শ্রুতিশাস্ত্র গুরু পরম্পরায় অধ্যয়নের পর মহাভারোত্তর যুগে যখন এই পরম্পরা বিনষ্ট হয়ে গিয়ে স্বীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক তথাকথিত পরম্পরা তৈরি হলো, তখন অনেক ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি হয়। তার মধ্যে একটি হলো, পূর্বাপর প্রসঙ্গ ও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা ত্যাগ করে নিজের ইচ্ছে মতো ব্যাখ্যা প্রস্তুত করা। আবার প্রস্থানত্রয়ীর (উপনিষদ্-গীতা-ব্রহ্মসূত্র) ভাষ্য করার সময় দেখা যায়, অধিকাংশ সম্প্রদায়কর্তা ও মুখ্য অনুসারীগণ নিজেদের সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠায় যে সকল শাস্ত্রবাক্য প্রয়োজন সেগুলো বাদে অন্য স্থানে বিশেষ ব্যাখ্যা করেননি কিংবা করলেও সবার ভাষ্যই প্রায় একই অর্থাৎ কেউ বিশেষ ব্যাখ্যার আবশ্যকতা আছে বলে মনে করেননি। ফলে অনেক স্থান রয়েছে যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্যাখ্যা অস্পষ্ট বা প্রকৃত স্বাধ্যায়ীর জন্য সন্তোষজনক নয়।
এমনই একটি শ্রুতি হলো বৃহদারণ্যক উপনিষদের ২য় অধ্যায়ের ৪র্থ ব্রাহ্মণের ১০ম কণ্ডিকা, অনুরূপ ৪।৫।১১। বহু বিজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে এই কণ্ডিকাতে পুরাণ ঈশ্বরের নিঃশ্বাসের মতো অর্থাৎ অপৌরুষেয় (বা বলা যায় ঈশ্বরসৃষ্ট) বলা দেখাতে চান। আলোচ্য কণ্ডিকাটি নিম্নরূপ -
স যথার্দ্রৈধাগ্নেরভ্যাহিতাৎপৃথগ্ধূমা বিনিশ্চরন্ত্যেব বা অরেঽস্য মহতো ভূতস্য নিঃশ্বসিতমেতদ্যদৃগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোঽথর্বাঙ্গিরস ইতিহাসঃ পুরাণং বিদ্যা উপনিষদঃ শ্লোকাঃ সূত্রাণ্যনুব্যাখ্যানানি ব্যাখ্যাননি ।
অস্যৈবৈতানি নিশ্বসিতানি ॥
সরলভাবে যদি আমরা পড়ি, তবে শ্রুতির অর্থ,
যেভাবে ভেজা ইন্ধনে অগ্নি সংযুক্ত হলে ধোঁয়া নির্গত হয় সেভাবেই পরমেশ্বর থেকে -(১) ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদএই (১)-এর অন্তর্গত হলো -(২) ইতিহাস(৩) পুরাণ(৪) বিদ্যা(৫) উপনিষদ্(৬) শ্লোক(৭) সূত্র(৮) ব্যাখ্যান(৯) অনুব্যাখ্যানমহাভূত থেকে বের হয়েছে, এগুলো তাঁরই নিঃশ্বাস।
স্বাভাবিকভাবে প্রথম পাঠে মনে হবে তাহলে এসবই যেহেতু নিঃশ্বাস তাহলে সবই ব্রহ্মোক্ত অর্থাৎ অপৌরুষেয়। বিবেচ্য বিষয় হলো তবে কি পরমাত্মাও জীবের ন্যায় নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের উপর নির্ভরশীল ? পাশাপাশি এখানে বেশ কিছু সন্দেহ তৈরি হয়-
১। এখানে পুরাণং একবচন, কিন্তু আমরা জানি পুরাণ ১৮টি। আবার উপপুরাণ ১৮টি। তাহলে ৩৬টি পুরাণ থাকা সত্ত্বেও একবচনে প্রয়োগ হলো কেন ? কারণ প্রকৃতপক্ষে এখানে নিত্য-সংবাদ অভিপ্রেত।
২। কেউ যদি বলেন যে আদিতে ৪ লক্ষ শ্লোকের একটি পুরাণ ছিলো পরে তা ১৮ ভাগ হয়েছে তাহলে শ্রী নারদ মুনির বেদব্যাসকে ভাগবত লিখতে (ভা০ ১।৪-৫) বলার কী কারণ ? কারণ গ্রন্থ থেকে আগে থেকেই একটিই ছিলো। আবার বিষ্ণুপুরাণের কর্তা (বি০পু০ ৩।৭।১৯-২০) হিসেবে লিঙ্গপুরাণে (১।৬৪।২১-২২) পরাশর মুনির নাম রয়েছে। অন্যদিকে যদি শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ বেদব্যাস নারদ মুনির পরামর্শে লিখে থাকেন তবে ভাগবতের উল্লেখ-মাহাত্ম্য স্কন্দপুরাণ (৭।১।২।৫-৯) ও পদ্মপুরাণে (৬।১৯৩-১৯৮) কীভাবে এল ? বেদব্যাস না জেনেই মাহাত্ম্য লিখলেন? লিখলে ভুলে গিয়ে আবার নারদের কাছে স্মরণ করেছেন ? স্মৃতিভ্রংশ হওয়া 'অবতার' বা 'ঋষি'-র বৈশিষ্ট্য ?
৩। কণ্ডিকায় ইতিহাস পদটিও একবচনে রয়েছে। অথচ কেউ কেউ এখানে রামায়ণ-মহাভারত অর্থ করতে চান। কোন যুক্তিতে? আর রামায়ণ-মহাভারতের সম্পূর্ণ প্রামাণিক তারা কোন সংস্করণ মানেন? যদি না মানেন, তাহলে কি তারা এটা মানেন যে 'ঈশ্বরের নিঃশ্বাস এই গ্রন্থ' সবই বর্তমানে বিকৃত অবস্থায় আছেন ? যদিও তারা এই যুক্তি সমর্থনে 'বেদবিকৃত' এই বক্তব্য প্রদান করেন তবুও আমরা এই 'নাস্তিক্য'ভাব প্রদর্শনে বিশেষ অবাক হবো না। একই কথা শ্লোকের বেলাতেও প্রযোজ্য৷ মনুস্মৃতির বাক্য যেমন শ্লোক, কিন্তু এটা যে শ্রুতিসম না তা মনুস্মৃতির ১২।৯৪-৯৬, পূর্বোত্তর মীমাংসার স্মৃত্যাধিকরণেই (পূ০ ১.৩.৩) সুস্পষ্ট।
৪। সূত্র বলতে কল্পসূত্রকে বোঝালে কল্পসূত্র সুস্পষ্ট পৌরুষেয় (পূ০ মী০ ১.৩.১২) গ্রন্থ। আবার যদি ৬ দর্শনকে বোঝায় তবে দর্শনের প্রণেতা একেকজন ঋষি। এটাও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নয়। আবার ব্যাখ্যান-অনুব্যাখ্যান নামে আলাদা কোনো গ্রন্থ নেই। যদি গ্রন্থ না থাকলে তাহলে এখানে অর্থ কী রইলো ? আমি ইতিহাস-পুরাণের বেলায় রামায়ণ, মহাভারত, ১৮ পুরাণ ধরবো কিন্তু বাকিগুলো কেবল অনুমানে রাখবো এটা হতে পারে না।
১। ইতিহাস বলতে বোঝায় সেই আখ্যান বা কাহিনী, যা বেদে ইতিহাসাত্মক শৈলীতে উপস্থাপিত হয়েছে। নিরুক্তকার যেমন বৃষ্টিসূক্ত (ঋ০ ১০।৯৮)-তে দেবাপি-শন্তনুর ইতিহাস, নদী-সূক্ত (ঋ০ ৩।৩৩) বিশ্বামিত্র ও মুদগলের ইতিহাস উল্লেখ করেছেন। এগুলোর ভাষাশৈলী ইতিহাসের মতো হলেও বেদোত্তর যুগের কোনো ঘটনার সরাসরি বিবরণ নয়। যেমন শন্তনু মানে শান্ত তনু যার, বিশ্বামিত্র মানে যিনি বিশ্বের সকলের মিত্রস্বরূপ ইত্যাদি। নিরুক্তকার (২।১৬) যেখানে ইতিহাসের কথা বলেন, সেখানে ইতিহাস হলো এক ধরনের বর্ণনাশৈলী, বাস্তব ইতিহাস নয়। শুনঃশেপ (ঋ০ ১।২৪-৩০), ইন্দ্র-অহি (ঋ০ ১।৩২), দধীচি (ঋ০ ১।৮৪।১৩-১৪), কূপপতিত ত্রিত (ঋ০ ১।১০৫।১৭), অশ্বিদেবদ্বয় (ঋ০ ১।১১৬), অপালা (ঋ০ ৮।৮০), সুবন্ধু (ঋ০ ১০।৫৭-৬০), দ্রুঘণ (ঋ০ ১০।১০২), বিশ্বকর্মা (ঋ০ ১০।৮১)।
২। পুরাণ অর্থে সায়ণাচার্যের মতে, পুরাণ মানে সৃষ্টি বা জগতের আদি অবস্থা বর্ণনাকারী প্রসঙ্গ। যদিও তার বক্তব্য আমাদের আদরণীয় নয় সর্বত্র তবে এইস্থলে যুক্তিগতভাবেই প্রাচীনকালে বেদের মধ্যেই এ অর্থে ‘পুরাণ’ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন: ঋগ্বেদের অদিতি সূক্ত (১০.৭২), বিশ্বকর্মা সূক্ত (১০.৮১-৮২), পুরুষসূক্ত (১০.৯০), হিরণ্যগর্ভ সূক্ত (১০.১২১), নাসদীয় সূক্ত (১০.১২৯), ভাববৃত্ত সূক্ত (১০.১৯০) ইত্যাদি।
৩৷ বিদ্যা কী ? বেদ সকল সত্যবিদ্যার গ্রন্থ। সুতরাং যেখানে বিভিন্ন শাস্ত্র ও বিদ্যার প্রতিপাদন রয়েছে, তাকে বিদ্যা বলা হয়েছে। যেমন: আয়ুর্বিদ্যা, ধনুর্বিদ্যা, কৃষি, ব্যবসা, পশুপালন, অর্থনীতি, গণিত, নক্ষত্রবিদ্যা, অণু-পরমাণুবিদ্যা ইত্যাদি।
৪। উপনিষদ্ বেদের রহস্যময় ব্রহ্মবিদ্যা সম্পর্কিত অংশ। যজুর্বেদের চল্লিশতম অধ্যায় ঈশোপনিষদ্ নামে সর্বাধিক পরিচিত। আবার পুরুষসূক্ত (ঋ০ ১০।৯০) , কেনসূক্ত (অথর্ব০ ১০।২) , স্কম্ভসূক্ত (অথর্ববেদ ১০।৭) প্রভৃতি অংশও উপনিষদ্ বলে গণ্য হয়েছে। কাত্যায়নী সর্বানুক্রমণীতে ঋগ্বেদের রোগনাশিনী (১.৫০.১১-১৩), বিষনাশিনী (১.১৯১), গর্ভস্রাবিণী (৫.৭৮.৫-৯), প্রস্বাপিনী (৭.৫৫.১-৮), সপত্নীবাধন (১০.১৪৫) প্রভৃতি বিশেষ উপনিষদের নামও পাওয়া যায়।
৫। শ্লোক কী ? সাধারণত লৌকিক সংস্কৃতের পদ্যকে শ্লোক বলা হয়। বেদের ছন্দোবদ্ধ মন্ত্রকে ‘মন্ত্র’ বলা হলেও কোনো কোনো বিশেষ আকর্ষণীয় স্তোত্রকে শ্লোকও বলা হয়েছে। যেমন, ঋ০ ৪।২৩।৮-১০, ঋ০ ১০।৮৯।১০, পাবমানী স্তুতি সাম০ ১২৯৮-১৩০৩। উদাহরণস্বরূপ ঋগ্বেদ ১।১৬৪।১২-কে প্রশ্নোপনিষদে শ্লোক বলেছে বা শতপথ ব্রাহ্মণে (১৪.৭.২) যজুর্বেদের 'অন্ধন্তমঃ প্রবিশান্তি' মন্ত্রকে, 'অসূর্যা নাম তে লোকাঃ' মন্ত্রকে (১৪.৭.২.১৩-১৪) প্রভৃতি ২১টি শ্রুতিকে শ্লোক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। নিঘণ্টুতে (১।১১) মন্ত্রের সমার্থক শব্দ হিসেবে 'শ্লোক' উল্লেখ থাকলেও তা লৌকিক শ্লোক নয়।
৬। সূত্র: যে মন্ত্র কেবল ইঙ্গিত বা সূত্ররূপে কোনো বিষয় বলে যায়, কিন্তু যার পূর্ণার্থ প্রামাণিক ভাষ্য-ব্যাখ্যা ছাড়া বোঝা যায় না, তাকে সূত্র বলা হয়। যেমন, অথর্ববেদের (২০.১২৭-১৩২) কুন্তাপ সূক্ত, ঋগ্বেদের (১.৩২.১) ইন্দ্র-অহি যুদ্ধের প্রসঙ্গ।
৭। অনুব্যাখ্যান: সূত্ররূপে উল্লিখিত কোনো বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা যদি পরবর্তী মন্ত্রে পাওয়া যায়, তবে সেটিই অনুব্যাখ্যান। যেমন, নাসদীয় সূক্তে (ঋ০ ১০.১২৯) প্রথম মন্ত্রে প্রলয়ের সূত্র, আর পরবর্তী মন্ত্রগুলোতে সৃষ্টির বিশদ বিবরণ; ঋ০ ১।৩২।১-তে ইন্দ্র দ্বারা অহির বধ ও পরের মন্ত্রগুলোতে তার বিশদ বর্ণনা।
৮। ব্যাখ্যান: যেখানে একটি পূর্ণ সূক্ত বা অধ্যায় ধরে কোনো বিষয়কে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, সেটাই ব্যাখ্যান। যেমন—ঋগ্বেদের অগ্নি, ইন্দ্র বা অশ্বিনৌ সূক্তে তাদের কার্য ও মাহাত্ম্যের ব্যাখ্যা।
শঙ্কা: যদি যাজ্ঞবল্ক্য মুনির উদ্দেশ্য কেবল চার বেদকেই পরমেশ্বরের নিশ্বাসরূপ ঘোষণা করা হতো, তবে তিনি সরাসরি চার বেদের নামই উল্লেখ করতেন। তাতে ইতিহাস, পুরাণ বা অন্যান্য বিদ্যার প্রকরণ স্বতঃসিদ্ধভাবেই গৃহীত হয়ে যেত।
উত্তর: যাজ্ঞবল্ক্য মুনি অবশ্যই এ সত্য জানতেন যে, চার বেদের নামোল্লেখ করলে তৎসঙ্গে বর্ণিত সমস্ত বিষয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তথাপি তিনি আলাদাভাবে ইতিহাস, পুরাণ, বিদ্যা, উপনিষদ্, শ্লোক, সূত্র, অনুব্যাখ্যান ও ব্যাখ্যানের উল্লেখ করেছেন। এর কারণ, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে এই ভিন্ন ভিন্ন শৈলীই বেদের প্রাণভূত অংশ। এই শৈলীগুলি না বুঝে বেদার্থ বোঝা যায় না।
শুধু ইতিহাসাত্মক শৈলী অগ্রাহ্য করার ফলেই আমরা বহুবার ভ্রান্ত হয়েছি। বেদের আখ্যানকে উপেক্ষা করে উত্তরকালীন ইতিহাসকে বেদের উপর চাপিয়ে দিয়েছি। এখন প্রশ্ন, যদি ইতিহাস, পুরাণ প্রভৃতি আটটি শৈলীকে আমরা উপেক্ষা করি, তবে ফল কত ভয়ংকর হবে! বেদে ‘পুরাণ’ শব্দ দেখামাত্রই আমরা সোজা অষ্টাদশ পুরাণে চলে যাই; অথচ বেদ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পুরাণের উপর নির্ভর করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা পুরাণ বেদোত্তর সাহিত্য, তাই বেদ থেকে পুরাণে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু পুরাণ থেকে বেদে ফিরে আসা যুক্তিযুক্ত নয়।
এই বিষয়ে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর চতুর্বেদ গ্রন্থের বিষয়সূচিতে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে বেদে নানাবিধ বিদ্যার উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু আমরা চাই না বেদের অন্তর্গত সেই বিদ্যাগুলিকে প্রত্যক্ষ করতে। বেদের উপনিষদাত্মক শৈলী উপলব্ধি করতে পারলে বেদের অনেক রহস্যময় অংশের গভীর তাৎপর্য বোঝা সহজ হয়। আবার শ্লোকাত্মক শৈলীর মন্ত্রগুলো চয়ন করে সংগীতে রূপান্তরিত করলে আমরা আনন্দ লাভ করতে পারি। আর যদি আমরা সূত্রাত্মক, অনুব্যাখ্যানাত্মক ও ব্যাখ্যানাত্মক শৈলীর অবস্থান শনাক্ত করতে পারি, তবে বেদার্থ আমাদের নিকটবর্তী হয়ে যাবে, বেদ যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের অন্তরে এসে ধরা দেবে।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
সত্য প্রকাশে নির্ভীক সৈনিক

0 মন্তব্য(গুলি)