যজুর্বেদ ১৩.৪৯ - নীলগাই হত্যা ?
মহর্ষি দয়ানন্দ Vs পৌরাণিক সম্প্রদায়
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী আর্যাবর্তে গো-রক্ষা এবং বেদভাষ্যে শুদ্ধতা আনয়নের জন্য প্রখ্যাত। কিন্তু ইদানিং কালে দেখা যাচ্ছে অনেক অপপ্রচারকারী মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর ওপর এই অভিযোগ আনছে যে, তিনি যজুর্বেদ ভাষ্যে নীলগাই তথা গোবধের উল্লেখ করেছেন। এই দাবিটি কতটা হাস্যকর! যিনি কিনা প্রথমদ দ্ব্যর্থকণ্ঠে স্বীকার করেছেন যে, সনাতন ধর্ম কখনোই গোবধ স্বীকার করেনি, তাঁর নামেই আজ অপপ্রচারকারীরা এই ধরনের অভিযোগ আনছে। তাও সেই অভিযোগ কারা করছে ? যে স্মার্ত-পৌরাণিক পরম্পরা গোবধ, অশ্লীলতা ইত্যাদি ব্যাখ্যা বেদে প্রবেশ করিয়ে জনসাধারণে বেদের প্রতি অনীহা তৈরি করেছে। আসুন, তাদের এই দাবিটির সত্যতা যাচাই করি।
আলোচ্য মন্ত্রগুলো হলো—
ইমং মা হিꣳসীরেকশফং পশুং কনিক্রদং বাজিনং বাজিনেষু। গৌরমারণ্যমনু তে দিশামি তেন চিন্বানস্তন্বো নিষীদ। গৌরং তে শুগৃচ্ছতু যং দ্বিষ্মস্তং তে শুগৃচ্ছতু ॥১৩.৪৮
ইমং সাহস্রং শতধারমুৎসং ব্যচ্যমানং সরিরস্য মধ্যে। ঘৃতং দুহানামদিতিং জনায়াগ্নে মা হিংসীঃ পরমে ব্যোমন্। গবয়মারণ্যমনু তে দিশামি তেন চিন্বানস্তন্বো নিষীদ। গবয়ং তে শুগৃচ্ছতু যং দ্বিষ্মস্তং তে শুগৃচ্ছতু ॥১৩.৪৯
ইমমূর্ণায়ুং বরুণস্য নাভিং ত্বচং পশূনাং দ্বিপদাং চতুষ্পদাম্। ত্বষ্টুঃ প্রজানাং প্রথমং জনিত্রমগ্নে মা হিংসীঃ পরমে ব্যোমন্। উষ্ট্রমারণ্যমনু তে দিশামি তেন চিন্বানস্তন্বো নিষীদ। উষ্ট্রং তে শুগৃচ্ছতু যং দ্বিষ্মস্তং তে শুগৃচ্ছতু ॥১৩.৫০
অজো হ্যগ্নেরজনিষ্ট শোকাৎ সোঽ অপশ্যজ্জনিতারমগ্রে। তেন দেবা দেবতামগ্রমায়ংস্তেন রোহমায়ন্নুপ মেধ্যাসঃ। শরভমারণ্যমনু তে দিশামি তেন চিন্বানস্তন্বো নিষীদ। শরভং তে শুগৃচ্ছতু যং দ্বিষ্মস্তং তে শুগৃচ্ছতু ॥১৩.৫১
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী-কৃত ভাষ্যানুবাদের যে অংশটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয় তা হলো—
[১৩.৪৮] মনুষ্যৈরেকশফা অশ্বাদয়ঃ পশবঃ কদাচিন্নো হিংস্যাঃ, ন চোপকারকা আরণ্যাঃ। যেষাং হননেন জগতো হানী রক্ষণেনোপকারশ্চ ভবতি, তে সদৈব পালনীয়া হিংস্রাশ্চ হন্তব্যাঃ = মানুষদের উচিত এক খুরওয়ালা ঘোড়া প্রভৃতি পশু এবং উপকারী বনের পশুকে কখনও কেউ মারবে না। যাদের মারলে জগতের ক্ষতি এবং না মারলে সবার উপকার হয় তাদের সবসময় লালন-পালন করবে এবং যারা ক্ষতিকর পশু তাদের মারবে।
[১৩.৪৯] যে চ জাঙ্গলা গবয়াদয়ো প্রজাহানিং কুর্যুস্তে হন্তব্যাঃ = যে বন্য নীলগাই ইত্যাদি প্রজার ক্ষতি করে, তারা তাড়াবার/মারার যোগ্য।
হন্ ধাতুর [ধাতু০ ২।২] দ্বারা এখানে বধ ও গতি দুটোই নেওয়া যায়। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী এই মন্ত্রেই (অদিতিম্) অখণ্ডনীয়াং গাম্ ~ অর্থাৎ অহন্তব্য গাভীর উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ গাভী বধ নিষিদ্ধ করেছেন। এরপরেও 'গবয়ম্' অর্থ 'গোসদৃশম্' = 'গাভীর ন্যায়' লিখেছেন। সুতরাং ভাবার্থে মারা অর্থ ক্ষতিকর পশুদের তাড়ানোই সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত। আর যদি কেউ 'বধ'ই সঠিক অর্থ মনে করেন তাতেও কোনো নিষেধ নেই, কেননা মহর্ষি দয়ানন্দ একই ভাবার্থে দুটি বিষয় লিখেছেন, যথা-
(১) রাজমনুষ্যা যেভ্যো বৃষাদিভ্যঃ কৃষ্যাদিনি কর্মাণি ভবন্তি, যাভ্যো গবাদিভ্যো দুগ্ধাদিপদার্থা জায়ন্তে, যৈঃ সর্বেষাং রক্ষণং ভবতি তে কদাচিন্নৈব হিংসনীয়াঃ। য এতান্ হিংস্যুস্তেভ্যো রাজাদিন্যায়েশা অতিদণ্ডং দদ্যুঃ = যেসব বৃষাদি পশুদিগের প্রভাবে কৃষি আদি কার্য, যে সব গাভি আদি থেকে দুগ্ধ, ঘৃতাদি উত্তম পদার্থ হয়, যার দুগ্ধাদির মাধ্যমে সকল প্রজার রক্ষা হয়, তাদের কখনও মারবে না এবং যারা সেই উপকারী পশুদের মারবে তাদের রাজাদি ন্যায়াধীশ অত্যন্ত দণ্ড দেবে।
(২) জাঙ্গলা গবয়াদয়ো প্রজাহানিং কুর্যুস্তে = জংলী গবয়াদি যারা কিনা প্রজার ক্ষতি করে...
সুতরাং যেখানে উপকারী প্রাণীর রক্ষার নির্দেশ আছ এবং অন্যাদি পশুকে তখনই দণ্ডের নির্দেশ আছে যখন কিনা প্রজার জন্য ক্ষতিকর, সেখানে পৌরাণিক-স্মার্তদের মতো যজ্ঞে পশুবলি দেওয়া বা গোবধকারীদের অপব্যাখ্যা তথা মিথ্যাচার কখনোই ধর্তব্য নয়। পাশাপাশি মহর্ষি সর্বত্রই এই দণ্ডের অধিকার সাধারণ মানুষকে দেননি, বরং 'হে রাজন্', 'রাজাদিন্যায়েশা অতিদণ্ডং দদ্যুঃ' অর্থাৎ, যারা রাজকর্মকর্তা রয়েছেন তাদেরই দিয়েছেন।
একই কথা উটের বেলাতেও মহর্ষি লিখেছেন—
[১৩.৫০] হে রাজন্! যেষামব্যাদীনাং লোমানি ত্বগপি মনুষ্যাণাং সুখায় প্রভবতি, য উষ্ট্রা ভারং বহন্তো মনুষ্যান্ সুখয়ন্তি, তান্ যে হন্তুমিচ্ছেয়ুস্তে জগৎপীড়কা বিজ্ঞেয়াঃ সম্যগ্ দণ্ডনীয়াশ্চ, যে চারণ্যা উষ্ট্রা হানিকরাস্তেঽপি দণ্ডনীয়াঃ = হে রাজন! যে সব ভেড়া ইত্যাদির লোম ও ত্বক দ্বারা মানুষদের সুখের জন্য হয় এবং যে উট ভার বইয়ে মানুষকে সুখ দেয় তাদেরকে যে দুষ্ট ব্যক্তিরা মারতে চায় তাদেরকে সংসারের দুঃখদায়ক মনে করবে এবং তাদেরকে ভালোমতো দণ্ড দেওয়া উচিত এবং যে বন্য উট ক্ষতিকারক হয় তাদেরও দণ্ড দেওয়া উচিত।
[১৩.৫১] রাজজনৈরজাদীনহত্বা সংরক্ষ্যৈতে উপকারায় সংয়োজনীয়াঃ। যে শুভপশুপক্ষিহিংসকা ভবেয়ুস্তে ভৃশং তাডনীয়াঃ। যদি শল্যকী হানিকারিকা স্যাৎ, তর্হি সা প্রজাপালনায় হন্তব্যা = মানুষদের উচিত যে, ছাগল ও ময়ূর প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ প্রাণিদের মারবে না এবং এদের রক্ষা করে উপকারের জন্য নিয়োজিত করবে এবং যে ভালো পশু ও পাখির হত্যাকারী হবে তাদেরকে শীঘ্র শাস্তি দেবে। তবে যে ক্ষেত ধ্বংসকারী পঙ্গপাল প্রভৃতি আছে তাদেরকে প্রজার রক্ষার জন্য মারবে।
তাই 'মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তার ভাষ্যে গোবধ করতে বলেছেন' — এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং মূল ভাষ্যগত টেক্সটের মূল সুরের পরিপন্থী। এখানে 'নির্বিচারে' পশু হত্যার কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি, বরং অত্যন্ত কঠোরভাবে পশু সংরক্ষণ, পালন-পোষণ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুক্তির খাতিরে নিম্নলিখিত পয়েন্টগুলো পর্যালোচনা করি আসুন–
১. নির্বিচার হত্যার স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা: টেক্সটে পরিষ্কার বলা হয়েছে—ঘোড়া, ভেড়া, উট, ছাগল ও ময়ূরের মতো উপকারী গৃহপালিত ও বন্য পশু-পাখিদের "কখনো কেউ মারবে না" এবং এদের হত্যাকারীদের "শীঘ্র তাড়না" বা কঠোর শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
২. উপকারিতা ও উপযোগিতার নীতি: স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, "যাদের মারলে জগতের ক্ষতি এবং না মারলে সকলের উপকার হয় তাদের সর্বদা পালন পোষণ করবে।" অর্থাৎ, পরিবেশ ও মানবসমাজের জন্য উপকারী প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখা এবং লালন-পালন করা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
৩. আত্মরক্ষা এবং ফসল রক্ষা (অন্যায় হত্যা নয়): যেখানে হত্যার কথা বলা হয়েছে, তা কোনো ‘শিকার’ বা ‘নির্বিচার হত্যা’ নয়; বরং তা হলো আত্মরক্ষা ও সমাজ রক্ষার তাগিদে। যেমন—ক্ষেত বা ফসল ধ্বংসকারী পঙ্গপাল (যা দুর্ভিক্ষ ডেকে আনতে পারে) এবং প্রজার ক্ষতিসাধনকারী হিংস্র বা ক্ষতিকর পশুকে দণ্ড দেওয়া বা মারার কথা বলা হয়েছে। এটি আইন ও শৃঙ্খলার অংশ, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড নয়।
৪. গো-বধ প্রসঙ্গে: পুরো টেক্সটে কোথাও গো-বধের দূরদূরান্তের কোনো উল্লেখ বা সমর্থন নেই। উল্টো, যে নীতি এখানে দেওয়া হয়েছে (উপকারী পশুকে রক্ষা ও পালন করা), সেই নীতি অনুযায়ী 'গাভী' বা 'গো-বংশ' মানবজাতির জন্য সবচেয়ে উপকারী পশুদের অন্যতম। তাই এই টেক্সটের আদর্শ অনুযায়ী গো-বধ তো দূরের কথা, গো-বংশ রক্ষা ও পালন করা পরম কর্তব্য হিসেবে গণ্য হয়।
অতএব, এই বক্তব্যগুলোতে নির্বিচার পশুহত্যার কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। এখানে মূলত 'বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য' (Ecological Balance) এবং 'আইন-শৃঙ্খলা' বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে, যেখানে নিরীহ ও উপকারী পশুকে রক্ষা করার এবং মানবসমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদানকে দমন করার স্পষ্ট আইনি নির্দেশনা রয়েছে।
অন্যদিকে আমাদের পৌরাণিক ভাইদের প্রিয় মহীধর-উবট ভাষ্যনুযায়ী এই মন্ত্রগুলোর অনুবাদ দেখুন—
৪৮. [(৪৭- যদি বাদনেচ্ছা তর্হি মেধং শুদ্ধং ময়ুং পশুং তুরঙ্গবদনং কিম্পুরুষং পশুং জুষস্ব সেবস্ব ভক্ষয়েত্যর্থঃ)... তে তুভ্যমারণ্যং বনস্থং গৌরবর্ণ মৃগং দিশামি দদামি । তেন তন্বঃ চিন্বানো নিবিদেতি পূর্ববৎ ।]
হে অগ্নি!... গৌরবর্ণের মৃগকে ভক্ষণ করে তুমি তোমার জ্বালাসমূহকে পুষ্ট করো এবং অত্যন্ত সুখে এই চিতির বহির্দেশে অবস্থান কর।...
৪৯. হে অগ্নি!... ঐরূপ গোসদৃশ গবয়প্রাণীকে ভক্ষণ করে তুমি তোমার জ্বালাসমূহকে পুষ্ট কর এবং অত্যন্ত আনন্দে এই চিতির বহির্দেশে অবস্থান কর। হে অগ্নি! তোমার জ্বালাসমূহ গোসদৃশ গবয়প্রাণীকে প্রাপ্ত হোক। আমি যাকে দ্বেষ করি, হে অগ্নি! তোমার জ্বালাসমূহ ঐ দ্বেষকারীকে সম্প্রাপ্ত হোক।
৫০. হে অগ্নি!...ঐরূপ উট ভক্ষণ করে তুমি তোমার জ্বালাসমূহকে পুষ্ট কর এবং অত্যন্ত আনন্দে এই চিতির বহির্দেশে অবস্থান কর। হে অগ্নি! তোমার জ্বালাসমূহ উটকে প্রাপ্ত হোক। আমি যাকে দ্বেষ করি, হে অগ্নি! তোমার জ্বালাসমূহ ঐ দ্বেষকারীকে সম্প্রাপ্ত হোক।
৫১. হে অগ্নি!... আমি তোমাকে অরণ্যে বিচরণকারী অষ্টাপদ সিংহঘাতী শরভ নামক মৃগবিশেষ প্রদান করছি। ঐরূপ শরভপ্রাণীকে ভক্ষণ করে তুমি তোমার জ্বালাসমূহকে পুষ্ট কর এবং অত্যন্ত আনন্দে এই চিতির বহির্দেশে অবস্থান কর। হে অগ্নি!...
[রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার (RMIC) প্রকাশিত ‘বেদগ্রন্থমালা’ > ৩য় খণ্ড শুক্লযজুর্বেদ > মাধ্যন্দিন সংহিতা ১ম ভাগ]
যাদের ভাষ্যের অগ্নি দেবতা গৌরবর্ণের হরিণ, নীল গাই, উট, শরভ এসব খায় আর এই মন্ত্রগুলো পড়তে পড়তে ঘোড়া, গোরু, ভেড়া, ছাগলের কাটা মুণ্ডু নিয়ে নাড়াচাড়া করে সেসব পৌরাণিকরা আসে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর ভাষ্যে গোবধ খুঁজে বের করতে। মহর্ষি তো স্পষ্টভাবে লিখেছেন 'হিংস্রাশ্চ হন্তব্যাঃ', 'প্রজাহানিং', 'হানিকরাস্তেঽপি', 'হানিকারিকা স্যাৎ, তর্হি সা প্রজাপালনায় হন্তব্যা' অর্থাৎ সেসব হানিকর পশু যারা কিনা মানুষের সম্পদ এবং জীবনের জন্য বিপজ্জনক তাদেরকেই দণ্ড/বধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর মহীধর-উবট ইত্যাদি পৌরাণিকরা নির্বিচারে বিনাদোষে সেগুলোকে মারতে বলেছে। এজন্য পৌরাণিকদের দাবি কতোটা হাস্যকর ও ভিত্তিহীন বলাই বাহুল্য!
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর










0 মন্তব্য(গুলি)