নারীকে বেদের দৃষ্টিতে হীন প্রতিপন্ন করার জন্য প্রতিপক্ষ প্রায়শই একটি মন্ত্র উপস্থাপন করে, যা হলো,
“ন বৈ স্ত্রৈণানি সখ্যানি সন্তি সালাবৃকাণাং হৃদয়ান্যেতা” [ঋগ্বেদ ১০.৯৫.১৫]
এর সাধারণ অর্থ করা হয়, "নারীদের সাথে বন্ধুত্ব করা ভালো নয়, তাদের বন্ধুত্ব হায়নার (বা নেকড়ের) হৃদয়ের মতো নিষ্ঠুর হয়।"
প্রথম দৃষ্টিতে এই বাক্যটি নারী-নিন্দাসূচক মনে হলেও, এর প্রেক্ষাপট দেখলে প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয়। এটি মূলত 'পুরূরবা-উর্বশী' সংবাদ সূক্তের অংশ। সংবাদসূক্ত কথোপকথনের শৈলীতে বেদে শিক্ষামূলক একটি বর্ণনাশৈলী। তা ছাড়া বেদে কোনো ইতিহাস নেই [পূর্বমীমাংসা ১।১।৩১] ও বেদের সমস্ত শব্দই যৌগিক [নিরুক্ত ১।১২]।
পুরূরবো মা মৃথা মা প্র পপ্তো মা ত্বা বৃকাসো অশিবাস উ ক্ষন্ ।
ন বৈ স্ত্রৈণানি সখ্যানি সন্তি সালাবৃকাণাং হৃদয়ান্যেতা ॥
[ঋগ্বেদ ১০।৯৫।১৫]
সংস্কৃতভাষ্য: (পুরূরবঃ-মা মৃথাঃ) হে বহুবাদিন্ ! ত্বং ন ম্রিয়স্ব (মা প্র পপ্তঃ) ন ক্বচিৎ প্রপতনং কুরু (মা ত্বা-অশিবাসঃ-বৃকাসঃ-উ ক্ষন্) ন ত্বামহিতকরা বৃকা মাংসভক্ষকাঃ পশবো ভক্ষয়েয়ুঃ, “ঘস্লৃ ভক্ষণে অস্য লুঙি রূপম্” যতঃ (ন বৈ স্ত্রৈণানি সখ্যানি সন্তি) ন নিশ্চয়েন স্ত্রীসম্বন্ধীনি সখ্যানি স্থিরাণি কল্যাণকরাণি ভবন্তি, (এতা সালাবৃকাণাং হৃদয়ানি) ইমানি সখ্যানি তু গতিশীলচ্ছেদকানাম্ “ষল গতৌ” [ভ্বাদি০] কর্ত্তরি ণঃ প্রত্যয়শ্ছান্দসঃ ‘সালাশ্চ তে-বৃকাশ্চ সালবৃকাঃ’ তেষাং পশূনাং হৃদয়ানি-ইব দুঃখদায়ীনি ভবন্তি।
অর্থাৎ,
(পুরূরবঃ): হে বহুভাষী বা কামুক পুরুষ!
(মা মৃথাঃ): তুমি মরো না (আত্মহত্যা করো না)।
(মা প্র পপ্তঃ): কোথাও কোনো গর্ত বা নরকতুল্য স্থানে পতন ঘটিয়ে নিজের বিনাশ করো না।
(মা ত্বা অশিবাসঃ বৃকাসঃ উ ক্ষন্): অহিতকর মাংসভক্ষক নেকড়েরা যেন তোমাকে ছিঁড়ে খেয়ে না ফেলে।
(ন বৈ স্ত্রৈণানি সখ্যানি সন্তি): নারীদের প্রতি কেবল কামজ বা ইন্দ্রিয়গত যে আসক্তি বা সখ্যতা, তা কখনো স্থায়ী বা কল্যাণকর হয় না।
(এতা সালাবৃকাণাং হৃদয়াণি): সেই আসক্তিপূর্ণ হৃদয়গুলো আসলে আক্রমণকারী নেকড়েদের হৃদয়ের মতোই ক্রূর ও হানিকর।
[সূত্র: ঋগ্বেদভাষ্যম্, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬১-৬২: স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক বিদ্যামার্তণ্ড]
মন্ত্রটিকে এই অর্থেই পণ্ডিত জয়দেব শর্মা মীমাংসাতীর্থ ব্যাখ্যা করেছেন,
(পুরূরবঃ): হে বহু প্রজাসমূহর শাসক বা রাজন!
(মা মৃথাঃ): তুমি অকাল মৃত্যুকে বরণ করো না (অর্থাৎ আলস্য বা প্রমাদের কারণে নিজের বিনাশ ঘটিও না)।
(মা পপ্তঃ): তুমি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে দূরে চলে যেও না কিংবা রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেও না।
(অশিবাসঃ বৃকাসঃ মা উ ক্ষন্): অকল্যাণকারী চোর বা নেকড়ে-স্বভাবের ধূর্ত শত্রুরা যেন তোমাকে গ্রাস করতে না পারে, তারা যেন তোমার ক্ষতি করতে না পারে।
সতর্কবার্তা হিসেবে স্মরণ রেখো,
(স্ত্রৈণানি সখ্যানি ন বৈ সন্তি): নারী বা ভোগবিলাসের বস্তুসমূহকে উদ্দেশ্য করে যে মৈত্রী বা মিত্রতা করা হয়, তা কখনোই প্রকৃত বা স্থায়ী হয় না।
(এতা সালাবৃকাণাং হৃদয়াণি): সেই আসক্তিপূর্ণ বা স্বার্থসিদ্ধির সম্পর্কগুলো বুনো কুকুর বা নেকড়েদের হৃদয়ের মতোই ছলনা এবং ক্রূরতায় পূর্ণ থাকে।
[সূত্র: ঋগ্বেদ-সংহিতা ভাষা-ভাষ্য, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬০-৬১: পণ্ডিত জয়দেব শর্মা মীমাংসাতীর্থ]
বেদের দৃষ্টিতে নারী বা পুরুষ কেউই জন্মগতভাবে নিন্দনীয় নয়। বরং তাঁদের অবগুণই তাঁদের নিন্দনীয় করে তোলে। এই বিষয়ে ঋগ্বেদ [৫.৬১.৬,৭] বলছে,
উত ত্বা স্ত্রী শশীয়সী পুংসো ভবতি বস্যসী।
অদেবত্রাদরাধসঃ ॥
বি যা জানাতি জসুরিং বি তৃষ্যন্ত বি কামিনম্।
দেবত্রা কৃণুতে মনঃ ॥
অর্থাৎ, যে পুরুষ যে দেবযজ্ঞ করে না, বিদ্বানদের রক্ষা করে না এবং ধন-সম্পদ দান করে না বা কোনো ক্ষেত্রে সফলতা পায় না এমন অকর্মণ্য পুরুষের চেয়ে একজন নারী অনেক বেশি শ্রেষ্ঠ ও বরণীয়; যিনি প্রশংসনীয় এবং উদ্যমী। সেই নারী যিনি আপদগ্রস্ত মানুষের কষ্ট বোঝেন, তৃষ্ণার্তের বেদনা অনুভব করেন এবং অভাবী ও ধনপ্রার্থীকে সহায়তা করেন; আর যিনি পরমাত্মা, পতি, গুরুজন ও অতিথি ইত্যাদির সেবায় একাগ্র মনে আত্মনিয়োগ করেন, তিনিই প্রকৃত শ্রেষ্ঠ।
আবার ঋগ্বেদ [৫.৬১.৮] বলছে,
উত ঘা নেমো অস্তুতঃ পুমাঁ ইতি ব্রুবে পণিঃ।
স বৈরদেয় ইৎসমঃ ॥
অর্থাৎ, এর বিপরীতে, যদি কোনো অপ্রশংসিত ও কৃপণ ব্যক্তি কেবল "আমি পুরুষ" এই দম্ভ করে বা পুরুষ হওয়ার অভিমান দেখায় তবে সে প্রকৃতপক্ষে নিজের বংশ বা সমাজের শত্রুর সমান।
যখন
আমরা বলি, "একজন অলস রাজার চেয়ে একজন কর্মঠ শ্রমিক অনেক ভালো," তখন কি
আমরা শ্রমিককে ছোট করছি? না। বরং আমরা রাজার পদ বা ক্ষমতার অহংকারকে আঘাত
করে শ্রমিকের গুণকে মহিমান্বিত করছি।
একইভাবে,
যদি কেউ মনে করে যে "নারী হওয়া মানেই সে পুরুষের নিচে", বেদ এই মন্ত্র
দিয়ে প্রমাণ করেছে যে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি লিঙ্গ নয়, বরং কর্ম এবং
শ্রদ্ধা। এখানে নারীকে একটি 'মানদণ্ড' হিসেবে ধরা হয়েছে এটি বোঝাতে যে অসৎ ও
অকর্মণ্য পুরুষ সেই স্তরেও নেই যেখানে একজন সাধারণ নারী তার গুণাবলি নিয়ে
অবস্থান করেন। এই তুলনাটি নারীকে ছোট করার জন্য নয়, বরং পুরুষের লৈঙ্গিক
অহংকারকে ধ্বংস করার জন্য। এটি একটি বৈপ্লবিক ঘোষণা যে লিঙ্গ পরিচয় কাউকে
সম্মান দিতে পারে না, কেবল সৎকার্যই সম্মানের একমাত্র পথ। একজন নারী তার
ভক্তি ও ত্যাগের কারণে সহজাতভাবেই সেই পুরুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যে সামর্থ্য
থাকা সত্ত্বেও সমাজের জন্য কিছুই করে না।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

0 মন্তব্য(গুলি)