বৃষ্টিসূক্ত
অথর্ববেদ ৪র্থ কাণ্ড ১৫তম সূক্ত
ও৩ম্
সমুৎপতন্তু প্রদিশো নভস্বতীঃ সমভ্রাণি বাতজূতানি যন্তু।
মহঋষভস্য নদতো নভস্বতো বাশ্রা আপঃ পৃথিবীং তর্পয়ন্তু ॥১॥
→ দিগন্তের অন্তরালে পুঞ্জীভূত ঘন বাষ্পরাশি আজ একত্রিত হোক। বায়ুতাড়িত মেঘদল চারদিক থেকে ধাবিত হয়ে আসুক সম্মিলিতভাবে। বজ্রনির্ঘোষে বিদীর্ণ আকাশ থেকে বাষ্পঘন সেই ভারাক্রান্ত জলধারা বর্ষিত হোক এবং এই ধরিত্রীকে কানায় কানায় পূর্ণ করে তুলুক।
সমীক্ষয়ন্তু তবিষাঃ সুদানবোঽপাং রসা ওষধীভিঃ সচন্তাম্।
বর্ষস্য সর্গা মহয়ন্তু ভূমিং পৃথগ্জায়ন্তামোষধয়ো বিশ্বরূপাঃ ॥২॥
→ সেই মহাশক্তিশালী ও ঔদার্যমণ্ডিত মেঘদল আমাদের প্রতি অনুকূল হোক এবং ওষধি ও বনস্পতিগণের মাঝে তাঁদের জীবনীশক্তিতে ভরপুর অমৃতসম বারিধারা বিতরণ করুক। বর্ষার বারিধারায় এই ধরিত্রী জাগ্রত ও উদ্দীপ্ত হোক। অসংখ্য প্রকারের ওষধি লতাগুল্ম দিকে দিকে অঙ্কুরিত হয়ে বিবিধ উপায়ে বর্ধিত হোক।
সমীক্ষয়স্ব গায়তো নভাংস্যপাং বেগাসঃ পৃথগুদ্বিজন্তাম্।
বর্ষস্য সর্গা মহয়ন্তু ভূমিং পৃথগ্জায়ন্তাং বীরুধো বিশ্বরূপাঃ ॥৩॥
→ হে পরমাত্মদেব! গগনতলে আমাদের সেই গম্ভীর গর্জনকারী মেঘমালা প্রদর্শন করো। মেঘের দল ধাবিত হয়ে আসুক এবং এই সুবিশাল আকাশকে আচ্ছন্ন করে ফেলুক। বর্ষার বারিধারায় এই ধরণী আনন্দিত ও উদ্দীপ্ত হোক। বিবিধ প্রকারের লতাগুল্ম ও বনস্পতি অঙ্কুরিত হয়ে দিকে দিকে বর্ধিত হোক।
গণাস্ত্বোপ গায়ন্তু মারুতাঃ পর্জন্য ঘোষিণঃ পৃথক্।
সর্গা বর্ষস্য বর্ষতো বর্ষন্তু পৃথিবীমনু ॥৪॥
→ হে পর্জন্য মেঘ! বায়ুর হিল্লোল চারদিক থেকে গীতধ্বনির মাধ্যমে তোমার জয়গান করুক। ঋতুচক্রের প্রয়োজন অনুসারে বর্ষিত বারিধারা ধরিত্রীকে আশীর্বাদে ধন্য করুক এবং আমাদের কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করুক।
উদীরয়ত মরুতঃ সমুদ্রতস্ত্বেষো অর্কো নভ উৎপাতয়াথ।
মহঋষভস্য নদতো নভস্বতো বাশ্রা আপঃ পৃথিবীং তর্পয়ন্তু ॥৫॥
→ হে বায়ু! সূর্যের উত্তাপে সমুদ্র হতে বাষ্পীভূত সেই জলকণাকে আলোড়িত করো এবং নভোমণ্ডলে উত্থিত করো। গগনতলের গম্ভীর গর্জনকারী মেঘমালা হতে প্রচুর বারিধারা বর্ষিত হোক এবং এই ধরিত্রীকে কানায় কানায় পূর্ণ করে তুলুক।
অভি ক্রন্দ স্তনয়ার্দয়োদধিং ভূমিং পর্জন্য পয়সা সমঙ্ধি।
ত্বয়া সৃষ্টং বহুলমৈতু বর্ষমাশারৈষী কৃশগুরেত্বস্তম্ ॥৬॥
→ হে মেঘ! তুমি গর্জন করো এবং বজ্রনির্ঘোষে আকাশকে প্রকম্পিত করো; নভোমণ্ডলের জলরাশিকে ধারাবর্ষণে পরিণত করে এই ধরিত্রীকে জীবনদায়ী সলিলে ধন্য করো। তোমার মুক্ত বারিধারা অঝোর ধারায় প্রবাহিত হোক এবং আশাবাদী কৃষক সানন্দে গৃহে প্রত্যাবর্তন করুক।
সং বোঽবন্তু সুদানব উৎসা অজগরা উত।
মরুদ্ভিঃ প্রচ্যুতা মেঘা বর্ষন্তু পৃথিবীমনু ॥৭॥
→ সেই মহাশক্তিশালী ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত বারিধারা তোমাকে অনাবৃষ্টির দুরবস্থা থেকে রক্ষা করুক এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাক। বায়ুতাড়িত ও প্রেরিত মেঘদল ঋতুচক্রের প্রয়োজন অনুসারে এই ধরিত্রীর ওপর অঝোর ধারায় বর্ষিত হোক।
আশামাশাং বি দ্যোততাং বাতা বান্তু দিশোদিশঃ।
মরুদ্ভিঃ প্রচ্যুতা মেঘাঃ সং যন্তু পৃথিবীমনু ॥৮॥
→ দশদিকের প্রতিটি প্রান্তে বিদ্যুতের দ্যুতি বিচ্ছুরিত হোক। সকল দিক হতে বায়ুর হিল্লোল প্রবাহিত হোক সর্বদিকে। বায়ুচালিত মেঘদল ধরিত্রীর সাথে একাত্ম হয়ে অঝোর ধারায় বর্ষিত হোক।
আপো বিদ্যুদভ্রং বর্ষং সং বোঽবন্তু সুদানব উৎসা অজগরা উত।
মরুদ্ভিঃ প্রচ্যুতা মেঘাঃ প্রাবন্তু পৃথিবীমনু ॥৯॥
→ হে ধরিত্রী-সন্তানগণ! জলরাশি, বিদ্যুৎ ও বজ্রনির্ঘোষ, মেঘ ও বারিধারা এবং বারিরাশির সেই মহান ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত প্লাবন, বৃষ্টি, নদ-নদী ও সমুদ্র ~ সবই তোমাদের রক্ষা করুক এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাক। বায়ুতাড়িত মেঘদল এই ধরিত্রীর ফলন ও উৎপাদনে সহায়ক হোক।
অপামগ্নিস্তনূভিঃ সংবিদানো য ওষধীনামধিপা বভূব।
স নো বর্ষং বনুতাং জাতবেদাঃ প্রাণং প্রজাভ্যো অমৃতং দিবস্পরি ॥১০॥
→ সূর্যের উত্তাপ, জলরাশির অন্তর্নিহিত বিদ্যুৎ-অগ্নি তথা জীবনের সেই সর্বব্যাপী প্রাণশক্তি যিনি জল ও প্রাণের রূপ ও আত্মার সাথে একাত্ম, যিনি ওষধি লতাগুল্মের গুণাগুণ ও জীবনের পরম রক্ষক ও বর্ধক, তিনি যেন দ্যুলোক ও অন্তরিক্ষ থেকে অমৃতসম বারিধারায় আমাদের ধন্য করেন; যা সকল মানুষ ও অন্যান্য সকল প্রাণের অস্তিত্বের জন্য প্রাণবায়ু ও জীবনীশক্তিরূপে বর্ষিত হোক।
প্রজাপতিঃ সলিলাদাঃ সমুদ্রাদাপ ঈরয়ন্নুদধিমর্দয়াতি।
প্র প্যায়তাং বৃষ্ণো অশ্বস্য রেতোঽর্বাঙেতেন স্তনয়িত্নুনেহি ॥১১॥
→ প্রজাপতি অর্থাৎ যিনি প্রজাকুলের অধিপতি এবং জীবনের সৌর-আধার, তিনি উত্তাল সমুদ্র হতে সূর্যের মাধ্যমে জলীয় বাষ্পরাশি উত্থাপিত করেন এবং অন্তরিক্ষে বাষ্পীয় জলধির সৃষ্টি ও বিচ্ছুরণ ঘটান। এর মাধ্যমেই সেই ঔদার্যমণ্ডিত ও প্রাচুর্যময় মেঘের প্রাণশক্তি বৃদ্ধি পাক; এবং সেই প্রবৃদ্ধির ফলে, বিদ্যুতের অনুঘটক শক্তিতে বারিধারা নেমে আসুক ও ধরিত্রীকে ধন্য করুক।
অপো নিষিঞ্চন্নসুরঃ পিতা নঃ শ্বসন্তু গর্গরা অপাং বরুণাব নীচীরপঃ সৃজ।
বদন্তু পৃশ্নিবাহবো মণ্ডূকা ইরিণানু ॥১২॥
→ জলরাশি ও বারিধারার এই মেঘ, যা জীবনীশক্তির উৎস, আমাদের পরম রক্ষক ও বর্ধক। হে প্রিয় মেঘ! তুমি তোমার বারিধারা মোচন করো এবং জলাশয় ও জলস্রোতগুলোকে প্রাণস্পন্দনে জাগিয়ে তোলো; অতঃপর সেই লহরীময় সরোবর আর বহমান ধারায় রঙিন ব্যাঙেরা ধরিত্রীর উৎসবে মেতে সানন্দে কলরব করুক।
সংবৎসরং শশয়ানা ব্রাহ্মণা ব্রতচারিণঃ।
বাচং পর্জন্যজিন্বিতাং প্র মণ্ডূকা অবাদিষুঃ ॥১৩॥
→ যেমন ব্রতচারী বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ সম্বৎসরকাল মৌনব্রত পালন শেষে পুনরায় বেদমন্ত্র উচ্চারণ ও আবৃত্তি করেন, ঠিক তেমনই এই মণ্ডূককুলও[ব্যাঙ] প্রকৃতির ঋতুচক্রকে অনুসরণ করে; এক বছরের সুপ্তাবস্থা শেষে তারা মেঘ ও বারিধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের স্বাভাবিক শব্দে জীবনের জয়গান ও উৎসব পালন করে।
উপপ্রবদ মণ্ডূকি বর্ষমা আ বদ তাদুরি।
মধ্যে হ্রদস্য প্লবস্ব বিগৃহ্য চতুরঃ পদঃ ॥১৪॥
→ হে মণ্ডূক! হে ক্ষুদ্র শিশু মণ্ডূক! তুমি গান গাও আর আনন্দোৎসবে মেতে ওঠো। বৃষ্টিকে আবাহন করো, আনন্দে তোমার চার পা প্রসারিত করো এবং এই বারিধারার প্লাবনে মুক্ত মনে সাঁতার কাটো। এভাবেই, হে ব্রহ্মবিদ্যাস্নাতকগণ! চতুর্বেদে অবগাহন করো।
খণ্বখা৩ই খৈমখা৩ই মধ্যে তদুরি।
বর্ষং বনুধ্বং পিতরো মরুতাং মন ইচ্ছত ॥১৫॥
→ হে সুপ্ত মণ্ডূক! হে নীরব ক্ষুদ্র প্রাণ! তুমি এই বারিধারায় আনন্দ ও উৎসবে মেতে ওঠো। হে প্রাজ্ঞ শ্রেষ্ঠগণ, হে জনসমাজের অভিভাবকবৃন্দ! তোমরা বায়ুর গতিপ্রকৃতি ও অনুকূলতা অনুধাবনের চেষ্টা করো, কারণ তারাই বৃষ্টি বয়ে নিয়ে আসে।
মহান্তং কোশমুদচাভি ষিঞ্চ সবিদ্যুতং ভবতু বাতু বাতঃ।
তন্বতাং যজ্ঞং বহুধা বিসৃষ্টা আনন্দিনীরোষধয়ো ভবন্তু ॥১৬॥
→ হে পরমাত্মদেব! তুমি সেই মহান বারিকোষরূপ মেঘ উন্মুক্ত করো এবং পৃথিবী সিক্ত করো। আকাশ বিদ্যুতের দ্যুতিতে উদ্ভাসিত হোক এবং বায়ু প্রবাহিত হোক। দিকে দিকে বারিধারা বিচ্ছুরিত হয়ে এই প্রকৃতির যজ্ঞকে বিস্তৃত করুক এবং ওষধি লতাগুল্মসমূহ আনন্দ ও জীবনীশক্তিতে ভরে উঠুক।
সূত্র: অথর্ববেদ ভাষ্যানুবাদ ~ ড. তুলসীরাম শর্মা, পণ্ডিত বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার, পণ্ডিত ক্ষেমকরণ দাস ত্রিবেদী
🖋 শ্রী দীপংকর সিংহ দীপ
ব্যাকরণ-বেদান্ত-স্মৃতি-পৌরোহিত্য-আয়ুর্বেদতীর্থ
শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

0 মন্তব্য(গুলি)