BLANTERORBITv101

যজুর্বেদ ৩৭.৯ - অশ্বমলের ধূপ ? মহর্ষি দয়ানন্দ Vs পৌরাণিক সম্প্রদায়

Monday, May 25, 2026


  • যজুর্বেদ ৩৭.৯ - অশ্বমলের ধূপ ?
  • মহর্ষি দয়ানন্দ Vs পৌরাণিক সম্প্রদায়
 
অশ্বস্য ত্বা বৃষ্ণঃ শক্না ধূপয়ামি দেবয়জনে পৃথিব্যাঃ। মখায় ত্বা মখস্য ত্বা শীর্ষ্ণে। অশ্বস্য ত্বা বৃষ্ণঃ শক্না ধূপয়ামি দেবয়জনে পৃথিব্যাঃ। মখায় ত্বা মখস্য ত্বা শীর্ষ্ণে। অশ্বস্য ত্বা বৃষ্ণঃ শক্না ধূপয়ামি দেবয়জনে পৃথিব্যাঃ। মখায় ত্বা মখস্য ত্বা শীর্ষ্ণে। মখায় ত্বা মখস্য ত্বা শীর্ষ্ণে। মখায় ত্বা মখস্য ত্বা শীর্ষ্ণে। মখায় ত্বা মখস্য ত্বা শীর্ষ্ণে ॥
যজুর্বেদ ৩৭।৯
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী-কৃত ভাষ্যানুবাদ: হে মানব! আমি (পৃথিব্যাঃ) অন্তরীক্ষের (দেবয়জনে) বিদ্বান ব্যক্তিদের যজ্ঞস্থলে (বৃষ্ণঃ) বলবান (অশ্বস্য) অগ্নি প্রভৃতির (শক্না) দুর্গন্ধ নিবারণে সমর্থ ধূম আদি দ্বারা (ত্বা) তোমাকে (মখায়) বায়ু শুদ্ধ করার জন্য (ত্বা) তোমাকে (মখস্য) শোধক পুরুষের (শীর্ষে) শিরোরোগ নিবারণের উদ্দেশ্যে (ত্বা) তোমাকে (ধূপযামি) সম্যক তপ্ত করি। (পৃথিব্যাঃ) পৃথিবীর বিদ্বান ব্যক্তিদের (দেবযজনে) যজ্ঞস্থলে (বৃষ্ণঃ) বেগবান (অশ্বস্য) ঘোড়ার (শক্না) লিদ দ্বারা (ত্বা) তোমাকে, (মখায়) পৃথিব্যাদি জ্ঞানের জন্য (ত্বা) তোমাকে, (মখস্য) তত্ত্ববোধের (শীর্ষে) উত্তম অবয়বের জন্য (ত্বা) তোমাকে, (মখায়) যজ্ঞসিদ্ধির জন্য (ত্বা) তোমাকে, (মখস্য) যজ্ঞের (শীষ্ণে) উত্তম অবয়বের সিদ্ধির জন্য-প্রাপ্তির জন্য (ত্বা) তোমাকে (ধূপয়ামি) সম্যক তপ্ত করি, (পৃথিব্যাঃ) ভূমিতে (দেবযজনে) বিদ্বান ব্যক্তিদের পূজাস্থলে (বৃষ্ণঃ) বলবান (অশ্বস্য) শীঘ্রগামী অগ্নির (শক্লা) তেজ প্রভৃতি দ্বারা (ত্বা) তোমাকে (মখায়) উপযোগের জন্য (ত্বা) তোমাকে (মখস্য) উপযুক্ত কার্যের (শীর্ষে) উত্তম অবয়বের জন্য (ত্বা) তোমাকে (মখায়) যশলাভের উদ্দেশ্যে (ত্বা) তোমাকে (মখস্য) যজ্ঞের (শীর্ষে) উত্তম অবয়বের জন্য (ত্বা) তোমাকে (মখায়) যজ্ঞের জন্য, (ত্বা) তোমাকে এবং (মখস্য) যজ্ঞের (শীষ্ণে) উত্তম অবয়বের জন্য (ত্বা) তোমাকে (ধূপয়ামি) তপ্ত করি।
 
 
এখানে আপত্তির কী আছে ? মহর্ষি দয়ানন্দ ভাবার্থে লিখেছেন—
যে মনুষ্যা রোগাদিক্লেশনিবৃত্তয়ে বহ্ন্যাদীন্ পদার্থান্ সম্প্রয়ুঞ্জতে, তে সুখিনো জায়ন্তে = যে মানুষ রোগ আদি কষ্ট নিবারণের উদ্দেশ্যে অগ্নি প্রভৃতির ব্যবহার করে তারা সুখী হয়।
 
 
সুতরাং এখানে আপত্তির স্থান কোথায়? মন্ত্রে তপ্তের উল্লেখ আছে। মহর্ষি কোনো প্রয়োগ উল্লেখ করেননি যে কীভাবে করতে হবে বরং এই সংকেতের ব্যাখ্যা ভাবার্থে লিখেছেন যে অগ্নিসহ নানা তত্ত্ব ব্যবহার করে সুখী হতে হবে। অর্থাৎ মন্ত্র ও ভাষ্যে এটি একটি সংকেত মাত্র। আপনার যদি এতে বেশি আপত্তি থাকে তবে আসুন আপনাদের মান্য উপবেদ হিসেবে স্বীকার্য আয়ুর্বেদীয় প্রমাণও দেখি—
 
দীপনং কটু তীক্ষ্ণোষ্ণং বাতচেতোবিকারনুৎ।
আশ্বং কফহরং মূত্রং কৃমিদদ্রুষু শস্যতে॥
সুশ্রুত সংহিতা সূত্রস্থান ৪৫।২০৭
অনুবাদ: অশ্বমূত্র দীপন, কটূ, তীক্ষ্ম, উষ্ণ, বায়ুনাশক, চিত্তবিকারনাশক, কফহারক এবং কৃমি-দাদরোগে প্রশস্ত। 

 
যুক্তং বা মধুসর্পির্ভ্যাং লিহ্যাদ্ গোঽশ্বশকৃদ্রসম্॥
চরক সংহিতা চিকিৎসাস্থান ৪।৬৮
অনুবাদ: (রক্তপিত্ত নিরাময়ে) গোবর বা অশ্বমল-রস মধু ও ঘি যুক্ত করে লেহন করবে।
 

এখনো কীসের আপত্তি তবে আর রইলো? মহর্ষি তো তাও এমন বিধান উল্লেখই করেননি। বরং সেখান থেকে জৈব সার, বায়োগ্যাস ইত্যাদি বর্তমানে তৈরি করা হচ্ছে। সেখানেও তাপ ও গ্যাস উৎপন্ন হয়। আধুনিক কৃষিবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঘোড়ার মল মাটির উর্বরতা বাড়াতে অত্যন্ত কার্যকর। ​এতে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাসিয়াম (N-P-K) থাকে। ​ঘোড়া যেহেতু মূলত ঘাস, খড় এবং দানাশস্য খায়, তাই এর মলে প্রচুর পরিমাণে জৈব উপাদান থাকে যা মাটির জলধারণ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মাটিকে উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত করে তোলে। ​খড় বা ঘাসের আঁশ বেশি থাকায় প্রাচীনকালে গোবরের মতো ঘোড়ার লিদকেও শুকিয়ে জ্বালানি বা ঘুটে হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ​বর্তমান যুগে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অশ্বমলকে 'বায়োগ্যাস' (Biogas) প্ল্যান্টে ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব মিথেন গ্যাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

১. বায়োগ্যাস উৎপাদনে অশ্বমলের ব্যবহার (Anaerobic Digestion & Biogas)

ঘোড়ার মলে প্রচুর পরিমাণে সেলুলোজ ও লিগনিন (খড় ও ঘাস খাওয়ার কারণে) থাকায় এটি বায়োগ্যাস উৎপাদনে দারুণ ভূমিকা রাখে। তবে এর থেকে সর্বোচ্চ গ্যাস পেতে অন্য উপাদানের সাথে মেশানো (Co-digestion) নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে:

২. উৎকৃষ্ট জৈব সার হিসেবে অশ্বমল (Composting & Fertilizer)

কৃষিকাজে মাটির পুষ্টিগুণ এবং উর্বরতা বাড়াতে ঘোড়ার মলের কম্পোস্টিং (সবুজ সার তৈরি) নিয়ে সায়েন্টিফিক ডিরেক্ট ও বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পেপার রয়েছে:

  • রিসার্চ পেপার: Composting Horse Manure: Nutrient Value and Application

    আমেরিকার রাটগার্স ইউনিভার্সিটির এই গবেষণাপত্রে ঘোড়ার মলে থাকা নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের (N-P-K) মাত্রা এবং তা কীভাবে মাটির গুণাগুণ উন্নত করে, তার বিস্তারিত গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে।

    আর্টিকেল লিংক: Rutgers NJAES Publications

  • রিসার্চ পেপার: Characteristics of Horse Manure Compost and its Effects on Soil

    সায়েন্সডাইরেক্ট-এ প্রকাশিত এই পেপারটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে প্রক্রিয়াজাত অশ্বমলের সার মাটির অণুজীবের (Microbiome) কার্যকারিতা বাড়ায় এবং গাছের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

    আর্টিকেল লিংক: ScienceDirect Article

অন্যদিকে আপনার মান্য আয়ুর্বেদে অশ্বের মূত্র পান ও অশ্বের মল ঘি-মধু দিয়ে চাটানোর বিধান আছে। সেখানে প্রশ্ন করছেন না কেন? তখন কি আপত্তি বা শংকা জন্মায় না ? 
 
আর হ্যাঁ, আপনার প্রিয় মহীধর-উবট ভাষ্য দেখে যান। সেখানে—
 
উবট-ভাষ্য: অশ্বশকৃতাবধূপয়তি। অশ্বস্য ত্বা ত্বাং হে মহাবীর, বৃষ্ণঃ সেক্তুঃ। শক্না শকৃচ্ছব্দস্য শকন্নাদেশঃ। ধূপয়ামি দেবয়জনে পৃথিব্যাঃ।
মহীধর-ভাষ্য: হে মহাবীর, পৃথিব্যাঃ দেবয়জনে মখায় মখস্য শীর্ষ্ণে চ বৃষ্ণঃ সেক্তুরশ্বস্য শক্না শকৃতা পুরীষেণ ত্বা ত্বাং ধূপয়ামি।
 
 
উবট-মহীধরানুযায়ী ভাষ্যানুবাদ: হে মহাবীর! পৃথিবীর দেবযজন প্রদেশে যজ্ঞের জন্য, যজ্ঞের মস্তকের জন্য অর্থাৎ মস্তকস্বরূপ প্রধান কর্মের জন্য সেচনকারী অশ্বের পুরীষের [মল] দ্বারা তোমাকে ধূপিত করছি। হে মহাবীর! যজ্ঞের জন্য, যজ্ঞের মস্তকের জন্য অর্থাৎ মস্তকরূপ প্রধান কর্মের জন্য তোমাকে দহন করছি। যজ্ঞের জন্য, যজ্ঞের মস্তকের জন্য অর্থাৎ মস্তকরূপ প্রধান কর্মের জন্য তোমাকে দহন করছি। যজ্ঞের জন্য, যজ্ঞের মস্তকের জন্য অর্থাৎ মস্তকরূপ প্রধান কর্মের জন্য তোমাকে দহন করছি।
 
[রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার (RMIC) প্রকাশিত ‘বেদগ্রন্থমালা’ > ৩য় খণ্ড শুক্লযজুর্বেদ > মাধ্যন্দিন সংহিতা ২য় ভাগ]
 
বিনিয়োগে ব্যাখ্যা করা হয়েছে— 'অশ্বস্য ত্বা' ইত্যাদি ৩টি মন্ত্র পাঠ করে দক্ষিণাগ্নির দ্বারা দীপ্ত অশ্বপুরীষে অর্থাৎ অশ্বমলে নির্মিত সকৃৎ (ঘুটে) দিয়ে ৩টি মহাবীরকে ধূপিত করা হয়। এক-একটি মহাবীরের ধূপনে ৭টি করে অশ্ব সকৃৎ গ্রহণ করা হয়। ধূপনকার্য সমাপ্ত হলে, 'মখায়' ইত্যাদি প্রতিটি মন্ত্রে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মহাবীরের দহনকার্য সুসম্পন্ন করতে হয়।
 
 
অর্থাৎ এখানে মহীধর ভাষ্য অনুযায়ী ঘোড়ার মল দিয়ে মহাবীর পাত্রে ধূপ = ধোঁয়া দিতে বলা হচ্ছে। বিনিয়োগে প্রমাণ:
 
১. অথৈনান্ধূপয়তি। অশ্বস্য ত্বা বৃষ্ণঃ শক্না ধূপয়ামীতি বৃষা বা অশ্বো বীর্যং বৈ বৃষা বীর্যেণৈবৈনমেতৎসমর্ধয়তি কৃৎস্নং করোতি দেবয়জনে পৃথিব্যা মখায় ত্বা মখস্য ত্বা শীর্ষ্ণ ইত্যসাবেব বন্ধুরেবমিতরৌ তূষ্ণীং পিন্বনে তূষ্ণীং রৌহিণকপালে ~ শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪.১.২.২০
 

২. অশ্বশকৃতা ধূপয়ত্যশ্বস্য ত্বেতি প্রতিমন্ত্রম্ ~ কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র ২৬.১.২৪
 
 
৩. প্রদহনং চ মখায়েতি প্রতিমন্ত্রম্ ~ কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র ২৬.১.২৬
 

 
আর অশ্বের মল তো পৌরাণিকদের প্রিয় ঔষধ। মহাপুরাণেই দেখুন—
 
কূর্মমৎস্যাশ্বমহিষগোশৃগালাশ্চ বানরাঃ ।
বিড়ালবর্হিকাকাশ্চ বরাহোলূককুক্কুটাঃ ॥
হংস এষাঞ্চ বিণ্মূত্রং মাংসং বা রোম শোণিতম্ ।
ধূপং দদ্যাজ্জ্বরার্তেভ্য উন্মত্তেভ্যশ্চ শান্তয়ে ॥
গরুড় পুরাণ পূর্বখণ্ড ১৯৯.১৩-১৪
অনুবাদ: কচ্ছপ, মাছ, ঘোড়া, মহিষ, গোরু, শিয়াল, বানর, বিড়াল, ময়ূর, কাক, শূকর, পেঁচা, মোরগ, হাঁস - এসব প্রাণীর বিষ্ঠা (মল), মূত্র, রক্ত, মাংস ও রোম সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ধূপ দিলে জ্বরের রোগী ও পাগলের শান্তি লাভ হয়। 

 
কোথায় মহর্ষি দয়ানন্দ প্রণীত বেদভাষ্যে প্রতিটি দ্রব্যের সুষ্ঠু ব্যবহার করে জাগতিক জীবন সমৃদ্ধ করার উপদেশ ও সাংকেতিক জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ আর কোথায় পৌরাণিকদের ঘোড়ার মল পুড়িয়ে ধূপধুনো দিয়ে বহিরঙ্গ আচারের বিধান!সুতরাং অন্যকে খোঁচা দেওয়ার আগে নিজেদের ঘর দেখে নিন শক্তপোক্ত কিনা।
 
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর