https://www.idblanter.com/search/label/Template
https://www.idblanter.com
BLANTERORBITv101

স্বামী শ্রদ্ধানন্দ সরস্বতীর ওপর ঈদে গোহত্যার সমর্থনদানের অভিযোগ খণ্ডন

Wednesday, June 3, 2026

 
“বেদে গোহত্যা আছে, পুরাকালে আমাদের মহান পূর্বজেরা গোবধ করতেন” এমন নিকৃষ্ট মান্যতা রাখে যে পৌরাণিকেরা তারা আজ সাধারণ হিন্দু জনতা ও আর্যসমাজ উভয়ের মহান নেতা, শুদ্ধি আন্দোলনের মহানায়ক, ভগবৎপাদ শ্রীমৎ শ্রদ্ধানন্দ সরস্বতী জী মহারাজকে নিয়ে অভিযোগের নামে একটি ন্যাকা কান্না উঠিয়েছে। ন্যাকা কান্নাটি এরকম যে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ কুরবানির ঈদে মুসলমানদের গোহত্যা সমর্থন করেছেন। আর্যসমাজের বিরোধিতা করতে চুক্তিবদ্ধ এক মহামূর্খ তার পেইজ থেকে পোস্ট হওয়া ফটোকার্ডে লিখেছে,
 
“মুসলিমরা আমাদের জাতি ভাই, তারা গরু কোরবানি দিলে বাধা দিও না, তাহলে তোমার পাপ লাগবে।
পুস্তক: স্বামী শ্রদ্ধানন্দ পৃষ্ঠা ৬১৬।
–স্বামী শ্রদ্ধানন্দ এবং দয়ানন্দ সরস্বতী।”
 
অন্য একটি স্থানে চুক্তিবদ্ধ অপর নিকৃষ্ট আরেকটি ফটোকার্ডে কতিপয় খণ্ডবাক্য উদ্ধৃত করে অপপ্রচার করেছে। সে লিখেছে,
“শ্রদ্ধানন্দ সমাজী ১৯২৫ সালে ঈদের আগে বলেছিলেন, 'মানুষমাত্রকেই ভাই মনে করা উচিত...মুসলমান নারী-পুরুষ ব্রহ্মের প্রতি শ্রদ্ধা অর্পণ করতে যাচ্ছে।...পরমাত্মার উপাসনায় মগ্ন দেখে প্রসন্নচিত্তে মুসলিমদের আশীর্বাদ দাও...তোমাদের সামনে দিয়ে গোমাতাকে কোরবানির জন্য নিয়ে যেতে দেখলে নিজের মনে ক্রোধ ও দ্বেষের লেশমাত্র আসতে দেবে না।' স্রোত: সত্যদেব সমাজী (১৯৯৫), স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, শ্রী স্বামী শ্রদ্ধানন্দ অনুসন্ধান প্রকাশন কেন্দ্র, কনখল, হরিদ্বার, পৃ. ৬১৬।”
 
এখানে প্রথমোক্ত চুক্তিবদ্ধ অপপ্রচারকারীর দাবি ডাহা মিথ্যা। “মুসলিমরা আমাদের জাতি ভাই, গরু কোরবানিতে বাধা দিলে পাপ লাগবে” এমন কথা স্বামীজী কোথাও বলেন নি। আরও হাস্যকর বিষয় হলো সে এটাকে আজবভাবে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর নামেও চালিয়ে দিয়েছে। এটা চরম ধূর্ততা ও মূর্খতা দুইয়েরই উদাহরণ। দ্বিতীয় চুক্তিবদ্ধ অপপ্রচারকারী ধূর্তটি খণ্ডবাক্য দ্বারা সম্পূর্ণ বিষয়টিকে আংশিক উপস্থাপন করে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে। বিষয়টি আসলে কিরকম তা আমরা বইয়ের পৃষ্টা থেকেই দেখার পর এর সমীক্ষা করবো। 
 
সর্বপ্রথম তৎকালীন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। স্বামীজী এই কথাগুলো তাঁর একটি বিবৃতিতে (Statement) বলেছিলেন ১৯২৫ সালে। আর সেই বছরগুলো ছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। তখন ভারতবর্ষের রাজধানী ছিল দিল্লি। ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে দিল্লির অবস্থা তখন প্রচণ্ড উত্তাল। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সংঘাত তখন ভয়ানক আকার ধারণ করেছিলো। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার তাঁর “History Of The Freedom Movement In India” Vol. 3 পৃষ্টা ২৮৫ এ লিখেছেন–“The Statutory Commission of 1928 observes : ‘Every year since 1923 has witnessed communal rioting on an extensive…’.”
 

পণ্ডিত সত্যদেব বিদ্যালঙ্কারের “স্বামী শ্রদ্ধানন্দ” গ্রন্থের (পৃ. ৬১৩) বিবরণ অনুসারে জানা যায়, দিল্লিতে ১৯২৪ সালে বকরঈদের সময় দাঙ্গা হয়েছিলো এবং গান্ধী সেসব বিবাদের মীমাংসা করতে দিল্লিতে উপস্থিত হন। গ্রন্থকার উল্লেখ করেছেন স্বামীজী লিবারেটর পত্রিকায় লিখেছিলেন, এই সময়েই ঝমেঠী, গুলবর্গা এবং কোহাটেও দাঙ্গা হয়েছিল।
 

“১৯২৩ সালে ঈদের দিন স্বামীজী বার্তারূপে আবেদন করেছিলেন, দিল্লির হিন্দুরা, তোমাদের ধর্ম প্রেম ও উদারতার শিক্ষা দেয়। বকরিইদের সময় এই পরীক্ষার সুযোগ যে, তোমরা কতদূর ধর্মকে বুঝতে পেরেছ। ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া করা ভীরুতা। তোমাদের উচিত গম্ভীর থাকা এবং মুসলমান ভাইদের সদবুদ্ধির জন্য পরমাত্মার কাছে প্রার্থনা করা। [ঈদ শান্তিতে কাটলে লিখেছিলেন,] এই আদর্শ শান্তির জন্য আমি দিল্লির হিন্দু-মুসলমান উভয়কেই অভিনন্দন জানাই। ঈশ্বর করুন, রাজধানীর এই শীতল বাতাস যেন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে” (বিদ্যালঙ্কার. পৃ. ৬১৫)। 
 

পূর্বোক্ত বর্ণনায় আমরা দেখেছি, ১৯২৪ সালে মুসলমানদের ঈদকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা হয়েছিলো এবং ১৯২৫ সালেও (যখন স্বামীজী আলোচ্য Statement টি দিয়েছিলেন) দিল্লিতে ভয়াবহ দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিলো। “History Of The Freedom Movement In India” Vol. 3 পৃষ্টা ২৮৪ এ রমেশ চন্দ্র মজুমদার উল্লেখ করেছেন– “The Hindu-Muslim relations continued to grow worse in 1925 and 1926. No less than sixteen communal riots occurred in 1925, the most serious being those at Delhi, Aligarh, Arvi ( C. P. ) and Sholapur.” 
অর্থাৎ, ১৯২৫ ও ১৯২৬ সালে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটতে থাকে। ১৯২৫ সালে অন্তত ষোলটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়, যার মধ্যে দিল্লি, আলিগড়, আরভি (সি.পি.) এবং শোলাপুরের দাঙ্গাগুলো ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।
 

এই দাঙ্গাময় পরিস্থিতির মধ্যে (১৯২৫ সালে) স্বামী শ্রদ্ধানন্দ মুসলমানদের ঈদে হিন্দুদের দাঙ্গায় না জড়িয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। স্বামীজীর জীবনী লেখক, সত্যদেব বিদ্যালঙ্কার “স্বামী শ্রদ্ধানন্দ” গ্রন্থের পৃষ্টা ৬১৫-৬১৬ তে এই বিষয় উল্লেখ করে যা লিখেছেন তার হুবহু অনুবাদ নিম্নরূপ,
 
১৯২৫ সালে তিনি (স্বামীজী) ঈদের প্রাক্কালে দিল্লি নিবাসীদের সম্বোধন করে লিখেছিলেন, পরমাত্মা সারা সংসারের পিতা। যদি তোমাদের এই বিষয়ে বিশ্বাস থাকে, তবে প্রতিটি প্রাণীকে নিজের দৃষ্টিতে দেখা উচিত এবং প্রতিটি মানুষকে ভাই হিসেবে মনে করা উচিত। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ কি আজকের থেকে তিন দিন পর্যন্ত নিজেদের কর্ম দিয়ে দেবে না? আজ মুসলমান পুরুষ, স্ত্রী, বৃদ্ধ ও যুবকরা নতুন পোশাক পরে এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মের সামনে নিজেদের শ্রদ্ধার অঞ্জলি নিবেদন করতে যাচ্ছে। সেই শ্রদ্ধা কি তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গেছে? যদি তেমনটা হতো, তবে তারা তাদের উৎসবে হিন্দুদের হৃদয় ব্যথিত করার কোনো কাজ করত না। 
আমার হিন্দু ভাইয়েরা, আজ তোমাদেরও তোমাদের ভ্রাতৃভাবের স্পষ্ট প্রমাণ দিতে হবে। পরমাত্মার উপাসনায় নিজেদের মুসলমান ভাইদের নিমগ্ন দেখে আনন্দের সাথে তাদের আশীর্বাদ করো। যদি তোমাদের চোখের সামনে থেকে কোরবানির জন্য গোমাতা যায়, তবে ক্রোধ ও বিদ্বেষের লেশমাত্র নিজেদের ভেতরে আসতে দিও না, বরং পরমাত্মার কাছে আন্তরিক প্রার্থনা করো যেন পরমপিতা তাদের(মুসলমানদের) বুদ্ধিকে প্রেরণা জোগান, যাতে গোমাতাকে রক্ষার ভাব তাদের মধ্যে উৎপন্ন হয়।
তোমাদের ভাইয়েরা ভ্রান্তিবশত গো-বধকে স্বর্গের উপায় বলে মনে করছে। তাদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে এবং তাদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে তাদের অধিকতর গোহত্যার পথে প্রবৃত্ত করার মতো মহাপাপের অংশীদার হয়ো না। তোমরা যতটা সহ্য করবে এবং মুসলমান ভাইদের প্রেমের পথ দেখাবে, ভগবান তোমাদের ওপর ততটাই কৃপা করবেন। 
 
 
পটভূমি ও সম্পূর্ণ প্রকরণ যথাযথভাবে দেখার পর এখন কতিপয় বিবেচ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক যাতে অপপ্রচারকারীদের অপপ্রচার খণ্ডিত হয় আর জনসাধারণের ভ্রান্তিরও অবসান ঘটে। বিবেচ্য প্রশ্নগুলো হলো, 
(১) স্বামীজী কি শুধু হিন্দুদেরকেই আহ্বান করেছিলেন? 
(২) স্বামীজী ঈদে গো-হত্যা সমর্থন করেছেন কি না? তিনি কী গো-রক্ষার প্রশ্নে নরমপন্থীদের মতো আচরণ করলেন? 
(৩) তিনি হিন্দুদের বিদ্বেষমূলক আচরণ করতে নিষেধ করেছেন কেন? 
(৪) “তোমাদের চোখের সামনে থেকে কোরবানির জন্য গোমাতা যায়, তবে ক্রোধ ও বিদ্বেষের লেশমাত্র নিজেদের ভেতরে আসতে দিও না”। এ কথার মাধ্যমে স্বামীজী কি হিন্দুদের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থেকে গো-বধ সহ্য করতে বলেছেন? 
 
(প্রশ্ন ১)
স্বামীজী কি শুধু হিন্দুদেরকেই আহ্বান করেছিলেন?
উত্তর হলো মোটেও তা নয়। স্বামীজী প্রথমেই মুসলমানদের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, “সেই শ্রদ্ধা কি তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গেছে? যদি তেমনটা হতো, তবে তারা তাদের উৎসবে হিন্দুদের হৃদয় ব্যথিত করার কোনো কাজ (গো-হত্যা) করত না।” 
 
 
এখানে তিনি স্পষ্টতই মুসলমানদের বলেছেন যে, যদি তাদের ধর্মভাব সত্যি গভীর ও আন্তরিক হতো, তবে তারা এমন কাজ করতো না, যা হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়। এটি কি মুসলমানদের প্রতি নীরবতা? না। এটি সরাসরি নৈতিক সমালোচনা। অর্থাৎ, তিনি মুসলমানদের বলছেন, তোমরা ঈদের নামাজ পড়ছো, উপাসনা করছো; কিন্তু যদি সেই ধর্মভাব বাস্তবে প্রতিফলিত না হয় এবং অন্য সম্প্রদায়ের হৃদয়ে আঘাত দাও, তবে তোমাদের ধর্মচর্চা প্রশ্নের মুখে পড়ে। মানে শুধু একটা সমালোচনামাত্র নয়, স্বামীজী এই বক্তব্যে মুসলমানদের কৌশলে বলে দিয়েছেন যে তোমাদের গোহত্যা করা উচিত নয়। স্বামীজীর এই ভাব উপেক্ষা করে কেবল পরের অংশ উদ্ধৃত করা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অর্ধসত্য উপস্থাপন। 
 
(প্রশ্ন ২)
স্বামীজী ঈদে গো-হত্যা সমর্থন করেছেন কি না? তিনি কি গো-রক্ষার প্রশ্নে নরমপন্থী ছিলেন?
উত্তর: না, তিনি গো-হত্যা সমর্থন করেননি; বরং স্পষ্ট ভাষায় গো-হত্যার বিরোধিতা করেছেন। অপপ্রচারকারীরা এখানে সবচেয়ে বড় যে কৌশলটি নিয়েছে, তা হলো বাক্য-খণ্ডন (quote mining) অর্থাৎ, বক্তব্যের মাঝখান থেকে সুবিধামতো কয়েকটি লাইন কেটে এনে সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ দাঁড় করানো। স্বামীজীর বক্তব্য হল,
“সেই শ্রদ্ধা কি তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গেছে? যদি তেমনটা হতো, তবে তারা তাদের উৎসবে হিন্দুদের হৃদয় ব্যথিত করার কোনো কাজ করত না।”
 

এখানে “হিন্দুদের হৃদয় ব্যথিত করার কাজ” বলতে কী বোঝানো হয়েছে? পুরো প্রসঙ্গ থেকে স্পষ্ট যে তা ঈদ উপলক্ষে মুসলমানদের গো-বধ। অর্থাৎ, তিনি প্রথমেই মুসলমানদের উদ্দেশ্যে সমালোচনা করছেন যে, যদি প্রকৃত ধর্মভাব থাকতো, তাহলে তারা এমন কাজ করতো না যা অন্য সম্প্রদায়ের গভীর ধর্মীয় অনুভূতিকে আহত করে।
 
আরও স্পষ্টভাবে তিনি বলেছেন,
“পরমপিতা তাদের বুদ্ধিকে প্রেরণা জোগান, যাতে গোমাতাকে রক্ষার ভাব তাদের মধ্যে উৎপন্ন হয়।” 
 

এখনও কি স্বামীজী গো-হত্যা সমর্থন করেছেন এই অভিযোগ টিকতে পারে? একেবারেই নয়। স্বামীজী সরাসরি মুসলমানদের মধ্যে গোরক্ষার ভাব জাগ্রত হওয়ার প্রার্থনা করতে বলেছেন। তারপর তিনি আরও কঠোর ভাষায় বলেছেন,
“তোমাদের ভাইয়েরা ভ্রান্তিবশত গো-বধকে স্বর্গের উপায় বলে মনে করছে।” 
 

খেয়াল করুন, তিনি কিন্তু “ঠিক কাজ”, “ধর্মীয় অধিকার” বা “ন্যায্য কোরবানি” বলেননি; বলেছেন “ভ্রান্তিবশত”। এই “ভ্রান্তিবশত” শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা তিনি স্পষ্টত জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর মতে গো-বধ কোনো উচ্চতর ধর্মীয় আদর্শ নয়, বরং একটি ভুল ধারণা। 
 
সুতরাং সঠিক সিদ্ধান্ত হবে: স্বামী শ্রদ্ধানন্দের অবস্থান ছিল, 
(১) গো-হত্যা হিন্দুদের অনুভূতিকে আহত করে। 
(২) মুসলমানদের এ বিষয়ে পরিবর্তিত হওয়া উচিত। 
 (৩) মুসলমানদের মধ্যে গোরক্ষার ভাব জাগ্রত হওয়া কাম্য। 
(৪) গো-বধ সম্পর্কে মুসলমানদের বিশ্বাসকে তিনি “ভ্রান্তি” বলেছেন। 
 
এমন অবস্থানকে কেউ যদি “গো-হত্যা সমর্থন” বলে তবে তা ইতিহাস বিকৃতি করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়।
 
তাহলে প্রশ্ন আসে, তিনি কি গো-রক্ষার প্রশ্নে নরমপন্থী ছিলেন ? এখানেও আমাদের দৃঢ় উত্তর হলো 'না'কিন্তু তিনি গোরক্ষা = সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসা, দাঙ্গা, এই সমীকরণে বিশ্বাসী ছিলেন না। আমরা দেখিয়েছি, তিনি এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন যখন ১৯২৩-২৬ পর্যায়ে দিল্লিসহ বহু স্থানে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছিল। পূর্বোল্লিখিত রমেশচন্দ্র মজুমদারের History of the Freedom Movement in India-এর বর্ণনা অনুযায়ী দেখেছি ১৯২৫ সালে অন্তত ১৬টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। এবং দিল্লিতে ভয়াবহ দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিলো। এই প্রেক্ষাপটে দিল্লিবাসীর, আবার পড়ুন “দিল্লিবাসীর উদ্দেশ্যে” স্বামীজীর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল, গোরক্ষা করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে নয় যাতে প্রতিক্রিয়ায় আরও অধিক গোহত্যা ও রক্তপাত ঘটে।


(প্রশ্ন ৩)
তিনি হিন্দুদের বিদ্বেষমূলক আচরণ করতে নিষেধ করেছেন কেন?
এর উত্তর তাঁর নিজের ভাষাতেই আছে। তিনি বলেছেন,
“তাদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে এবং তাদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে তাদের অধিকতর গোহত্যার পথে প্রবৃত্ত করার মতো মহাপাপের অংশীদার হয়ো না।”
 
এখানে তাঁর যুক্তি গভীরভাবে কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক। স্বামীজীর বক্তব্যের সারাংশ এই যে, যদি প্রতিক্রিয়া হয়, ক্রোধ, অপমান, বিদ্বেষ, সংঘর্ষ, কিংবা প্রতিশোধমূলক উত্তেজনা! তাহলে তার ফল কী হবে? সমস্যা কমবে না; বরং বাড়বে। ঐতিহাসিক বাস্তবতাও তেমনই ছিলো। আমরা দেখিয়েছি ১৯২৪ সালে দিল্লিতে বকরঈদ কেন্দ্রিক দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯২৫-এ দিল্লি আবার উত্তপ্ত। কোহাট, গুলবর্গা, আলিগড়, শোলাপুর, বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ছিল। এই অবস্থায় স্বামীজীর আশঙ্কা ছিল, উগ্র প্রতিক্রিয়া দিলে দুইটি জিনিস ঘটবে: (১) সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ আরও বাড়বে। (২) প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আরও বেশি গো-বধ ঘটতে পারে। সেই কারণেই তিনি “বিদ্বেষ”-এর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। আমরা বলতে পারি, তিনি গো-রক্ষার বিরোধিতা করেননি, বরং বিদ্বেষ-নির্ভর পদ্ধতিকে নিরুৎসাহিত করেছেন।
 
(প্রশ্ন ৪)
“তোমাদের চোখের সামনে থেকে কোরবানির জন্য গোমাতা যায়, তবে ক্রোধ ও বিদ্বেষের লেশমাত্র নিজেদের ভেতরে আসতে দিও না”। এ কথার মাধ্যমে স্বামীজী কি হিন্দুদের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থেকে গো-বধ সহ্য করতে বলেছেন?
না, এটাও ভুল ব্যাখ্যা। অপপ্রচারকারীরা অপব্যাখ্যা করে চালাচ্ছে যে “ক্রোধ করো না” = “কিছুই করো না”। কিন্তু এই দুইটি এক নয়। স্বামীজীর বক্তব্য ভালোভাবে দেখুন। তিনি বলেননি যে, “গো-হত্যা ভালো।”, “প্রতিরোধ করো না।”, “গোরক্ষার কথা বলো না।” বরং তিনি এর পরেই বলেছেন,
“পরমাত্মার কাছে আন্তরিক প্রার্থনা করো যেন… গোমাতাকে রক্ষার ভাব তাদের মধ্যে উৎপন্ন হয়।” 
 

এবং
“তোমরা যতটা সহ্য করবে এবং মুসলমান ভাইদের প্রেমের পথ দেখাবে ভগবান তোমাদের ওপর ততটাই কৃপা করবেন”
 

আমরা বুঝতে পারছি যে, তিনি একটি বিকল্প কার্যপদ্ধতি নির্দেশ করছেন। সেটি হলো, বিদ্বেষপূর্ণ প্রতিক্রিয়ার বদলে নৈতিক প্রভাব বিস্তার, সহিষ্ণুতা প্রদর্শন এবং মুসলিমদের বুঝিয়ে তাদের হৃদয় পরিবর্তনের চেষ্টা। এটি কোনোভাবেই নিষ্ক্রিয়তা নয়; বরং একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও নৈতিক কর্মপন্থা। তাঁর ব্যবহৃত সহ্য শব্দটিকেও প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা উচিত নয়। তিনি এমন এক সময়ে কথাগুলো বলেছিলেন, যখন সামান্য উসকানিতেই শহরজুড়ে দাঙ্গা, হত্যা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছিল। এই পরিস্থিতিতে তাঁর কি হিন্দুদের মা’রামারি কা’টাকাটি করে ম’রার উসকানি দেওয়া উচিত ছিলো? কখনোই নয়। তবে তাঁর বক্তব্যের অর্থও কখনোই এটি নয় যে, তোমরা চুপচাপ বসে থাকো। বরং তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দিও না যাতে পরিস্থিতি জটিল হয়, দাঙ্গা বিস্ফোরিত হয় এবং মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। স্বামীজীর বাস্তবমুখী কৌশলগুলো ছিল ধর্মীয় আদর্শ তুলে ধরা, মুসলমানদের নৈতিক আচরণের সমালোচনা করা এবং গোরক্ষার পক্ষে আবেদন জানানো, কিন্তু কোনোভাবেই দাঙ্গা বা মারামারির মতো সহিংসতায় জড়িয়ে পড়া নয়। অধিকন্তু, লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি মুসলমানদের আচরণকে প্রশ্রয় দেননি, বরং তাদের বিশ্বাসকে “ভ্রান্তিবশত” বলে অভিহিত করে তাদের প্রেমের পথ দেখাতে বলেছেন। অর্থাৎ তাদের অন্তরে পশুপ্রেম জাগিয়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব ক্রোধ কোরো না এই কথা থেকে গো-হত্যা মেনে নাও, এমন উপসংহার টানা যুক্তিবিচারের দিক থেকে অত্যন্ত অসঙ্গত।
 
সর্বোপরি, এটি ছিল মূলত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি। একটি রাষ্ট্রে একজন বড়ো নেতার Statement সাধারণত এমনই হয়। তিনি বিবৃতির মাধ্যমে গোরক্ষার নামে জনগণকে মারামারি বা হানাহানিতে উৎসাহ দিতে পারেন না, আবার এমন কোনো বক্তব্যও দিতে পারেন না যা উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করে, নতুন একটি ঝামেলার সূত্রপাত করে। তাই স্বামী শ্রদ্ধানন্দ একটি কৌশলপূর্ণ নীতি অনুসরণ করেছিলেন। তাঁর মৃদু বাক্যের মধ্যেই, তিনি কীভাবে মুসলমানদের সমালোচনা করেছেন এবং গোরক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন তা আমাদের পূর্ববর্তী আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে।
 
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনার ও এই চারটি প্রশ্নের উত্তর প্রদানের পর আমরা এই উপসংহারে আসতে পারি যে,
​১। স্বামী শ্রদ্ধানন্দ ঈদ উপলক্ষে গো-হত্যা সমর্থন কখনোই করেননি; বরং মুসলমানদের এ বিষয়ে সমালোচনা করেছেন এবং গোরক্ষার ভাব জাগ্রত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
​২। তিনি গোরক্ষার প্রশ্নে নরমপন্থী অর্থে আপসবাদী ছিলেন না; তবে গোরক্ষাকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও দাঙ্গার অস্ত্রে পরিণত করার বিরোধী ছিলেন।
​৩। তিনি বিদ্বেষ পোষণ করতে নিষেধ করেছেন, কারণ তাঁর মতে ঘৃণা ও সংঘর্ষ আরও বেশি গোহত্যা ও সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
৪। ক্রোধ কোরো না মানে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাও নয়; বরং এটি নৈতিক ও সামাজিক উপায়ে গোরক্ষার আদর্শ প্রতিষ্ঠার একটি আহ্বান।
 
​অতএব, স্বামীজীর বক্তব্যকে মুসলমানদের গো-কোরবানি সমর্থন হিসেবে প্রচার করা ঐতিহাসিকভাবে অসম্পূর্ণ, প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন এবং বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনা। তাঁর মূল বক্তব্যে বরং গোরক্ষার আকাঙ্ক্ষা, মুসলমানদের সমালোচনা এবং দাঙ্গাবিরোধী সামাজিক কৌশল; এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিদ্যমান।
 
বিদুষাং বশংবদঃ
সুব্রত