https://www.idblanter.com/search/label/Template
https://www.idblanter.com
BLANTERORBITv101

লবকুশ কি শ্রীরামের সন্তান?

Saturday, March 28, 2026

 

লবকুশ কি শ্রীরামের সন্তান? 
 
সম্প্রতি পঞ্জিকা নিয়ে বাংলাদেশ অগ্নিবীরের সাথে তর্কে এই বিষয়ে একজন অগম্যাগামীর অপ্রাসঙ্গিক আক্ষেপ আমরা দেখতে পেয়েছিলাম। সেখানে সেই অপদার্থ নিজের চরম মূর্খতাবশত ধৃষ্টতাপূর্ণভাবে লিখেছিল যে, রামের বনবাসকালে তাঁর কোনো সন্তান হয় নি যখন রাম ও সীতা একত্রে ছিলেন; কিন্তু রাবণের কাছ থেকে বন্দিনী হয়ে আসার পর, অর্থাৎ বনবাসান্তে সীতার দুই সন্তান হয়। এজন্য সেই অগম্যাগামী মনে করেছে যে লবকুশ বুঝি রাবণেরই সন্তান। মস্তিষ্ক যদি বরাহের পূরীষে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয় এবং উপর্যুপরি সেই বরাহপূরীষপূর্ণ মস্তিস্কে মূর্খতার দুষ্প্রভাবও সমভাবে থাকে, তাহলে এমন চিন্তাভাবনা করা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
অহো! উল্লেখ করতে তো ভুলেই গেলাম যে অপপ্রচারকারী ‘বাংলাদেশ অগ্নিবীর’ কে ভারতীয় পেইজ বলে সম্বোধন করেছিলো। তাই আমার ধারণা অপপ্রচারকারী একজন পাকি-বীজ, কারণ ওরা বাংলাদেশী হিন্দুদের ভারতীয় বলতে অভ্যস্ত। দুঃখজনক যে, এই পাকি বীজেরা নিজের পিতার পরিচয় বিষয়ে অনিশ্চিত এবং সবাই তাদের পিতৃপরিচয় নিয়ে খোটা দেয়। সুতরাং তাদের কেউ যদি লবকুশের জন্মপরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ করে লবকুশকে নিজেদের দলে টানতে চায় তাহলে আর আশ্চর্য কী? ভাবটা যেন ঐ লেজকাটা শেয়ালের মতো যে লেজ হারিয়ে সবার লেজ কেটে নিজের অনুরূপ করার ফন্দি এঁটেছিলো। তবে দুঃসংবাদ এই যে, আমরা অর্থাৎ সনাতন ধর্মের সেবক দুএকটা লোকের শরীরে যতদিন শেষ রক্তবিন্দু অবশিষ্ট আছে ততদিন তাঁদের সেই স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না। 
 
সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ অগ্নিবীর এমন মূর্খতার জবাব দিতে চান নি। কেননা পাগলা কুকুরের সব ঘেউ ঘেউয়ে কর্ণপাত করা প্রয়োজনীয় নয়। তবে আমাদের একজন অনুসারী উক্ত আক্ষেপের জবাব চেয়েছিলেন। এবং আমরা অগম্যাগামীটির আরেকটি পোস্ট দেখেছি যেখানে সে তার পূর্বকৃত অপপ্রচারের জবাব বাংলাদেশ অগ্নিবীর দেয়নি এই উল্লাসে মদমত্ত হতে লম্ফঝম্প করে বেড়াচ্ছে। তাই আজকের এই খণ্ডনমূলক প্রবন্ধে মূর্খটির উক্ত অপপ্রচারটিকে ধূলিসাৎ করতে উদ্যত হয়েছি। বাংলাদেশ অগ্নিবীর এই বিষয়ে অপপ্রচারকে পাগলা কুকুরের ঘেউ ঘেউ ভেবে উপেক্ষা করতেই পারেন, কেননা বিদ্বজ্জনের খেয়েদেয়ে কাজকর্ম থাকে, পাড়ার সব পাগলা কুকুরের পেছনে ছুটে তাঁরা সময় নষ্ট করবেন কেন? হ্যাঁ। তাঁদের মতো লিখতে পারবো না ঠিক; তবে আপাতত আমি সেই পাগলা কুকুরের ঘেউ ঘেউ রূপ উপদ্রবটি নিরাকরণ করে শান্তিবিধানের সামান্য প্রচেষ্টা তো করতেই পারি।
 
তবে এই প্রসঙ্গে খণ্ডনের শুরুতেই উল্লেখ করা ভালো যে, পূর্বোক্ত অগম্যাগামীটির আক্ষেপের কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। তার কেবল বরাহপূরীষপূর্ণ একটি মস্তিষ্ক আছে, যার দ্বারা সে কদর্য অনুমানই করতে পারে। তবে এই খণ্ডনটি রামায়ণের ভিত্তিতেই করা হবে। এই প্রবন্ধের তিনটি মুখ্য অংশ থাকবে। প্রথম অংশে শ্রীরামের কেন ১৩ বছরেও কোনো সন্তান হলো না, তার কারণ আমরা ব্যাখ্যা করবো। দ্বিতীয় অংশে লবকুশ রাবণের সন্তান হওয়া কেন অসম্ভব, তার কারণগুলো প্রমাণসমেত প্রতিপাদন করবো। তৃতীয় অংশে লবকুশ যে রামেরই সন্তান, তার অকাট্য প্রমাণ প্রদর্শনপূর্বক অগম্যাগামীটির মুখে ঝামা ঘ’ষে দিবো। যেহেতু নিকৃষ্ট অপপ্রচারকারীটি রামায়ণ কখনো পড়েনি তাই এই প্রবন্ধে রামায়ণ পড়িয়ে পড়িয়ে জবাব দেওয়া হবে। এজন্য প্রবন্ধটি একটু দীর্ঘকলেবর হতে পারে।
 
  • [প্রথম অংশ, অনুসন্ধান ] 
  • শ্রীরামের কেন ১৩ বছরেও কোনো সন্তান হলো না? 

 
প্রথমত, রাম-সীতার কেন এতো বছরে সন্তান হলো না? এই প্রশ্ন শুনলে একটি পূরীষপূর্ণ মস্তিষ্ক ভাববে, রাম বুঝি সন্তান জন্মদানে অক্ষম ছিলেন তাই তাঁর সন্তান হয় নি। তার প্রত্যুত্তরে আমরা বলতে পারি, হে অজমূর্খ! ভগবান শ্রীরামকে সমগ্র রামায়ণে পুরুষশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। তার শারীরিক বর্ণনায় বলা হচ্ছে তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী এক সক্ষম পুরুষ ছিলেন। পৌরুষ লাভের জন্য তোমাদের অগম্যাগামী কুলক্ষণী কাপুরুষদের মতো তাঁর হানিনাট খাওয়ার প্রয়োজন ছিলো না। দেখো রামায়ণের প্রথমেই শ্রীরামের শারিরীক বর্ণনায় নারদ বলছেন—
 
“ ইক্ষ্বাকুবংশপ্রভবো রামো নাম জনৈঃ শ্রুতঃ ।
নিয়তাত্মা মহাবীর্যো দ্যুতিমান্ ধৃতিমান্ বশী ॥ (রামায়ণ আদি০ ১।১।৮)॥
​বুদ্ধিমান্ নীতিমান্ বাগ্মী শ্রীমান্ শত্রুনিবর্হণঃ ।
বিপুলাংসো মহাবাহুঃ কম্বুগ্রীবো মহাহনুঃ ॥” ( ১।১।৯)॥
অর্থ—ইক্ষ্বাকুবংশজাত, জনগণ যাকে ‘রাম’ নামে জানেন। তিনি সংযতাত্মা, মহাবীর্যবান, কান্তিময়, ধৈর্যশীল এবং ইন্দ্রিয়জয়ী (৮)। তিনি বুদ্ধিমান, নীতিমান, সুবক্তা, শ্রীসম্পন্ন এবং শত্রু বিনাশকারী। তাঁর কাঁধ বিশাল ও সুদৃঢ়, বাহুদ্বয় আজানুিলম্বিত, গলা শঙ্খের মতো এবং চোয়াল সুগঠিত (৯)।
“​মহোরস্কো মহেষ্বাসো গূঢ়জত্রুররিন্দমঃ ।
আজানুবাহুঃ সুশিরাঃ সুললাটঃ সুবিক্রমঃ ॥” (১।১।১০)॥
অর্থ—তিনি বিশাল বক্ষস্থল ও বিশাল ধনুর অধিকারী, তাঁর কণ্ঠাস্থি মাংস দ্বারা আচ্ছাদিত। তিনি শত্রুদমনকারী, আজানুলম্বিত বাহু, সুন্দর মস্তক ও ললাটবিশিষ্ট এবং প্রবল পরাক্রমশালী পুরুষ।
“​সমঃ সমবিভক্তাঙ্গঃ স্নিগ্ধবর্ণঃ প্রতাপবান্ ।
পীনবক্ষা বিশালাক্ষো লক্ষ্মীবাঞ্ছভলক্ষণঃ ॥” ( ১।১।১১)॥
অর্থ—তিনি সুঠাম দেহের অধিকারী, তাঁর অঙ্গগুলি সুবিন্যস্ত। তিনি উজ্জ্বল বর্ণের ও প্রতাপশালী। তাঁর বক্ষ প্রশস্ত, বিশালাক্ষ, এবং সুলক্ষণযুক্ত ও শ্রীমান।
 
এভাবে রামায়ণে আদ্যন্ত রামচন্দ্রের বীর পুরুষোচিত শারীরিক সৌষ্ঠব এবং সুদৃঢ় কাঠামোর সপ্রশংস বর্ণনা লক্ষ্য করা যায়। তাকে প্রায়ই পুরুষশ্রেষ্ঠ, পুরুষব্যাঘ্র ইত্যাদি বিশেষণে সম্বোধন করা হয়েছে। রামায়ণের অতি সামান্য পাঠকও যেহেতু এই বিষয়ে সম্যক অবগত, তাই এখানে অধিকতর বর্ণনার আবশ্যকতা বোধ করছি না। সুতরাং রামের পৌরুষ কিংবা শারীরিক সক্ষমতা বিষয়ে কোনো প্রকার সংশয় প্রকাশের বিন্দুমাত্র অবকাশ রইল না।
 
দ্বিতীয়ত, রামায়ণ পড়লে খুব বোঝা যায় রামের বনবাস মোটেও কোনো মধুচন্দ্রিমার স্থান ছিলো না। তিনি সীতা ও লক্ষণ কাউকেই বনে নিতে চাননি। কারণ বনে তখনকার যুগে বনে টিকে থাকাই ছিল দুষ্কর, চলাফেরা ছিল অত্যন্ত কষ্টের এবং প্রতি পদে পদে বিভিন্ন বিপদ। তার উপর ভয়ানক রাক্ষস ইত্যাদির উৎপাত এবং তাঁদের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকার লড়াই ছিল। আমরা যারা রামায়ণ পড়েছি তারা জানি সেই রাক্ষসরা তখন আর্যাবর্তের দক্ষিণ ভাগসমূহে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছিলো। রামায়ণে অযোধ্যাকাণ্ডে আমরা দেখি (অযোধ্যাকাণ্ড। সর্গ ১১৬। শ্লোক ১ থেকে ক্রমশ) — 
 
ভরত চলে যাওয়ার পর শ্রীরাম সেই আশ্রমের ঋষিদের মধ্যে এক প্রকার ভয় ও উদ্বেগ লক্ষ্য করলেন (শ্লোক-১)। চিত্রকূটস্থ সেই তাপসাশ্রমে শ্রীরামকে আশ্রয় করে যেসকল ঋষিরা ছিলেন, রাম তাঁদের চিত্তের এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখতে পেলেন (২)। ঋষিরা রামকে লক্ষ্য করে শঙ্কাভরা চোখে ভ্রুকুটি করছিলেন এবং নিজেদের মধ্যে গোপনে ফিসফিস করে আলাপ করছিলেন (৩)। তাঁদের এই উৎকণ্ঠা দেখে শ্রীরাম নিজের অজান্তে করা কোনো অপরাধের কথা ভেবে শঙ্কিত হলেন এবং কুলপতি ঋষির কাছে করজোড়ে এর কারণ জানতে চাইলেন (৪)।
​রাম জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর নিজের বা তাঁর পূর্বপুরুষদের কোনো আচরণের কারণে তপস্বীরা বিরক্ত কি না (৫)। তিনি আরও জানতে চাইলেন, তাঁর অনুজ লক্ষ্মণ কি ভুলবশত এমন কিছু করেছেন যা মহাত্মা ঋষিদের জন্য অনুপযুক্ত (৬)। এমনকি সীতা দেবীও তাঁর স্বামী রামের সেবা করতে গিয়ে ঋষিদের পরিচর্যায় কোনো প্রমাদ ঘটিয়েছেন কি না, সেই প্রশ্নও তিনি তুললেন (৭)। তখন জরাজীর্ণ ও তপোবৃদ্ধ কুলপতি ঋষি কম্পিত কণ্ঠে রামকে উত্তর দিলেন (৮)।
ত্বন্নিমিত্তমিদং তাবৎ তাপসান্ প্রতি বর্ততে।
রক্ষোভির্যেন সংবিগ্নঃ কথয়ন্তি মিথঃ কথাঃ ॥
​রাবণাবরজঃ কশ্চিৎ খর ইতি নামতঃ রাক্ষসঃ।
উৎপাটি তাপসান্ সর্বান্জস্থাননিবাসিনঃ ॥
​ধৃষ্টশ্চ জিতকাশী চ নৃশংসঃ পুরুষাদকঃ।
অবলিপ্তশ্চ পাপৈশ্চ ত্বাং চ তাত ন মৃষ্যতে ॥ (১। ১১৬। ১০-১২) ॥
অর্থাৎ—“ ​হে বৎস! তাপসগণের এই উদ্বেগ তোমার কারণেই উপস্থিত হয়েছে। রাক্ষসদের দ্বারা অত্যন্ত ভীত হয়ে তারা নিজেদের মধ্যে এই প্রকার আলোচনা করছেন (১০)। ​রাবণের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ‘খর’ নামক এক রাক্ষস জনস্থানবাসী সমস্ত তাপসদের উৎপাটন বা উচ্ছেদ করছে (১১)। ​সে অত্যন্ত ধৃষ্ট, নিজেকে বিজয়ী মনে করে, নৃশংস এবং নরভক্ষক। পাপাচারী ও অহঙ্কারী সেই রাক্ষস তোমাকেও সহ্য করতে পারছে না (১২)।”
 
“ ​ত্বং যদাপ্রভৃতি হ্যস্মিন্নাশ্রমে তাত বর্তসে।
তদাপ্রভৃতি রাক্ষাসি বিপ্রকুর্বন্তি তাপসান্ ॥
​দর্শয়ন্তি হি বীভৎসৈঃ রূপৈর্ভীষণকৈরতৈ।
নানাভৈর্বিকৃষ্ণাকারৈস্তৈঃ ক্রুরৈর্ভয়বদ্ভিঃ ॥
​অপ্রশস্তৈস্তথাশুচিঃ সংপ্রযুজ্য চ তাপসান্।
প্রতিঘ্নন্ত্যপরান ক্ষিপ্রমনার্যাঃ পুরতঃ স্থিতান্ ॥ ” (১৩- ১৫) ॥
অর্থাৎ —​বৎস! যেদিন থেকে তুমি এই আশ্রমে আছ, সেইদিন থেকেই রাক্ষসেরা তপস্বীদের প্রতি উৎপীড়ন করছে (১৩)। এই অনার্য রাক্ষসেরা নানান বীভৎস ও ক্রূর বিকৃত আকার ধারণ করে সম্মুখস্থ ঋষিদের ভয় দেখায় (১৪)। আবার কখনো-কখনো তারা সুদর্শনরূপে দর্শন দিয়ে বিপজ্জনক অশুভ দ্রব্যাদি তপস্বীদের সম্মুখে নিক্ষেপ ও স্পর্শ করিয়ে তাঁদের পীড়া দেয় (১৫)। 
 
“ ​তেষু তেষ্বাশ্রমস্থানেষুবদ্ধমবলীয় চ।
রমন্তে তাপসাস্তত্র নাশরন্তোহল্পচেতসঃ ॥
​অবক্ষিপন্তি শ্রুবভাণ্ডানগ্নিং সিঞ্চন্তি বারিণা।
কলশাংশ প্রমদর্ন্তি হবনে সমুপস্থিতে ॥” (১৬-১৭) ॥
অর্থ— “এই ক্ষুদ্রচেতা রাক্ষসেরা সেইসব আশ্রমে গোপনে লুকিয়ে থেকে অল্পজ্ঞ বা অসাবধানী তপস্বীদের হত্যা করে উল্লসিত হয় (১৬)।” যজ্ঞ আরম্ভ হলে ভ্রুক্, ভ্রুব (যজ্ঞার্থ পাত্র বিশেষ) এবং অন্যান্য যজ্ঞপাত্রাদি দূরে নিক্ষেপ করে যজ্ঞাগ্নিতে জল ঢেলে দেয় এবং যজ্ঞার্থ জল-আয়ননের পাত্র (কলসাদি) ভেঙে দেয় (১৭)।”
 
​তৈর্দুরাত্মভিরাবিষ্টানাশ্রমাল্ প্রজিহাসবঃ।
গমনায়ানাদেশসা চোদয়ন্ত্যৃষয়োহদ্য মাম্ ॥ ১৮
অর্থ— “সেই দুরাত্মাদের দ্বারা উৎপীড়িত ঋষিরা আমাকে আজই এই আশ্রম পরিত্যাগ করে অন্যত্র যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করছে।”
 
​তৎ পুরা রাম শারীরীমুপহিংসাং তপস্বিষু।
দর্শয়ন্তি হি দৃষ্টান্তৈস্ত্যক্ষ্যাম ইমমাশ্রমম্ ॥ ১৯ ॥
অর্থ— “তাই, রাম! সেই দুষ্টেরা তপস্বীদের প্রতি শারীরিক অত্যাচার করার পূর্বেই আমরা এই আশ্রম ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে চাই।”
 
এরপর রামকে সাবধান করে কুলপতি ঋষি বলেন,
“ ​খরস্যচাপি চাযুক্তং পুরা রাম প্রবর্ততে।
সহ্যাস্মাভিরিতো গচ্ছ যদি বুদ্ধিঃ প্রবর্ততে ॥
​সকলত্রস্য সন্দেহো নিত্যং যুক্তস্য রাঘব।
সমর্থস্যাপি হি সতো বাসো দুঃখমিহাদ্য তে ॥” (২১-২২) ॥
অর্থ— “রাম! খর তোমার প্রতিও অনুচিত আচরণ করতে পারে। তাই, যদি তোমার ইচ্ছা হয় তো, তুমিও আমাদের সঙ্গে যেতে পারো (২১)। হে রাঘব! যদিও তুমি সাবধানে আছ এবং রাক্ষস-দমনে সমর্থ, তথাপি পত্নীর সঙ্গে এখানে তোমার বাস দুঃখের কারণ হবে (২২)।”
 
​ইত্যুক্তবন্তং রামস্তং রাজপুত্রস্তপস্বিনম্।
ন শশাকোত্তরৈর্বাক্যৈরববদ্ধুং সমুৎসুকম্ ॥ ২৩ ॥
অর্থ— অন্যান্য ঋষিদের নিয়ে অন্যত্র গমনে সমুৎসুক সেই তপস্বীকে রাজকুমার রাম আশ্বাসবাক্যের দ্বারা তপোবনে ধরে রাখতে পারলেন না।
(অযোধ্যাকাণ্ড। ১১৬। ১-২৩)
 
এরপর যখন চিত্রকূটের সেই আশ্রম সম্পূর্ণ মানবশূন্য হয়ে পড়লো তখন রাম স্থান পাল্টানোর কথা ভাবলেন, তাই তিনি গভীর দণ্ডকারণ্য বনে প্রবেশ করলেন। এবং সেখানকার ঋষিদের দ্বারা অভ্যর্থিত হলেন। ঋষিরা জানালেন তারা কষ্টে আছেন, বললেন, ​
“ তে বয়ং ভবতা রক্ষ্যা ভবদ্বিষয়বাসিনঃ ।
নগরস্থো বনস্থো বা ত্বং নো রাজা জনেশ্বরঃ ॥
​ন্যস্তদণ্ডা বয়ং রাজঞ্জিতক্রোধা জিতেন্দ্রিয়াঃ ।
রক্ষণীয়াস্ত্বয়া শশ্বদ্ গর্ভভূতাস্তপোধনাঃ ॥” (২০- ২১) ॥
অর্থ— “সেই আমরা (বনবাসী ঋষিরা) আপনার রাজ্যে বাস করি, অতএব আপনার দ্বারা রক্ষণীয় (আমাদের রক্ষা করা আপনার কাজ)। আপনি নগরেই থাকুন বা বনেই থাকুন, জনগণের রাজা আপনি আমাদের রাজা (২০)। রাজন ! ক্রোধজয়ী এবং ইন্দ্রিয়জয়ী আমরা (কোনও দোষীর প্রতি) দণ্ডবিধান ত্যাগ করেছি। (তাই রাক্ষসেরা আমাদের উপর অত্যাচার করে যজ্ঞাদি ধর্মীয় কার্য নষ্ট করলেও আমরা তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিতে বা কোনওরূপ শাস্তি দিতে পারি না)। আমরা তপস্বী; (অতএব, দুর্বল ও অসহায়) গর্ভস্থ সন্তানের ন্যায় আমাদের রক্ষা করা আপনার কর্তব্য (২১)। (অরণ্য০। ১। ২০-২১)॥
 
এরপর অরণ্যকাণ্ডের ষষ্ঠ সর্গে আমরা দেখতে পাই, নির্যাতিত বানপ্রস্থী মুনি-ঋষিগণ সকলে রামের কাছে এসে হাহাকার করে বলছেন,
“ সোহয়ং ব্রাহ্মণভূয়িষ্ঠো বানপ্রস্থগণো মহান্ ।
ত্বয়ানাথোপনাস্বদ রাম রাক্ষসৈর্হন্যতে ভৃশম্ ॥
​এহি পশ্য শরীরাণি মুনীনাং ভাবিতাত্মনাম্ ।
হতানাং রাক্ষসৈর্ঘোরৈর্বহূনাং বহুধা বনে ॥” (১৫- ১৬) ॥
অর্থ— হে রাম! এই অরণ্যে অধিক সংখ্যক ব্রাহ্মণসহ বানপ্রস্থী আছেন। হে রাম! আপনি প্রভু বর্তমান থাকা সত্ত্বেও তাঁরা রাক্ষসগণ কর্তৃক অনাথের মতো নিহত হচ্ছেন (১৫)। আসুন, বনে ভয়ঙ্কর রাক্ষসগণ কর্তৃক বারবার অনেক প্রকারে নিহত বহু পবিত্রাত্মা মুনির শবদেহ দর্শন করুন (১৬)।
 
“ ​পম্পানদিনিবাসানামনুমন্দাকিনীমপি ।
চিত্রকূটালয়ানাং চ ক্ৰিয়তে কদনং মহৎ ॥
​এবং বয়ং ন মৃষ্যামো বিপ্রকারং তপস্বিনাম্ ।
ক্রিয়মাণং বনে ঘোরং রক্ষোভির্ভীমকর্মভিঃ ॥
​তত্ত্বাং শরণ্যার্থ চ শরণং সমুপস্থিতাঃ ।
পরিপালয় নো রাম বধ্যমানান্ নিশাচরৈঃ ॥
​পরা ত্বত্তো গতির্বীর পৃথিব্যাং নোপপদ্যতে ।
পরিপালয় নঃ সর্বান্ রাক্ষসেভ্যো নৃপাত্মজ ॥ ” (১৭- ২০) ॥”
অর্থ— পম্পা সরোবর ও তৎসমীপবর্তী নদীতীরের অধিবাসীদের প্রতি এবং মন্দাকিনী নদীতীরবর্তী স্থানে ও চিত্রকূটে বসবাসকারী মুনিদের প্রতি অত্যন্ত পীড়ন করা হচ্ছে (১৭)। অরণ্যে তপস্বীদের প্রতি ভয়ঙ্কর রাক্ষসদের এইরকম ভয়ানক উপদ্রব আমরা সহ্য করতে পারছি না (১৮)। অতএব, রাম! আপনিই শরণীয় (শ্রেষ্ঠ আশ্রয়দাতা), আমরা আপনার শরণাগত! রাক্ষসেরা আমাদের হত্যা করতে উদ্যত; আপনি আমাদের রক্ষা করুন (১৯)। পৃথিবীতে আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ নিরাপদ আশ্রয় আর নেই (পাওয়া যাবে না)। অতএব, হে বীর রাজকুমার! (আপনি) আমাদের সকলকে রাক্ষসদের থেকে রক্ষা করুন (২০) ।
 
উত্তরে তখন রাম তাঁদের অভয় দিয়ে বললেন,
“ ​বিপ্ৰকারমপাক্ৰষ্টুং রাক্ষসৈর্ভবতামিমম্ ।
পিতুস্ত নির্দেশকরঃ প্রবিষ্টোহমিদং বনম্ ॥ ২৩ ॥
​ভবতামর্থসিদ্ধ্যর্থমাহুতোহং যদৃচ্ছয়া ।
তস্য মেহয়ং বনে বাসো ভবিষ্যতি মহাফলঃ ॥ ২৪ ॥
​তপস্বিনাং রণে শত্রুন হন্তুমিচ্ছামি রাক্ষসান্ ।
পশ্যন্ত বীর্যমৃষয়ঃ সভ্রাতুর্মে তপোধনাঃ ॥” ২৫ ॥
অর্থ— রাক্ষসগণ কর্তৃক আপনাদের উপর এই উপদ্রব দূর করার জন্যই পিতার আজ্ঞাবহ হয়ে (পিতার আদেশে) আমি এই বনে প্রবেশ করেছি (২৩)। আপনাদের প্রয়োজন সিদ্ধির জন্যই দৈবক্রমে আমি এখানে (এই বনে) এসেছি। আমার এই বনবাস মহাফলপ্রদ হবে (২৪)। তপস্বীদের শত্রু রাক্ষসদের (আমি) যুদ্ধে সংহার করতে চাই। তপোধন ঋষিগণ ভ্রাতা লক্ষ্মণ সহ আমার বীরত্ব দর্শন করুন (২৫)।
 
রামচন্দ্রের বনবাসকালে ঋষিকুলের সুরক্ষাকল্পে তিনি বহুবার রাক্ষসদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। দণ্ডকারণ্য বা অরণ্যকাণ্ডের প্রারম্ভেই (সর্গ ২-৪) ঋষিদের আশ্রমে গমনের প্রাক্কালে বিরাধ নামক রাক্ষসের সহিত রাম-লক্ষণের ঘোরতর সংগ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এভাবেই বনবাসের প্রতিটি পদক্ষেপে শ্রীরামের নিমিত্ত নানাবিধ বিপদ ও বিঘ্ন ওত পেতে ছিল।
 
​তবে এই পর্যায়ক্রমিক ঘটনাবলীর মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলো খর, দূষণ ও ত্রিশিরার সহিত শ্রীরামের সেই প্রখ্যাত যুদ্ধ। উক্ত ভয়ংকর সংগ্রামে প্রথমে চতুর্দশ এবং পরবর্তীকালে চৌদ্দ সহস্র সশস্ত্র রাক্ষস সৈন্য শ্রীরামকে বিনাশ করতে উদ্যত হয়েছিল। রামচন্দ্র আপন শৌর্য ও অসামান্য অস্ত্রবিদ্যার প্রভাবে তাদের সমূলে সংহার করেন এবং আর্যাবর্তের অরণ্যাঞ্চলকে রাক্ষসদের উপদ্রব ও ভীতি হতে মুক্ত করেন। অরণ্যকাণ্ডের ১৯ হতে ৩০ তম সর্গ পর্যন্ত এই মহাযুদ্ধের বিস্তৃত বিবরণ বিদ্যমান, যেখানে খর, দূষণ, ত্রিশিরাসহ অসংখ্য রাক্ষস শ্রীরামের হস্তে নিহত হয়।
 
এই যুদ্ধে সীতার নিরাপত্তা নিয়ে রামকে সবিশেষ চিন্তিত দেখা যায়। যেমন, রাক্ষসরা আক্রমণ করতে আসছে এর আভাস পেয়ে রাম লক্ষণকে আদেশ দেন যে, “ …গৃহীত্বা বৈদেহীং শরপাণির্ধনুর্ধরঃ।
গুহামাশ্রয় শৈলস্য দুর্গাং পাদপসঙ্কুলাম্ ॥” (অরণ্য০ ২৪। ১২) ॥ ​অর্থ— “ হে লক্ষণ! তুমি ধনুর্বাণ ধারণ করে সীতাকে নিয়ে বৃক্ষাচ্ছাদিত দুর্গম গিরিগুহায় আশ্রয় গ্রহণ করো ”
 
▪ যাই হোক উপরোক্ত ঘটনাবলী ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে বেশ বুঝতে পারা যায় যে, রামচন্দ্রের বনবাস জীবন অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ ও বিপদসংকুল ছিল। এমন এক প্রাণসংশয়ী পরিস্থিতিতে, যেখানে জীবনধারণই অনিশ্চিত, সেখানে কোনো দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। কেননা সচেতন ব্যক্তিবর্গ সর্বদা ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা বিবেচনা করেই সন্তান জন্মদানে প্রবৃত্ত হন। অরণ্যবাসের এই প্রতিকূল পরিবেশে একটি নবজাতকের উপস্থিতি রামের সংকটকে কেবল ঘনীভূতই করত। বনবাসকালে সীতা গর্ভবতী হলে দীর্ঘকাল তাঁর পরিচর্যায় রাম ও লক্ষ্মণ উভয়কেই নিরন্তর ব্যস্ত থাকতে হতো। আমরা দেখি বনবাসকালে তারা বিভিন্ন স্থানে স্থানে ভ্রমণ করতেন, সেই অবস্থায় শিশু থাকলে তাদের শারিরীক ও মানসিক ভার বাড়তো, রাক্ষসদের অতর্কিত আক্রমণে সসন্তান সীতার পক্ষে দ্রুত প্রস্থান বা আত্মরক্ষা করা কি সম্ভবপর ছিল? এছাড়া আরো ভেবে দেখলে, সন্তান প্রসব ও আনুষঙ্গিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে রাম বা লক্ষ্মণের কাছে বনে উত্তম স্বাস্থ্যব্যবস্থাও ছিলো না। শিশুর জন্মের পর তাকে নিরাপদ রাখা রামের পক্ষে আরও দুরূহ হয়ে উঠত। সীতা হরণের ন্যায় সেই শিশুকেও অপহরণ করা বা তার প্রাণহানির প্রবল আশঙ্কা বিদ্যমান ছিল। তদুপরি শিশুর ক্রন্দন কিংবা শৈশবের চপলতা ও দৌড়ঝাঁপ এই অশান্ত ও রাক্ষস অধ্যুষিত বন্য পরিবেশে রামচন্দ্রকে নিশ্চিতভাবেই আরও গুরুতর বিপদের সম্মুখীন করত। অগম্যাগামীটির প্রাণের আত্মীয় রোহিঙ্গাগুস্টি যারা জীবনসংকটে থেকেও ভূরি ভূরি ছানাপোনা পয়দা করে থাকে। তবে এরকম কাজ শিক্ষিত মানুষ করেন না, তাঁরা নবাগত শিশুদেরকে একটি সুন্দর জীবন দিতে চান। তাদের কাম্য থাকে সন্তান যাতে মানুষের মতো মানুষ হয়ে মূল থেকে গড়ে উঠে। তাই আর্যদের গর্ভাধান হতে ষোড়শ বৈদিক সংস্কার প্রয়েছে, যা বনবাসের কঠোর জীবনে যথাযথভাবে পালন করা দুঃসাধ্য কিংবা অসাধ্য ছিল। শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন আর্য রাজবংশোদ্ভূত ক্ষত্রিয়, তাই তাঁর সন্তানদের এই সংস্কারসমূহ রাজোচিত মর্যাদায় সম্পন্ন করা, তাঁদের উপযুক্ত গুরুকুলে প্রেরণ এবং প্রথাগত শিক্ষার কথা বিবেচনা করেই তিনি ও দেবী সীতা বনবাসকালে সন্তান গ্রহণে বিরত ছিলেন, কেননা একথা সর্বজনবিদিত বনবাসে তারা তপস্বীর বেশে ছিলেন, তখন রাজোচিত সংস্কার পালন সম্ভব ছিল না। তদুপরি ঋষিকুলকে সুরক্ষার সংকল্পও তাঁদের সন্তান জন্মদানের সিদ্ধান্তের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই সমগ্র বিষয়টি শ্রীরাম ও সীতার একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। প্রকৃতপক্ষে সন্তান উৎপাদনের বিষয়টি যেকোনো দম্পতির নিজস্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি যদি কটাক্ষ করে তাহলে তাকে এক জঘন্য ইতর হিসেবেই ধরে নিতে হবে, ভদ্রলোকেরা সেসব ইতরের কটাক্ষকে নিষ্ঠীবনের মতোই ত্যাগ করেন। সুতরাং এ নিয়ে কোন অগম্যাগামী কি ভাবলো, কী ধরে নিলো? সেসব অনার্যের মুখ থেকে নির্গত বরাহপূরীষসম বাক্য বাস্তব বরাহপূরীষের ন্যায়ই উপেক্ষণীয়। 
 
✅ উপরিউক্ত তথ্যপ্রমাণ ও যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, শ্রীরামচন্দ্র ও দেবী সীতা বনবাসকালে সচেতনভাবেই সন্তান গ্রহণের পরিকল্পনা পরিহার করেছিলেন। এর সপক্ষে প্রধান কারণসমূহ হলো—
১. অরণ্যজীবন ছিল অত্যন্ত বিপদসংকুল, 
২. নিরন্তর রাক্ষসদলের আক্রমণের আশঙ্কা বিদ্যমান ছিল, 
৩. শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ রাক্ষস দমনে ও ঋষিকুল রক্ষায় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন, 
৪. বনবাসের প্রতিকূল পরিবেশে শিশুর লালনপালন ছিল দুরুহ এবং জীবনহানির প্রবল সম্ভাবনা ছিল, 
৫. অরণ্যে অবস্থানকালে তারা তপস্বীর বেশে ছিলেন 
৬. অতএব সন্তানাদির রাজবংশোচিত বৈদিক সংস্কার প্রদান ও উপযুক্ত গুরুকুলে শিক্ষালাভের সুযোগ ছিল না। 
 
  • [ দ্বিতীয় অংশ, প্রতিপাদন ]
  • লবকুশ রাবণের সন্তান হওয়া কেন অসম্ভব?

আমরা অবগত যে, রাবণ সীতাকে অপহরণ করলেও তাঁর সম্মতির মাধ্যমেই পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হতে চেয়েছিলো এবং এই বিবরণ রামায়ণে সপ্রমাণ বিদ্যমান। রামায়ণের আখ্যান সম্পর্কে যাঁদের যৎসামান্য জ্ঞান আছে তাঁরাও জানেন যে, অশোকবাটিকায় বন্দিনী থাকাকালে রাবণ সীতাকে বারবার ভীতি প্রদর্শন করেছে, এমনকি বিবাহে সম্মতির জন্য বাধ্য করতে প্রাণনাশের হুমকিও প্রদান করেছে। তথাপি সীতা বারবার তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং রাবণ যেন পুনরায় তাঁকে স্পর্শ করতে না পারে সে বিষয়ে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
 
​রাবণ সীতাকে খুব সহজে হরণ করে নিয়ে এলেও বিবাহের ক্ষেত্রে বিষয়টি সরল ছিল না। কারণ সে পারিবারিক ও রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন ছিলো। তখন মেঘনাদ, অতিকায়, অক্ষয়কুমার, নরান্তক ও দেবান্তকের মতো তাঁর পুত্রগণ তখন প্রাপ্তবয়স্ক ও অধিকাংশ বিবাহিত। তদুপরি রাবণের প্রধানা মহিষী মন্দোদরী, তাঁর শ্বশুর, মাতামহ মাল্যবান এবং ধর্মাত্মা বিভীষণের মতো রাজবংশের প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গ প্রকাশ্যে বারবার সীতাকে প্রত্যর্পণের জন্য বলেছিলেন। যুদ্ধকাণ্ডে রাবণের ভ্রাতা কুম্ভকর্ণও এই কার্যের নিন্দা করেছেন। গুটিকয়েক গোয়ার ছেলে আর তোষামোদী মন্ত্রী ছাড়া রাক্ষসকুলে রাবণের পক্ষধর ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে সীতা রাবণকে স্বেচ্ছায় বিবাহ করছেন এমন দেখাতে পারলে রাবণের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তাই উক্ত পারিবারিক ও রাজনৈতিক চাপ এড়াতে রাবণ সকলকে এটি দেখাতে চেয়েছিলো যে সীতা স্বেচ্ছায় তাঁকে বরণ করছেন। তাই বিবাহটি নিন্দনীয় নয়। সুতরাং, রামায়ণ অনুসারে রাবণ দুরাচারী হওয়া সত্ত্বেও পারিবারিক বা রাজনৈতিক যে কারণেই হোক সীতাকে সম্মত হওয়ার জন্য এক বছর সময় দিয়েছিলো। অপপ্রচারকারী যাদের নিজের পূর্বজ মনে করে সেই মধ্যপ্রাচ্যের সুমগান রুহানি পিতারা তো যুদ্ধে বিজিত নারীদের সর্বোচ্চ সম্মান ও সুমহান মর্যাদা নিশ্চিত করতে সহবতার্থে ঝাপিয়ে পড়তেন, তবে এতোটা মহান রাবণও ছিলো না। ভেবে হাসির উদ্রেক হচ্ছে যে, আর্যাবর্ত যে অপরাধের জন্য রাবণকে এতো কঠোর নিন্দা করে সেই অপরাধও অগম্যাগামীর হিল্লে পিতা দানবদের তুলনায় নগণ্য। ভাগ্যক্রমে রাবণ সেই দানবদের কাছে প্রশিক্ষণ নেয়নি, যদি নিতো তাহলে হয়তো সে সমতুল্য জঙ্গি হতে পারতো । 
 
যাইহোক, যখন ভগবান শ্রীহনুমান লঙ্কার অশোকবাটীকায় গিয়ে মাতা সীতার সন্ধান পান। সেদিন দৈবক্রমে রাবণ সীতাকে বিবাহে রাজি করানোর জন্য সেখানে আসে। প্রথমে সে সুন্দর ভাষায় কথা বলতে থাকে। সে বলে—
“এবং চৈবমকামাং ত্বাং ন চ স্প্রক্ষ্যামি মৈথিলি।
কামঃ কামঃ শরীরে মে যথাকামঃ প্রবর্ততাম্ ॥”
​অর্থ— “মিথিলেশনন্দিনি! এমতাবস্থায়ও, তুমি যতদিন না চাইবে, আমি তোমাকে স্পর্শ করব না। বরং কাম আমার শরীরের উপর যথেচ্ছ অত্যাচার করুক, তাও।” (সুন্দর০। ২০। ০৬) 
 
এরপর (২০ তম সর্গে) আমরা দেখি রাবণ সীতাকে বহুবিধ প্রলোভন দেয়। যেন সীতা তাকে বিবাহ করেন। কিন্তু সীতা রাবণকে অত্যন্ত কঠোর ভাষার প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা করে বহু কথা বলেন (২১ তম সর্গে)। তন্মধ্যে কিছু কথা নিম্নরূপ—
“ ​শক্যা লোভবয়িতুং নাহমৈশ্বর্যেণ ধনেন বা।
অনন্যা রাঘবেণাহং ভাস্করেণ যথা প্রভা ॥ ১৫ ॥
​উপধায় ভুজং তস্য লোকনাথস্য সংষ্কৃতম্।
কথং নামোপধাস্যামি ভুজমন্যস্য কস্যচিৎ ॥ ১৬ ॥
​অহমৌপয়িকী ভার্যা তস্যৈব চ ধরাপতেঃ।
ব্রতস্নাতস্য বিদ্যেব বিপ্রস্য বিদিতাত্মনঃ ॥ ১৭ ॥
​মিত্রৌপয়িকং কর্তুং রামঃ স্থানং পরীপ্সতা।
বধঞ্চানিচ্ছতা ঘোরং ত্বয়াসৌ পুরুষর্ষভঃ ॥ ১৯ ॥
​বিদিতঃ সর্বধর্মজ্ঞঃ শরণাগতবৎসলঃ।
তেন মৈত্রী ভবতু তে যদি জীবিতুমিচ্ছসি ॥” ২০ ॥
অর্থাৎ —​তুমি ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য বা ধনসম্পত্তি দিয়ে আমাকে লুব্ধ করতে পারবে না। রশ্মি যেমন সূর্য থেকে পৃথক করা যায় না, তেমনি আমি ও শ্রীরঘুনাথ অভিন্ন (১৫)। জগদীশ্বর শ্রীরামচন্দ্রের সম্মানিত বাহুতে আশ্রয় নেওয়ার পর, আমি কি করে অন্য কোন পুরুষের ভুজলগ্না হব (১৬)। যেমন বেদবিদ্যা আত্মজ্ঞানী স্নাতক ব্রাহ্মণের সম্পত্তি, তেমনি আমি কেবলমাত্র পৃথিবীপতি শ্রীরঘুনাথের প্রিয়া ভার্যা হওয়ার যোগ্যা (১৭)। যদি তোমার আপন নগরের সুরক্ষা ও বন্ধন ভয় রহিত হওয়ার ইচ্ছা থাকে, তবে ভগবান শ্রীরামের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নাও, যেহেতু তিনিই একমাত্র যোগ্য ব্যক্তিত্ব (১৯)। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র সমস্ত ধর্মের জ্ঞাতা ও শরণাগতের প্রতি স্নেহশীলরূপে বিখ্যাত। যদি জীবিত থাকতে চাও, তাঁর সঙ্গে তোমার মৈত্রী স্থাপন করা উচিত (২০)।
(সুন্দরকাণ্ড। ২১। ১৫-২০)
 
সীতার কাছে, স্বাভাবিকভাবেই দুষ্ট লোকের মিষ্টি কথায় কাজ হয়নি। তাই সুন্দরকাণ্ডের ২২ তম সর্গে দুষ্টাত্মা রাবণ সীতাকে উদ্দেশ্য করে বলে—
“ পরুষাণি হি বাক্যানি যানি যানি ব্রবীষি মাম্।
তেষু তেষু বধো যুক্তস্তব মৈথিলি দারুণঃ ॥ ॥
​এবমুক্ত্বা তু বৈদেহীং রাবণো রাক্ষসাধিপঃ।
ক্রোধসংরক্তসংযুক্তঃ সিতামুত্তরমব্রবীৎ ॥” (৬-৭) ॥
অর্থ— ‘বিদেহরাজকুমারী! তুমি আমাকে যে যে কঠোর বাক্যসমূহ বলছ, সেগুলির জন্য তোমাকে কঠোর প্রাণদণ্ড দেওয়া উচিত (৬)।’ বিদেহরাজকুমারী সীতাকে এইপ্রকার বলে ক্রোধের আবেশে পরিপূর্ণ রাক্ষসরাজ রাবণ তাঁকে পুনরায় প্রত্যুত্তর দিল (৭)—
 
“ ​দ্বৌ মাসৌ রক্ষিতব্যৌ মে যোহবধিন্তে ময়া কৃতঃ।
ততঃ শয়নমারোহ মম ত্বং বরবর্ণিনি ॥” ৮ ॥
অর্থ— শ্রেষ্ঠা সুন্দরী! আমি তোমাকে যে সময়সীমা দিয়েছিলাম, তার আর মাত্র দুই মাস অবশিষ্ট আছে। অতএব, এই সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তোমাকে আমার শয্যায় আসতে হবে।
​দ্বাভ্যামূর্ধ্বং তু মাসাভ্যাং ভর্তারং মামনিচ্ছতীম্।
মম ত্বং প্রাতরাশার্ধে সূদাশ্চেৎস্যন্তি খণ্ডশঃ ॥ ৯ ॥
অর্থ— ‘অতএব মনে রেখো— দুই মাস পর্যন্ত সময়ের পরে পতিরূপে আমাকে না চাইলে, সূপকারগণ আমার প্রাতরাশের জন্য তোমাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলবে!’
 
এখন প্রশ্ন আসে রাবণ কতটুকু সময় মাতা সীতাকে দিয়েছিলো এই প্রসঙ্গে স্পষ্ট উত্তর পাই স্বয়ং সীতার কাছ থেকে। সুন্দরকাণ্ডের ৩৭ তম সর্গে মাতা সীতা হনুমানকে বলছেন—
“ স বাচ্যঃ সংত্বরস্বেতি যাবদেব ন পূর্যতে।
অয়ং সংবৎসরঃ কালস্তাবদ্ধি মম জীবিতম্ ॥” (সুন্দর০ ৩৭। ৭) ॥
অর্থ— হে হনুমান, তুমি গিয়ে রামকে অতি শীঘ্র ব্যবস্থা করতে বলো, যাতে রাবণকর্তৃক নির্দিষ্ট এক বৎসর কাল পূর্ণ না হয়। কারণ ততদিন পর্যন্তই আমার আয়ু (তারপর রাবণ আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে অথবা জোরপূর্বক বিয়ে করবে)।
 
“ ​বর্ততে দশমো মাসো দ্বৌ তু শেষৌ প্লবঙ্গম।
রাবণেন নৃশংনেন সময়ো যঃ কৃতো মম ॥” (ঐ- ৮) ॥
অর্থ— রাবণ বৎসর কাল পর্যন্ত আমাকে যে সময় দিয়েছে, তার দশম মাস বর্তমানে অতিবাহিত হচ্ছে। অতএব, আমার জীবনের দুই মাস কাল মাত্র অবশিষ্ট আছে।
 
মাতা সীতা রামচন্দ্র ছাড়া অপর কোনো পুরুষকে স্পর্শ করেন নি। এ বিষয়ে তিনি সুন্দরকাণ্ডের, সর্গ ৩৭ এ-ই হনুমানকে বলেছিলেন,
“ নাহং স্প্রষ্টুং স্বতো গাত্রমিচ্ছেয়ং বানরোত্তম” (শ্লোক-৬২)॥ ​
“ যদহং গাত্রসংস্পর্শং রাবণস্য গতা বলাৎ।
অনীশা কিং করিষ্যামি বিনাথা বিবশা সতী” (শ্লোক- ৬৩) ॥
অর্থ— হে বানরকুলশ্রেষ্ঠ! ….পতিভক্তির কথা মনে রেখে, আমি শ্রীরামচন্দ্র ব্যতিরেকে অন্য কোন পুরুষের শরীর স্বেচ্ছায় স্পর্শ করতে পারি না (৬২)। হরণকালে আমার শরীরে রাবণের দ্বারা যে স্পর্শ হয়েছে, তা রাক্ষস রাবণের বলপ্রয়োগ হেতু ঘটেছে। তৎকালে, অসমর্থ-অনাথ এবং বিবশ-বিহ্বল আমার আর কী করণীয় ছিল? (৬৩)।
 
✅ এখন আমরা উপরোক্ত শ্লোকগুলো থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি, যে রাবণ মাতা সীতাকে জোরপূর্বক অপহরণ করলেও তাঁকে বিবাহ কিংবা ধর্ষণ করে নি। একথা স্বয়ং রাবণেরই উক্তি, এবং হনুমান তৎকালে শ্রোতারূপে উপস্থিত ছিলেন। সারকথা, রাবণ এমন কোনো কাজ করেনি যদ্দ্বারা তিনি সন্তানসম্ভবা হতে পারেন। বরং সময় বেধে দিয়েছিলো যাতে সীতা নিজ ইচ্ছায় বিবাহ করেন। 
 
✅ রাবণ সীতাকে তাঁর মন পরিবর্তনের জন্য এক বৎসর সময় প্রদান করেছিল এবং তন্মধ্যে দশ মাস অতিক্রান্ত হয়েছিল। সীতা যদি রাবণ কর্তৃক যৌন নিপীড়নের শিকার হতেন, তবে এই দশ মাস সময়ের মধ্যে তাঁর গর্ভসঞ্চার বা সন্তান প্রসবের লক্ষণ পরিলক্ষিত হতো কি না, সেটি বিচার্য। বীর হনুমান যখন অশোকবনে সীতার সাক্ষাৎ লাভ করেন, তখন কি তিনি সন্তানসম্ভবা ছিলেন? এর উত্তর না।
এরপরে আরো কিছু বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যাক—
 
রামায়ণে যখন রাবণকে বধ করা হলো, হনুমানের মাধ্যমে সেই সংবাদ পেয়ে সীতা মুক্তি ও স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আনন্দের আতিশয্যে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। “প্রহর্ষবশমাপন্না নির্বাকাস্মি” (যুদ্ধকান্ড। ১১৩। ১৪-১৬) ॥ এছাড়া তিনি এই প্রিয় সংবাদ দেয়ায় আনন্দে আত্মহারা হয়ে হনুমানকে পুরষ্কার দিতে চাইলেন। কিন্তু কি পুরষ্কার দিবেন তা নির্ণয় করে উঠতে পারলেন না। (শ্লোক, ১৮–১৯) এরপর বললেন, হে হনুমান, স্বর্ণ, রৌপ্য, রত্নাদি অথবা ত্রিভুবনের রাজ্যপাটও তোমার দেওয়া আনন্দ সংবাদের সমতুল্য হবে না। “হিরণ্যং বা সুবর্ণং বা রত্নানি বিবিধানি চ। রাজ্যং বা ত্রিষু লোকেষু এতন্নার্হতি ভাষিতম ॥” (শ্লোক ২০) রাবণ কর্তৃক নিযুক্ত যে দাসীরা রাবণের সাথে বিবাহের জন্য সীতাকে দিনরাত মানসিক পীড়া দিতো। ভয় দেখাতো ও কঠোর কথা বলতো, হনুমান তাদের দণ্ড দিতে চাইলে সীতা তাদেরও ক্ষমা করলেন, বললেন, “প্রাপ্তব্যং তু দশাযোগান্ময়ৈতদিতি নিশ্চিতম্” 
 
এরপর যখন বহুদিন পর রামের সাথে সীতার সাক্ষাৎ হলো, তখনকার বর্ণনায় রামায়ণ বলছেন—
“ ​বিস্ময়াচ্চ প্রহর্যাচ্চ স্নেহাচ্চ পতিদেবতা।
উদৈক্ষত মুখং ভর্তুঃ সৌম্যং সৌম্যতরাননা॥” ৩৫ ॥
অর্থ— সীতাদেবীর মুখমণ্ডলেও ছিল সৌম্যকান্তি; তিনি নিজ পতিকে দেবতা রূপে জ্ঞান করতেন। সেইহেতু বিস্ময় ও হর্ষে স্বীয় পতির মনোহর মুখচন্দ্র সস্নেহে দর্শন করলেন।
“ সূচিরমদৃষ্টমুদীক্ষ্য বৈ প্রিয়স্য।
বদনমুদিতপূর্ণচন্দ্রকান্তঃ।
বিমলশশাঙ্কনিভাননা তদাহসহীৎ ॥” ৩৬ ॥
অর্থ— তদনন্তর, বহুদিন প্রিয়তমের অদর্শনজনিত মনঃকষ্ট ভুলে সীতা দেবতুল্য পতির উদয়কালীন পূর্ণচন্দ্রের মতো কান্তিমান মুখসৌন্দর্য নিরীক্ষণ করলেন এবং সাথে-সাথেই তাঁর স্বীয় মুখশ্রী নিষ্কলঙ্ক চন্দ্রমাসদৃশ সৌম্যদীপ্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। (যুদ্ধ০ । ১১৪। ৩৫-৩৬)
 
✅ সমীক্ষা—এখানে মাতা সীতাকে আমরা দেখছি, তাঁকে অত্যন্ত প্রসন্নচিত্তই দেখা গেল। তিনি সংবাদ শুনে আনন্দে বাকরুদ্ধ হলেন। এরপর যখন অনেকদিন পর রামের কাছে এলেন তখন অতি স্নেহে আবেগে ও আনন্দ রামকে দেখলেন। তাঁর আচরণে তখন কোনো সংশয়, কিংবা ঔদাসীন্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যদি পাপিষ্ঠ অগম্যাগামীটির কল্পনার বিন্দুমাত্র সত্যতা থাকত অর্থাৎ মাতা সীতা রাবণের সন্তান ধারণ করতেন, বা বলাৎকারের শিকার হতেন, তাহলে তার চিত্ত এমন প্রফুল্ল এবং আচরণ এমন প্রাণবন্ত হতো না। সীতা সতী ও পতিব্রতা নারী ছিলেন, রাবণ তাকে বলাৎকার করলে তিনি রামের কাছে প্রসন্নভাবে আসা তো দূর তিনি আ*ত্মহত্যাই হয়তো করতেন। এই ইঙ্গিত দিয়ে তিনি হনুমানকে বলেছিলেন, “অয়ং সংবৎসরঃ কালস্তাবদ্ধি মম জীবিতম্......দ্বৌ তু শেষৌ প্লবঙ্গম।॥” (সুন্দর০ ৩৭। ৭-৮) ॥
 
এরপর যুদ্ধকাণ্ড সর্গ ১১৪ তে যখন আমরা দেখতে পাই (শুধু বঙ্গানুবাদ নিম্নরূপ)—
সীতা শিবিকায় এসেছেন জেনে অপ্রসন্ন শ্রীরাম বহুধা ভেবে বিভীষণকে বললেন (১৮) ‘সর্বদা আমার যুদ্ধজয়ের সহায়ক সৌম্য রাক্ষসরাজ! তুমি বিদেহকুমারীকে বলো ত্বরায় আমার চোখের সামনে আসতে।’(১৯) শ্রীরামের এই কথায় ধর্মজ্ঞ বিভীষণ অতিশয় ব্যগ্রতায় অন্যান্য ব্যক্তিগণকে দূরে দূরে সরিয়ে দিতে লাগলেন (২০)। পাগড়ী ও উর্দীয়মান পরিহিত বহুসংখ্যক রাজকীয় রাক্ষস হাতের বেত সশব্দে আন্দোলিত করে বানর সৈন্যগণকে দূরে সরিয়ে দিতে দিতে চারদিকে পায়চারি করতে লাগল (২১)। এইরূপে অপসৃত ভল্লুক, বানর এবং রাক্ষসগণ (অসন্তুষ্ট চিত্তে) শিবিকার নিকট হতে দূরে সরে দাঁড়াল (২২)। তখন বায়ুবেগে উত্তাল সমুদ্রের গর্জনের তুল্য অপসৃয়মাণ বানর সৈন্যাদির মধ্যে ঘোর কোলাহল উত্থিত হল (২৩)। চারিদিকে অপসার্যমাণ ভল্লুক-বানরাদির মনোমধ্যে মহা-উদ্বেগ হতে দেখে শ্রী রঘুনাথ সহজ উদারতায় অপসারণকারিদেরকে তা করতে নিষেধ করলেন (২৪)। সেইসময় শ্রীরাম অপসারণকারী রাজকীয় রাক্ষসগণকে অসন্তুষ্ট চিত্তে দেখতে লাগলেন। এই কাজে তাঁর চিত্তে ক্ষোভের সঞ্চার হল এবং তিনি পরম বুদ্ধিমান বিভীষণকে পরামর্শ দিয়ে অসন্তুষ্ট চিত্তে বললেন, (২৫) ‘বিভীষণ কি কারণে আমার অনুমতি ছাড়াই সকলকে ক্লেশ দিচ্ছ; এই উদ্বেগজনক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করো। এখানে যারা এসেছে সকলেই আমার বন্ধু-স্বজন (২৬)।’
 
অতঃপর রাম বললেন তার সেই বিখ্যাত কথাটি, যেই দর্শনটি কিনা মিথ্যাচারকারীর মান্য তমসাবৃত নিষ্ঠুর মতের খণ্ডন করে নারীর প্রতি সর্বাপেক্ষা উদার দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপন করে,
রামচন্দ্র বললেন,
“ ​ন গৃহাণি ন বস্ত্রাণি ন প্রকারাস্তিরস্ক্রিয়া।
নেদৃশা রাজসৎকারা বৃত্তমাবরণং স্ত্রিয়াঃ ॥” ২৭ ॥
অর্থ— গৃহ, বস্ত্র কিংবা প্রাচীরবেষ্টিত অন্তরাল—কোনোটিই নারীর প্রকৃত আবরণ নয়। রাজকীয় সম্মান প্রদর্শনের আড়ম্বরও এই তালিকায় পড়ে না। বস্তুত, নিজের চরিত্র এবং সদাচরণই হলো নারীদেরর শ্রেষ্ঠ ও অকৃত্রিম আবরণ।
“​বিসৃজ্য শিবিকাং তস্মাৎ পদভ্যামেবানপসর্পতু।
সমীপে মম বৈদেহীং পশ্যন্তেতে বনৌকসঃ ॥” ৩০ ॥
অর্থ— ‘অতএব জানকী পাল্কি থেকে নেমে পদব্রজে আমার অভিমুখে আসুন যাতে সকল বানরগণ তাঁকে দর্শন করতে পারে।’
​“ এবমুক্তস্তু রামেণ সবিমর্শো বিভীষণঃ।
রামস্যোপানয়ৎ সীতাং সন্নিকর্ষং বিনীতবৎ ॥” ৩১ ॥
অর্থ— শ্রীরাম কর্তৃক এইরূপে আদিষ্ট হলে বিভীষণ বিচার-বিবেচনাপূর্বক এবং বিনীতভাবে সীতাকে শ্রীরাম সমীপে নিয়ে এলেন।
“লজ্জয়া ত্ববলীয়ন্তী স্বেষু গাত্রেষু মৈথিলী।
বিভীষণেনানুগতা ভর্তারং সাভ্যবর্তত ॥” ৩৪ ॥
অর্থ— লজ্জায় সংকুচিত হয়ে মৈথিলী সীতা বিভীষণের অনুগমন করে স্বামী শ্রীরামচন্দ্রের সম্মুখে উপস্থিত হলেন।
তখন,
“ ​বিস্ময়াচ্চ প্রহর্যাচ্চ স্নেহাচ্চ পতিদেবতা।
উদৈক্ষত মুখং ভর্তুঃ সৌম্যং সৌম্যতরাননা” ॥ ৩৫ ॥
অর্থ— সীতাদেবীর মুখমণ্ডল ছিল সৌম্যকান্তি; তিনি নিজ পতিকে দেবতা রূপে জ্ঞান করতেন। সেইহেতু বিস্ময় ও হর্ষে স্বীয় পতির মনোহর মুখচন্দ্র সস্নেহে দর্শন করলেন।
“ সূচিরমদৃষ্টমুদীক্ষ্য বৈ প্রিয়স্য।
বদনমুদিতপূর্ণচন্দ্রকান্তঃ।
বিমলশশাঙ্কনিভাননা তদাহসহীৎ ॥” ৩৬ ॥
অর্থ— তদনন্তর, বহুদিন প্রিয়তমের অদর্শনজনিত মনঃকষ্ট ভুলে সীতা দেবতুল্য পতির উদয়কালীন পূর্ণচন্দ্রের মতো কান্তিমান মুখসৌন্দর্য নিরীক্ষণ করলেন এবং সাথে-সাথেই তাঁর স্বীয় মুখশ্রী নিষ্কলঙ্ক চন্দ্রমাসদৃশ সৌম্যদীপ্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।
 
✅ সমীক্ষা—এখানে যখন মাতা সীতাকে রামের কাছে নিয়ে আসা হচ্ছে তখন তিনি পালকিতে আসছিলেন। রাম বললেন, হেটে আসতে যাতে সব বানরসেনারা তাঁকে সামনা-সামনি দেখতে পারেন, —“পশ্যন্তেতে বনৌকসঃ”। যদি অগম্যাগামী হিল্লেকর্মোৎপন্ন সেই আক্ষেপকারীর আক্ষেপ অনুসারে সীতা যদি সন্তানসম্ভবা হতেন তাহলে সীতার আগমনের ব্যাপারটা এভাবে প্রকাশ্যে হতো না। রাম-লক্ষণ, সুগ্রীব ও বিভীষণ বিষয়টি গোপনেই রাখতেন, এভাবে প্রকাশ্যে এনে রাম সবাইকে সীতাদর্শনের সুযোগ দিতেন না। আর সবাই যেহেতু সচক্ষে সীতাকে দেখেছে তাই সীতার অবস্থা নিয়েও সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। উপর্যুক্ত প্রমাণাদি নিজেই যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অগম্যাগামী অপপ্রচারকারী দুর্মুখের দুই গণ্ডে বারংবার পাদুকাঘাত করলো। 
 
  • [ তৃতীয় অংশ, অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন ]
 
এতক্ষণ আলোচনার পর সর্বশেষে আমরা এই লিখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক উপস্থাপন করছি। এই শ্লোক উপস্থাপিত হলে আর কিছুই বলতে হয় না। এবং এক বোলে হিলেকর্মোৎপন্ন অপদার্থ বোল্ড আউট হয়ে যায়। লবকুশের বর্ণনা রামায়ণের আদিকাণ্ডেই এসেছে। আদিকাণ্ডের চতুর্থ সর্গের একাদশ শ্লোকে লব-কুশ সম্পর্কে বলা হচ্ছে—
“রূপলক্ষণসম্পন্নৌ মধুরস্বরভাষিণৌ।
বিম্বাদিবোত্থিতৌ বিম্বৌ রামদেহাত্তথাপরৌ ॥ ”
(রামায়ণ আদিকাণ্ড। ০৪। ১১)
​অর্থ— কুশ ও লব ভ্রাতৃদ্বয় রূপবান এবং শুভলক্ষণযুক্ত, মধুর স্বরে আলাপকারী এবং জলবিম্ব থেকে উত্থিত জলবিম্ববৎ তাঁরা যেন শ্রীরামের দেহ থেকে জাত শ্রীরামেরই দুটি প্রতিবিম্ব।
 
অর্থাৎ লব ও কুশ দুই ভাই দেখতে হুবহু শ্রীরামের মত চেহারাবিশিষ্ট ছিলেন। যদি তারা রামের পুত্র না হতেন তাহলে কীভাবে হুবহু রাম সদৃশ চেহারা হওয়া সম্ভব? অগম্যাগামীটি কি এই প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম? উত্তর কদাচিৎ নয়। 
 
সুতরাং অগম্যাগামীটি নিজের বরাহপূরীষসম চিন্তাধারা নিজের পেটের ভেতরেই রাখুক। উপযুক্ত শাস্ত্রপ্রমাণ দ্বারা অগম্যাগামীর মুখোপরি উপর্যুপরি পাদুকাঘাত করে করে ওর মিথ্যাচারটিকে ধূলিস্যাৎ করে দেওয়া হলো। অনুরোধ করছি, হে মূর্খ! নিজ উদরস্থিত এসব বরাহপূরীষ নিজের মুখবিবর দিয়ে আর বের করো না, নইলে পুনশ্চ চরম পাদুকাঘাত করা হবে। আমি স্বাধ্যায়হীন অকিঞ্চন এক ব্যাক্তি তাই লেখায় যথেষ্ট ভুলত্রুটি থাকতে পারে। বিদ্বানগণ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
 
ইত্যোম্ শম্
বিদুষাং বশংবদঃ
তথ্য ও প্রযুক্তি সমন্বয়ক
বাংলাদেশ অগ্নিবীর, সিলেট বিভাগীয় শাখা