সর্পসদৃশ ক্ষুদ্রান্ত্রকে,
৪. (আন্ত্রৈঃ) উদরের নাড়ি বিশেষ দ্বারা (অপঃ) জলকে,
৫. (বস্তিনা) নাভির অধোভাগে বিদ্যমান বস্তি বা মূত্রাশয় দ্বারা (বৃষণম্) বীর্যধার-বর্ষক লিঙ্গকে,
৬. (আণ্ডাভ্যাম্) ডিম্বাকার অবয়বযুক্ত অণ্ডকোষদ্বয় দ্বারা (বাজিনম্) অশ্বতুল্য শক্তিশালী বেগবান প্রজননশক্তিকে,
৭. (শেপেন) লিঙ্গ ও (রেতসা) বীর্য দ্বারা (প্রজাম্) সন্তানকে,
৮. (পিত্তেন) পিত্ত দ্বারা (চাষান্) ভোজন বা খাদ্যবস্তু,
৯.(প্রদরান্) উদরের অঙ্গকে (পায়ুনা) পায়ু=গুদেন্দ্রিয়কে
এবং
১০. (শকপিণ্ডৈঃ) শক্তিদ্বারা (কূশ্মান্) শাসনকে - গ্রহণ করো।

এই মন্ত্রে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও পদার্থকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং একটি পরস্পরনির্ভর জৈব-ব্যবস্থা (integrated biological system) হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানে পুষ্টিদানকারী শক্তি, অন্ত্র, জল, মূত্রাশয়, প্রজননাঙ্গ, বীর্য, পিত্ত ও শক্তি - সবকিছু একটি ধারাবাহিক কার্যকারণ সম্পর্কে আবদ্ধ। প্রথমে পুষ্টি ও খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে অন্ত্রে শক্তি প্রবেশ করে; অন্ত্র ও নাড়ির মাধ্যমে জল ও পুষ্টি শোষিত হয়ে দেহের বিপাকক্রিয়া সক্রিয় হয়। পিত্ত খাদ্যকে হজমযোগ্য করে তোলে, ফলে শক্তি উৎপন্ন হয় এবং অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য গুদেন্দ্রিয় তথা পায়ুর মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়। এই বিপাকজাত শক্তি মূত্রাশয় ও প্রজননাঙ্গের কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করে, যার ফলে বীর্য উৎপাদন ও প্রজননক্ষমতা বজায় থাকে এবং শেষ পর্যন্ত সন্তানের জন্ম সম্ভব হয়। অর্থাৎ,
খাদ্য→জল→অন্ত্র→বিপাক→শক্তি→প্রজনন ~ এই সমগ্র প্রক্রিয়াটি একটি যুক্তিসংগত শারীরবৃত্তীয় চক্র, যেখানে কোনো একটি অঙ্গ বা পদার্থ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সবই সমন্বিতভাবে মানবজীবন, শক্তি ও সামাজিক ধারাবাহিকতা (শাসন ও প্রজা) রক্ষা করে।
সারার্থদর্শিনী: এই মন্ত্র ও ভাষ্যে ['উদরস্থৈর্নাডীবিশেষৈঃ'] মূলত ২ প্রকার অন্ত্রের উল্লেখ করা হয়েছে। যথা:
১. দীর্ঘ, কুটিল অন্ত্র যা খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে। এটি ক্ষুদ্রান্ত্র।
২. বড়, অন্ধ অন্ত্র যার ৩টি ভাগের [Cecum, colon, rectum → anal canal] ১ম ভাগ ইংরেজিতে যাকে Cecum বলা হয়।
Cecum শব্দটি ল্যাটিন Caecum থেকে এসেছে যার অর্থ Blind intestine, অর্থাৎ 'blind gut' বা 'cul de sac'। বেদে বর্ণিত 'অন্ধ' থেকেই এই অর্থ পরবর্তী সভ্যতায় প্রবাহিত হয়েছে।
৩. মন্ত্রে 'স্থূলগুদয়া' একবচন এবং 'গুদাভিঃ' বহুবচন। কারণ বৃহদান্ত্র থেকে ক্ষুদ্রান্ত্র দৈর্ঘ্যে বৃহৎ, আবার ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে বৃহদান্ত্র প্রস্থে বৃহত্তর। এ কারণে ক্ষুদ্রান্ত্রের অংশ ৩টি পৃথকভাবে দর্শনীয় ও আপাত বহুসর্পাকৃতি।
পূর্বপক্ষ: অন্ধ সর্প ইত্যাদিকে পরিপাকতন্ত্রের নাড়ী করা স্বেচ্ছাচার ও দয়ানন্দ বিরদ্ধ।
উত্তরপক্ষ: মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী মন্ত্রভাষ্যের পদার্থে 'উদরস্থৈর্নাডীবিশেষৈঃ' এবং ভাবার্থে 'যেন যেন যদ্যৎকার্যং সিধ্যেৎ, তেন তেনাঙ্গেন পদার্থেন বা তৎ তৎ সাধনীয়ম্' দ্বারা স্বয়ং স্পষ্ট করেছেন এখানে মানবীয় অঙ্গের অর্থাৎ শারীরকথা বর্ণনা করা হয়েছে।
পূর্বপক্ষ: আধুনিক আর্যগণ নিজের আচার্যের ভাষ্যের শ্লীলতা রক্ষায় এই ব্যাখ্যা তৈরি করেনি তার কী প্রমাণ ?
উত্তরপক্ষ: যে দার্শনিক গোষ্ঠীর আচার্যদের সিদ্ধান্ত-পরম্পরা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নেই তা নিয়ে কথা বলাটা শিশুসুলভ আচরণ ও মূর্খতা। পাঞ্জাব আর্যপ্রতিনিধিসভা প্রধান বেদ-উপনিষদ-ভাষ্যকার পণ্ডিত শিবশঙ্কর শর্মা আর্যোপদেশক স্বীয় 'সত্যার্থ-নির্ণয়',
পণ্ডিত বুদ্ধদেব মীরপুরী স্বীয় খণ্ডনমণ্ডন গ্রন্থামালায় করেছেন যখন কিনা পূর্বপক্ষের মানবজন্মও হয়নি।
পূর্বপক্ষ: আর্য বিদ্বানদের অনেকেই বলেন এখানে সর্প=সাপ ধরে তাদের পেটের দিক থেকে বা পেছন দিক থেকে ধরার কথা বলা হয়েছে।
উত্তরপক্ষ: এতে আপনার নিজের পক্ষ সমর্থন হয় কী ? যদি আর্য বিদ্বানগণ উক্ত অর্থ নিয়েও থাকেন তাতেও আমাদেরই সমর্থনে আসে এবং পূর্বপক্ষের কল্পিত অশ্লীল অর্থ করার অভিযোগের খণ্ডন হয়।
পূর্বপক্ষ: দয়ানন্দ সরস্বতী এখানে অন্ধসাপকে স্থূলগুদা ও সাধারণ সাপকে গুদা দ্বারা 'নিগৃহ্ণীত' = গ্রহণ করতে = ঢোকাতে বলেছেন।
উত্তরপক্ষ: প্রথমত, মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী 'নিগৃহ্ণীত' এর গ্রহণ করতে বলেছেন। এখানে 'ঢোকাও' এই ধরনের অর্থ করা পূর্বপক্ষের অসভ্য ইতর মনোভাব এবং পরম্পরাগত অশ্বশিশ্নজাত হওয়ার পরিচয়পত্র প্রদান করে।
দ্বিতীয়ত, 'নিগৃহ্ণীত' শব্দ 'নি' উপসর্গপূর্বক 'গ্রহ' ধাতু দ্বারা গঠিত, যার ধাত্বর্থক ['গ্রহ উপাদানে' ধাতু০ ৯।৬৪] অর্থ, গ্রহণ করা, স্বীকার করা। অর্থাৎ এখানে মহর্ষি কৃত ভাবার্থ অনুযায়ী, উক্ত অঙ্গ বা পদার্থসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান গ্রহণ তথা স্বীকার্যতার অর্থই সুস্পষ্ট। 'ঢোকানো/প্রবেশ করানো' জাতীয় প্রসঙ্গের বিন্দুমাত্র কোনো চিহ্নই নেই। আর যদি তা ঢোকানোই বুঝাবে তবে 'বীর্য দ্বারা সন্তানকে, পিত্ত দ্বারা ভোজকে...' ইত্যাদি অংশের কীভাবে ব্যাখ্যা হবে? অর্থাৎ আপনার আরোপ যে সর্বৈব মিথ্যা তা প্রমাণিত।
তৃতীয়ত, মহর্ষি দয়ানন্দ অন্বয়ে লিখেছেন 'গুদয়া সহ বর্ত্তমানানন্ধাহীন্' অর্থাৎ গুদাভাগের সাথে বর্তমান অন্ধ-অহিসমূহ = বৃহদান্ত্রের সাথে বিদ্যমান। সুতরাং যা পূর্বেই বিদ্যমান তা পুনরায় ধরার (পূর্বপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী) প্রশ্নই ওঠে না। বরং কেবল ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্রই হতে পারে।
চতুর্থত, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্রের পরে মূত্রাশয়, অণ্ডকোষ, বীর্য, পিত্ত দ্বারা মানবীয় শারীরবিদ্যার জ্ঞানেরই প্রকাশ ঘটে।

অদ্বৈতবাদীদের পরমমান্য গোবর্ধনমঠপুরীপীঠাধীশ্বর শঙ্করাচার্য নিশ্চলানন্দ সরস্বতী মহাভাগের গুরুদেব করপাত্র মহারাজ নিজের 'বাজসনেয়ি-মাধ্যন্দিন-শুক্লযজুর্বেদ-সংহিতা'-র 'করপাত্র ভাষ্য'-এ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর ভাষ্যে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর এই গুঢ়ার্থ মাহাত্ম্য ব্যাখ্যাকে 'নিরর্থকিত্বা... বালভাষিতমেব' = নিরর্থক ও বাচ্চাদের কথাবার্তা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

করপাত্র ভাষ্যের শুরুতে পূর্ব গোবর্ধনমঠপুরীপীঠাধীশ্বর শ্রী নিরঞ্জনদেব তীর্থ
'সায়ণাচার্যপাদেন মহীধরবুধেন চ ॥৮॥' অর্থাৎ সায়ণ, মহীধরের ভাষ্যকেই সমর্থন করেছেন এবং
তাদের ভাষ্যসহ করপাত্রভাষ্যকেও 'অত্র সর্বোঽপি বেদার্থঃ সমীচীন উদীরিতঃ ॥১৭॥' বলে সম্পূর্ণ সমর্থন করেছেন। সেজন্য, মহীধর-উবট এবং তাদের অনুগামী করপাত্র প্রভৃতি ব্যক্তিদের স্বীকৃত ব্যাখ্যা কী তা জেনে নেওয়া আবশ্যক।
উবটভাষ্য: বনতি সম্ভজতি বনিষ্ঠুঃ স্থূলান্ত্রং তেন পূষণং দেবং প্রীণামি । 'গুদং ত্বপানং পায়ুর্না' ইত্যমরঃ । স্ত্রীত্বং ছান্দসম্ । স্থূলা চাসৌ গুদা চ স্থূলগুদা তয়া গুদস্য স্থূলভাগেন অন্ধাহীন্প্রীণামি । অন্ধাশ্চ তে অহয়শ্চ সর্পাস্তান সর্পান্ গুদাভিঃ স্থূলগুদাতিরিক্তৈর্গুদভাগৈঃ সর্পান্ প্রীণামি । বিহ্রুত আন্ত্রৈঃ 'অন্ত্রং পুরীতৎ' ইত্যমরঃ । 'অম্ গতৌ ভজনে শব্দে' অমতি ভজত্যনেনান্নমিত্যন্ত্রম্ অন্ত্রে ভবা
আন্ত্রাঃ অন্ত্রসম্বন্ধিনো মাংসভাগাঃ তৈর্বিহ্রুতো দেবান্প্রীণামি । অপো বস্তিনা 'বস্তির্নাভেরধো দ্বয়োঃ' ইত্যমরঃ । বসতি মূত্রং যস্মিন্ স বস্তিঃ নাভেরধো বর্তমানং মূত্রপুটং তেনাপো দেবতাঃ প্রীণামি । 'মুষ্কোঽণ্ডো বৃষণঃ কোশঃ' অণ্ড এবাণ্ডঃ তাভ্যাং লিঙ্গোভয়পার্শ্বস্থাভ্যাং মাংসপিণ্ডাভ্যাং বৃষণং দেবং প্রীণামি । শেপো লিঙ্গং তেন বাজিনং দেবং প্রীণামি । 'শিশ্নো মেঢ্রো মেহনশেফসী' ইত্যমরঃ । 'শি নিশানে' শিনোতি ভগমিতি শেপঃ সান্তোঽদন্তশ্চ । প্রজাং রেতসা 'শুক্রং তেজোরেতসী চ বীজবীর্যেন্দ্রিয়াণি চ' ইত্যমরঃ । 'রীঙ্ স্রবণে' রিয়তে স্রবতি রেতো বীর্যং তেন প্রজাদেবতাং প্রীণামি । মায়ুঃ পিত্তং । পততি স্রংসতে পিত্তং ধাতুবিশেষস্তেন চাষান্ দেবান্ প্রীণামি। পাতি মলোৎসর্গমিতি পায়ুর্গুদমুক্তাতিরিক্তং তেন গুদতৃতীয়ভাগেন প্রদরান্দেবান্প্রীণামি । কূশ্মান্ শকপিণ্ডৈঃ । 'শকো দেশে নৃপে বিশি' । বিশি বিষ্ঠায়াং শকস্য বিষ্ঠায়াঃ পিণ্ডৈঃ কূষ্মান্ দেবান্ প্রীণামি ॥
মহীধরভাষ্য: সম্পূর্ণ উবটভাষ্যের অনুকরণ।
করপাত্রভাষ্য: মহীধর ও উবটভাষ্যের চৌর্যবৃত্তিরূপ অনুকরণ।
সায়ণভাষ্য: [মাধ্যন্দিন শাখাতে সায়ণভাষ্য নেই, এই মন্ত্রটি কাণ্বশাখায় (২৭।১১) পাওয়া যায়। তাৎপর্য ও ভাষ্য শব্দভেদ হলেও অর্থভেদ নেই] যথা: পূষণং...আণ্ডাভ্যাম্ অশ্বসম্বন্ধিমুষ্কাভ্যাং প্রীণয়ামি...শেফেন মেঢ্রেণ প্রীণয়ামি...পায়ুনা মলবিশ্লেষণদ্বারেন...অশ্বশকৃৎপিণ্ডৈঃ প্রীণয়ামি।
দিলীপ কুমার পৌরাণিকোত্তম-কৃত অনুবাদ (অক্ষয় লাইব্রেরী): পূষা দেবতাকে অশ্বের বৃহৎ অন্ত্রের দ্বারা প্রীণিত করছি। অন্ধাহি (অর্থাৎ অন্ধসর্প) দেবতাকে স্থূল, পায়ুস্থানের দ্বারা প্রীণিত করছি। পায়ুভাগের মাংসের দ্বারা বিহ্রুত নামক দেবতাকে প্রীণিত করছি। বস্তির (বা মূত্রস্থলীর) দ্বারা আপঃ দেবতাকে প্রীণিত করছি। অণ্ডকোষের দ্বারা বৃষণ দেবতাকে প্রীণিত করছি। অশ্বলিঙ্গের দ্বারা অশ্বদেবতাকে প্রণীতি করছি। প্রজাদেবতাকে অশ্ববীর্যের দ্বারা প্রীণিত করছি। চাষ নামক দেবতাকে পিত্তের দ্বারা প্রীণিত করছি। পায়ুস্থানের তৃতীয় ভাগের দ্বারা প্রদর দেবতাকে প্রীণিত করছি এবং বিষ্ঠাপিণ্ডের দ্বারা কূষ্মান নামক দেবতাকে প্রীণিত করছি।
রামকৃষ্ণ মিশন অব কালচারাল ইইনস্টিটিউট-কৃত অনুবাদ: অশ্বের স্থূলান্ত্রের দ্বারা পূষাদেবতাকে প্রীত করছি। গুদের স্থূলভাগ দিয়ে অন্ধ সর্পদের প্রীতি সম্পাদন করছি। গুদের স্থূলাতিরিক্ত অংশ সর্পদের প্রীতিসাধন করছি। অন্ত্রের মাংসভাগের দ্বারা বিহ্রুত দেবগণের প্রীতি সম্পাদন করছি। নাভির অধোভাগে বর্তমান মূত্রপুটের বা মূত্রস্থলীর দ্বারা জলের দেবতাদের প্রীত করছি। লিঙ্গের উভয় পার্শ্বে অবস্থিত মাংসপিণ্ডরূপ অণ্ডকোষের দ্বারা বৃষণদেবকে প্রীত করছি। লিঙ্গের দ্বারা অশ্বদেবতার তৃপ্তি সম্পাদন করছি। বীর্যের দ্বারা প্রজাদেবতার প্রীতি সুসম্পন্ন করছি। পিত্তরূপ ধাতুবিশেষের দ্বারা চাষদেবতাদের প্রীত করছি। পায়ুর তৃতীয়ভাগ দিয়ে প্রদরদেবতাদের প্রীতি সুসম্পন্ন করছি। বিষ্ঠার পিণ্ডের দ্বারা কূষ্মদেবগণের প্রীতিসাধন করছি।

বলা বাহুল্য, করপাত্র-ভাষ্য একই ধারার অনুবাদ। পণ্ডিত জ্বালাপ্রসাদ মিশ্রের 'মিশ্রভাষ্য' কিংবা শ্রী সত্যব্রত সামশ্রমি ভট্টাচার্য, রামস্বরূপ শর্মা, শ্রী বিজনবিহারী গোস্বামী, ড. রেখা ব্যাস প্রভৃতির অনুবাদ একই রকম। অর্থাৎ সকলেই সায়ণ-মহীধর-উবটের অন্ধানুসারী। অরূপসমৃদ্ধ বিনিয়োগের অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি। স্থানাভাবভয়ে পুনরায় উল্লেখ করা হলো না।

লক্ষ্যণীয় বিষয়, পৌরাণিকদের মত অনুযায়ী, এই মন্ত্রের মাধ্যমে,

প্রথমে ঘোড়াকে হত্যা করতে হবে এরপর, তার অঙ্গ অগ্নিতে নানা দেবতার উদ্দেশ্যে আহুতি দিতে হবে যারা সেগুলো খেয়ে তৃপ্তি লাভ করবেন তথা পৌরাণিকরা তাদের প্রীতিসাধন=খুশি করবে। কাদের কী কী দেওয়া হবে সায়ণ-মহীধর-উবটাচার্যের অনুসারীদের মতে দেখি-
১. ঘোড়ার বৃহদান্ত্র দিয়ে পূষা দেবতাকে খুশি করবে।
২. ঘোড়ার পায়ুভাগের স্থূলভাগের মাংস দিয়ে অন্ধ সাপদের খু্শি করবে।
৩. ঘোড়ার পায়ুভাগের স্থূলভাগের অতিরিক্ত অংশের মাংস দিয়ে সাপদের খুশি করবে।
৪. ঘোড়ার অন্ত্রের মাংস দিয়ে বিহ্রুত দেবতাকে খুশি করবে।
৫. ঘোড়ার মূত্রথলি দিয়ে জল দেবতাদের খুশি করবে।
৬. ঘোড়ার ২টি অণ্ডকোষ দিয়ে বৃষণ দেবতাকে খুশি করবে।
৭. ঘোড়ার লিঙ্গ দিয়ে অশ্ব দেবতাকে খুশি করবে।
৮. ঘোড়ার বীর্য দ্বারা প্রজা দেবতাকে খুশি করবে।
৯. ঘোড়ার পিত্ত দ্বারা চাষ দেবতাদের খুশি করবে।
১০. ঘোড়ার পায়ুর ৩য় ভাগ দিয়ে প্রদর দেবতাদের খুশি করবে।
১১. ঘোড়ার মল = বিষ্ঠা = পায়খানা দিয়ে কূষ্ম দেবতাদের খুশি করবে।

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ!
কোথায় মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর করা শারীরবিদ্যার বিজ্ঞানসংক্রান্ত মন্ত্রার্থ আর
কোথায় সায়ণ-মহীধর-উবট ও তাদের অন্ধানুসারীদের ঘোড়ার মল-পিত্ত, লিঙ্গ, পশ্চাতের মাংস, মূত্রথলি, অণ্ডকোষ খাওয়া দেবতাবৃন্দ। যাদের উপাস্যের চরিত্রই এসব নির্বিবাদে আহার করা তাদের যে সদুপদেশ আর ভালো ভাষ্য রুচিসম্মত মনে হবে না এবং সেখানেও অশ্লীলতা দেখবে এটাই তো স্বাভাবিক। যাদের উপাস্যের কাজ হলো মল-মূত্র খাওয়া সেসব পৌরাণিক ভক্তকুল যে মহর্ষির ভাষ্য থেকে শারীরবিদ্যার বদলে এসব অপপ্রচার নিজের কল্পনার মাধ্যমে বের করবে তা আর বিচিত্র কী! আসুন তাদের জন্য পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি তাদের সন্মার্গে নিয়ে যান।
ইত্যোম্
0 মন্তব্য(গুলি)