আর্যসমাজ তথা অগ্নিবীর ব্রাহ্মণগ্রন্থকে বেদ বলে স্বীকার করে না। তাদের মতে ব্রাহ্মণগ্রন্থ ইতিহাস, ব্যক্তি বিশেষ আলোচনা, স্থানবিশেষ উল্লেখ প্রভৃতি কারণে অনিত্য উপাদান সমৃদ্ধ বিধায় অপৌরুষেয় ‘বেদ’ হতেই পারে না। তারা ব্রাহ্মণকে বেদের ব্যাখ্যা ও বিনিয়োগভাগ হিসেবে স্বীকার করে। শ্রুতি/বেদ/আম্নায় সংজ্ঞা আদি ঔপচারিক সংজ্ঞা রূপে যাজ্ঞিক অংশে ও ব্যাকরণের অংশে উদাহরণে বৈদিকী অর্থাৎ বৈদিক উদাহরণ ও প্রয়োগরূপে স্বীকার করে। শ্রুতি বেদ বা ঔপনিষদী শ্রুতি পরম্পরার জন্যেও কথিত হয়। তবে মূল সংহিতার ন্যায় কোনটাই মূখ্য সংজ্ঞা বা অপৌরুষেয় তত্ত্ব নয়। যেমন গোপথ ব্রাহ্মণ ১।২।১০-এ সংহিতা, ব্রাহ্মণ,পৌরুষেয় [ পূ০ মী০ ১।৩।১৪ ] কল্পসূত্র সবাই ‘যজ্ঞ’ নামে অভিহিত হলেও নির্বিচারে অপৌরুষেয় না তেমনি সেই পৌরুষেয় বেদাঙ্গের ঔপচারিক সংজ্ঞাও স্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সর্বত্র নয়। যদিও এর বিপরীতে প্রতিবাদীগণ ঘুরেফিরে একই ‘ঔপচারিকতা মানি না’, ‘কল্পসূত্রে বলা হয়েছে ব্রাহ্মণ বেদ বা অমুক জায়গায় ব্রাহ্মণবাক্যকে বেদ বা শ্রুতি হিসেবে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে' ইত্যাদি বলতেই থাকেন। যদিও তা আমাদের কখনোই ধর্তব্য নয়। তবুও কিছু সময় পাষণ্ডদলনের স্বার্থে মন্ত্রসংহিতার সাথে ব্রাহ্মণ বা কল্পের কী নিদারুণ প্রত্যক্ষ বিরোধ আমাদের উল্লেখ করতে হয়। তারইর ধারায় আমরা আজ শতপথ ব্রাহ্মণ গ্রন্থের বেদবিরুদ্ধ বিধি নিয়ে আলোচনা করব।
অথ মৈত্রাবরুণীং বশামনূবন্ধ্যামালভতে । স এষোঽন্য এব যজ্ঞস্তায়তে পশুবন্ধ এব সমিষ্টয়জূংষি হ্যেবান্তো যজ্ঞস্য ॥ শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.১.৫
= অনন্তর মিত্র ও বরুণের উদ্দেশ্যে একটি বন্ধ্যা গাভি হত্যা করা হয়। এই যাগ আলাদাভাবে অনুষ্ঠিত হয় যাতে পশুকে আহুতি দেওয়া হয়, কারণ সমিষ্টযজুসের দ্বারা যজ্ঞের সমাপ্তি হয়ে থাকে ।
তদ্যন্মৈত্রাবরুণী বশা ভবতি । যদ্বা ঈজানস্য স্বিষ্টং ভবতি মিত্রোঽস্য তদ্গৃহ্ণাতি যদ্বস্য দুরিষ্টং ভবতি বরুণোঽস্য তদ্গৃহ্ণাতি ॥ শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.১.৬
= কেনই বা মৈত্রাবরুণের উদ্দেশ্যে বন্ধ্যা গাভি আহুতি দেওয়া হয়? কারণ, যজ্ঞের যে অংশ সুন্দরভাবে (স্বিষ্ট) অনুষ্ঠিত হয় তা মিত্রের উদ্দেশ্যে আহুত এবং যে অংশ দুরিষ্ট তা বরুণের উদ্দেশ্যে। বরুণ তা-ই গ্রহণ করেন ।
বশামালভতে । তামালভ্য সঞ্জ্ঞপয়ন্তি সঞ্জ্ঞপ্যাহ বপামুৎখিদেত্যুৎখিদ্য বপামনুমর্শং গর্ভমেষ্টবৈ ব্রূয়াৎস যদি ন বিন্দন্তি কিমাদ্রিয়েরন্যদ্যু বিন্দন্তি তত্র প্রায়শ্চিত্তিঃ ক্রিয়তে ॥ শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.২.১
= বন্ধ্যা গাভি আলভন্ (হত্যা) করা হয়। তাকে আলভন্ করে সংজ্ঞারহিত করেন (সংজ্ঞপয়ন্তি)। অনন্তর সংজ্ঞারহিত করে তিনি (শমিতাকে) তার বপা (মেদ) উৎখিন্ন করতে বলেন এবং বপা উৎখিন্ন হলে তিনি তাকে ঐ প্রাণীর গর্ভ খোঁজার জন্য বলেন। যদি না পাওয়া যায় তাহলে কিছু করণীয় নেই। আর যদি তাঁরা খুঁজে পান তাহলে তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় ।
ন বৈ তদবকল্পতে । যদেকাং মন্যমানা একয়েবৈতয়া চরেয়ুর্যদ্দ্বে মন্যমানা দ্বাভ্যামিব চরেয়ু স্থালীং চৈবোষ্ণীষং চোপকল্পয়িতবৈ ব্রূয়াৎ ॥ শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.২.২
= যদি একটিমাত্র বন্ধ্যা গাভির আহুতি বিধান থাকে তাহলে একটি মনে করেই অনুষ্ঠান। যদি দুটি মনে করে তাহলে দুটি দিয়েই অনুষ্ঠান—এরূপ অবশ্যই হওয়া উচিত নয়। এক্ষেত্রে তিনি শমিতাকে এই অনুষ্ঠানের জন্য স্থালী (পাত্র) ও উষ্ণীষ্ (বস্ত্রাংশ) প্রস্তুত রাখতে বলবেন। এইরূপ অবকল্পন করা হয় (অবকল্পতে) ।
অথ বপয়া চরন্তি । যথৈব তস্যৈ চরণং বপয়া চরিত্বাধ্বর্যুশ্চ যজমানশ্চ পুনরেতঃ স আহাধ্বর্যুর্নিরূহৈতং গর্ভমিতি তং হ নোদরতো নিরূহেদার্তায়া বৈ মৃতায়া উদরতো নিরূহন্তি যদা বৈ গর্ভঃ সমৃদ্ধো ভবতি প্রজননেন বৈ স তর্হি প্রত্যঙ্ঙৈতি তমপি বিরুজ্য শ্রোণী প্রত্যঞ্চং নিরূহিতবৈ ব্রূয়াৎ ॥ শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.২.৩
= অনন্তর তারা বপার (omentum) দ্বারা অনুষ্ঠান করে (চরন্তি)। যেরূপ আচার সেইরূপই করা উচিত। বপার দ্বারা অনুষ্ঠান করে অধ্বর্যু ও যজমান যজ্ঞভূমিতে প্রত্যাবৃত্ত হন। অধ্বর্যু (শমিতাকে) সম্বোধন করে বলেন ‘ভ্রূণকে টেনে বার করানো হোক’। অন্যথায় সে সেটিকে গর্ভ থেকে টেনে বার করবে না। একমাত্র আর্ত ও মৃত স্ত্রীর উদর থেকেই ভ্রূণকে টেনে বার করা হয়। এর ফলে প্রজননের জন্য গর্ভ সমৃদ্ধ হয়। যখন ভ্রূণ সম্পূর্ণরূপে বর্ধিত তা প্রাকৃতিকভাবে প্রসব করে ও জন্ম নেয়। (যদি স্বাভাবিক প্রসব না হয় তাহলে) তাকে আদেশ দেন গাভির পশ্চাদ্দেশ ছিন্ন বা কর্তন করে ঐ ভ্রূণকে বাইরে নিয়ে আসা উচিত ।
তদাহুঃ । কথমেতং গর্ভং কুর্যাদিত্যঙ্গাদঙ্গাদ্ধৈবাস্যাবদ্যেয়ুর্যথৈবেতরেষামবদানানামবদানং তদু তথা ন কুর্যাদুত হ্যেষোঽবিকৃতাঙ্গো ভবত্যধস্তাদেব গ্রীবা অপিকৃত্যৈতস্যাং স্থাল্যামেতং মেধং শ্চোতয়েয়ুঃ সর্বেভ্যো বা অস্যৈষোঽঙ্গেভ্যো মেধ শ্চোততি তদস্য সর্বেষামেবাঙ্গানামবত্তং ভবত্যবদ্যন্তি বশায়া অবদানানি যথৈব তেষামবদানম্ ॥ শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.২.৬
= সেইজন্য বলা হয়—কিজন্য এই গর্ভের প্রয়োজনীয়তা? অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছেদনের দ্বারাও এই প্রয়োজন মিটতে পারে। কিন্তু তা করণীয় নয়। এতে অঙ্গবিকৃতি হয়। গ্রীবাপ্রদেশের (neck) নীচ কেটে স্থালীতে ঐ মেধ (fat) রস পতিত হয় বিন্দু বিন্দু করে। এই অংশ ছেদনের দ্বারা অন্য সর্বাঙ্গ উপলক্ষিত বা গৃহীত হয়। তারপর তিনি বন্ধ্যা গাভির (বশায়া) দ্বারা অবদান করেন যেভাবে অবদান হয়ে থাকে সেই একইভাবে ।
তানি পশুশ্রপণে শ্রপয়ন্তি । তদেবৈতং মেধং শ্রপয়ন্ত্যুষ্ণীষেণাবেষ্ট্য গর্ভং পার্শ্বতঃ পশুশ্রপণস্যোপনিদধাতি যদা শৃতো ভবত্যথ সমুদ্যাবদানান্যেবাভিজুহোতি নৈতং মেধমুদ্বাসয়ন্তি পশুং তদেবৈতম্মেধমুদ্বাসয়ন্তি ॥ শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.২.৭
= ঐ পশুখণ্ডসমূহকে শামিত্র অগ্নিতে পাক করা হয়। ঐ সময়ে মেধও (fat) পাক করা হয়। গর্ভকে উষ্ণীষের (বস্ত্রাংশ) দ্বারা আচ্ছাদন করে অগ্নির পার্শ্বে রাখা হয়। যখন পক্ক হয়ে যায়, তখন সব কিছু (সমুদায়) একসাথে হবন করেন (শুধু মাংস) কিন্তু মেধ নয়। এর দ্বারা তাঁরা পশুকে (অগ্নির) বাইরে রাখেন (কারণ) মেধকে তাঁরা বাইরে রাখেন ।
তং জঘনেন চাত্বালমন্তরেণ যূপং চাগ্নিং চ হরন্তি । দক্ষিণতো নিধায় প্রতিপ্রস্থাতাবদ্যত্যথ স্রুচোরুপস্তৃণীতেঽথ মনোতায়ৈ হবিষোঽনুবাচ আহাবদ্যন্তি বশায়া অবদানানাং যথৈব তেষামবদানম্ ॥ শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.২.৮
= এই পশুকে (তম্) চত্বালের পশ্চাদ্দেশ এবং যূপ ও অগ্নির মাঝখান দিয়ে নিয়ে যান। অগ্নির দক্ষিণপার্শ্বে স্থাপিত করেন। প্রতিপ্রস্থাতা তাতে যজ্ঞীয় অংশকে কর্তন করেন (অবদ্যতি)। অনন্তর শ্রুকের দ্বারা ঘৃতসিক্ত করা হয়। হোতাকে আহ্বান করা হয় ‘মনোতা’ দেবতার উদ্দেশ্যে হবিঃ দানের সময় ঋক উচ্চারণ করার জন্য। ঐ বন্ধ্যা গাভির (বশা) অংশ কর্তন করা হয়, অবদানের (প্রদানের) জন্য যেরূপ নির্দিষ্ট ।
অথ প্রচরণীতি স্রুগ্ভবতি । তস্যাং প্রতিপ্রস্থাতা মেধায়োপস্তৃণীতে দ্বিরবদ্যতি সকৃদভিঘারয়তি প্রত্যনক্ত্যবদানে অথানুবাচ আহাশ্রাব্যাহ প্রেষ্যেতি বষট্কৃতেঽধ্বর্যুর্জুহোত্যধ্বর্যোরনু হোমং জুহোতি প্রতিপ্রস্থাতা ॥ শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.২.৯
= অনন্তর ‘প্রচারণী’ নামক স্রুক্ (offering spoon) গ্রহণ করা হয়। প্রতিপ্রস্থাতা তাতে মেধের জন্য ঘৃতের আস্তরণ তৈরি করেন এবং দুইভাগে ছেদন করে একভাগ (সকৃদ্) অভিঘারণ করেন (সিঞ্চন) এবং অবদানের দ্বারা শূন্যস্থান পূরণ করেন। অনন্তর অধ্বর্যু হোতাকে অনুবাক্যা উচ্চারণের জন্য আদেশ দেন (অনুবাচ)। শ্রৌষট্ উচ্চারণের জন্য আহ্বান করে তিনি মৈত্রাবরুণকে আদেশ করেন যাতে হোতা আহুতিমন্ত্র (যাজ্যামন্ত্র) উচ্চারণ করেন। অধ্বর্যু বষট্কার উচ্চারিত হলে পশুমাংস-সংযোগে হবন করেন। অধ্বর্যুর পশ্চাৎ প্রতিপ্রস্থাতা হবন করেন ।
যস্যৈ তে যজ্ঞিয়ো গর্ভ ইতি । অয়জ্ঞিয়া বৈ গর্ভাস্তমেতদ্ব্রহ্মণৈব যজুষা যজ্ঞিয়ং করোতি যস্যৈ যোনির্হিরণ্যযীত্যদো বা এতস্যৈ যোনিং বিচ্ছিন্দন্তি যদদো নিষ্কর্ষন্ত্যমৃতমায়ুর্হিরণ্যং তামেবাস্যা এতদমৃতাং যোনিং করোত্যঙ্গান্যহ্রুতা যস্য তং মাত্রা সমজীগমং স্বাহেতি যদি পুমান্ত্স্যাদ্যদ্যু স্ত্রী স্যাদঙ্গান্যহ্রুতা যস্যৈ তাং মাত্রা সমজীগমং স্বাহেতি যদ্যু অবিজ্ঞাতো গর্ভো ভবতি পুংস্কৃত্যৈব জুহুয়াৎপুমাংসো হি গর্ভা অঙ্গান্যহ্রুতা যস্য তং মাত্রা সমজীগমং স্বাহেত্যদো বা এতং মাত্রা বিষ্বঞ্চং কুর্বন্তি যদদো নিষ্কর্ষন্তি তমেতদ্ব্রহ্মণৈব যজুষা সমর্ধ্য মধ্যতো যজ্ঞস্য পুনর্মাত্রা সঙ্গময়তি ॥ শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৫.২.১০
= তাদের, যাদের ফল (calf) যজ্ঞের জন্য উপযুক্ত। গর্ভ (embryo) যজ্ঞের জন্য অনুপযুক্ত। তাকে ব্রহ্মণ (praise) ও যজুস্ দ্বারা যজ্ঞীয় উপকরণ করে তোলা হয়। যার যোনি (womb) হিরণ্ময় হয় (golden) যখন তা বিদীর্ণ বা ছেদন করে ভ্রূণকে বাইরে নিয়ে আসা হয়। সুবর্ণ (হিরণ্য) হল অমৃতময় প্রাণের প্রতীক। যার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আহুতি দেওয়া হয় তার সাথে তার মাতাকে একত্রে স্বাহাকারের দ্বারা আহুতির বিধান যদি পুরুষ-ভ্রূণ না হয়। যদি স্ত্রী-ভ্রূণ হয় তাহলে অঙ্গসমূহের সাথে মাতাকেও স্বাহাকার করা হয়। যদি গর্ভ (womb) অবিজ্ঞাত থাকে, তাহলে পুমান্ বৎসের জন্য আহুতি দেওয়া উচিত (জুহুয়াৎ)। গর্ভ হল পুংবাচক (masculine gender)। অঙ্গসমূহ ও মাতাকে একসাথে স্বাহাকার দ্বারা আহুতি এই পশুধ্যাগে। যে বৎসকে (calf) গাভির পশ্চাদ্ভাগ কর্তন করে নিষ্কাশন করা হয়েছিল, তাকে আহুতির জন্য ব্রহ্মণও যজুসের দ্বারা সমৃদ্ধ করে (সমর্থ্য) যজ্ঞের মাঝখানে (মধ্যতো) পুনরায় নিয়ে আসা হয় তার মায়ের সাথে (মাতা) ।
শতপথ ব্রাহ্মণে উল্লিখিত গাভীবধের বিবরণটি বৈদিক মূলনীতি, শব্দার্থবিজ্ঞান এবং ইতিহাস-সমালোচনামূলক পর্যালোচনার দৃষ্টিতে স্পষ্টতই বেদ-বিরুদ্ধ, প্রক্ষিপ্ত এবং ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যের সীমাবদ্ধতার প্রমাণ।
প্রথমত, সনাতন বৈদিক ঐতিহ্যে কেবল মূল সংহিতাই অপৌরুষেয়ও স্বতঃপ্রমাণ 'বেদ', অন্যদিকে ব্রাহ্মণ গ্রন্থসমূহ হলো পরবর্তী যুগে ঋষিদের রচিত যজ্ঞীয় আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাখ্যাগ্রন্থ বা সামাজিক উপাঙ্গ; তাই স্বতঃপ্রমাণ সংহিতার সাথে কোনো ব্রাহ্মণ গ্রন্থের মতভেদ দেখা দিলে সংহিতাই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয়।
দ্বিতীয়ত, ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদে গরুকে বারবার 'অঘ্ন্যা' (যা বধের অযোগ্য) বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং যজুর্বেদ ১.১ ও ৮.৪৩, নিঘণ্টু ২.১১, মহাভারত ১২.২৬২.৪৭ 'অঘ্ন্যা' = অহন্তব্য বা মারা যাবে না গোরু ইত্যাদির সরাসরি বিরোধী বক্তব্য ব্রাহ্মণে দেওয়া হয়েছে। ; ফলে বেদের স্পষ্ট 'অঘ্ন্যা' নীতির বিপক্ষে গিয়ে শতপথ ব্রাহ্মণে গর্ভবতী বা বন্ধ্যা গাভী উৎসর্গের বিধান দেওয়া সরাসরি বৈদিক সংহিতার বিপরীত।
তৃতীয়ত, ব্রাহ্মণ ও কল্পাদি গ্রন্থের প্রাচীন কিছু স্থানে যজ্ঞে পশুবলির সমর্থন করা হয় বলে যে দাবি করা হয়, তার প্রধান ভিত্তি ‘আলভতে/আলভন’ প্রভৃতি শব্দ; কিন্তু পাণিনীয় ধাতুপাঠে “আ + ডু-লভষ্ প্রাপ্তৌ” হওয়ায় ‘আলভ’ মূলত প্রাপ্তি, গ্রহণ বা স্পর্শ অর্থে ব্যবহৃত, হত্যা অর্থে নয়; নিঘণ্টু ২।১৯-এও হত্যার সমার্থক শব্দের তালিকায় ‘আলভ্’ নেই। যজুর্বেদ ৩০।৫–২২-এ বিভিন্ন পেশাজীবীর ক্ষেত্রে ‘আলভন’ ব্যবহৃত হওয়ায় সেখানে হত্যা অর্থ গ্রহণ করলে অযৌক্তিক অর্থ দাঁড়ায়; পারস্কর গৃহ্যসূত্র ১।৮।৮/২।২।১৫, গোভিল গৃহ্যসূত্র ২।৭।২–৩ ও আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র ১।১৫।১-এও ‘আলভ’ স্পর্শার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে “যজমানস্য পশূন্ পাহি” (যজুর্বেদ ১।১) পশুর রক্ষার নির্দেশ দেয় এবং যজ্ঞকে “অধ্বর”, অর্থাৎ হিংসারহিত কর্ম বলা হয়েছে—ঋগ্বেদ ১।১।৪; নিরুক্ত ১।৭। যজুর্বেদ ৬।১১, ১৪।৮, ১১।৮৩-তেও পশু সংরক্ষণের নির্দেশ রয়েছে। শতপথ ব্রাহ্মণ ১।২।৩।৬–৯-এর উপাখ্যানে যজ্ঞের ‘পশু’-স্বরূপ শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রবেশ করে ব্রীহি-যব প্রভৃতি শস্যে প্রকাশিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে; ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৬।৯-এ পুরোডাশকেই পশুর প্রতিরূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অতএব এই পাঠগুলির ভিত্তিতে অগ্নিতে জীবন্ত পশু হত্যা করাই বৈদিক যজ্ঞের অপরিহার্য অঙ্গ—এমন সিদ্ধান্ত করা যায় না; বরং বৈদিক ‘অধ্বর’ ধারণা ও পশুরক্ষার নির্দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘পশু’, ‘মেধ’, ‘আলভন’ ইত্যাদির প্রতীকী/বিকল্প ব্যাখ্যাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাতীয় শব্দগুলোকে পরবর্তীতে আক্ষরিক ও মাংসকেন্দ্রিক অর্থে বিকৃত করা হয়েছে এমনকি মূল পাঠেও অনুপ্রবেশ ঘটেছে। পরিশেষে, যজ্ঞীয় জটিলতা ও সামাজিক পরিবর্তনের যুগে শতপথ ব্রাহ্মণের মতো গ্রন্থে মধ্যযুগীয় আচার্য ও লিপিকরদের হাত ধরে এই বৈদিক-অহিংসা-বিরোধী অনুচ্ছেদগুলো প্রক্ষিপ্ত (Interpolated) হিসেবে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে, যা মূল বৈদিক দর্শনের আলোকে সম্পূর্ণরূপে অসিদ্ধ ও বেদ-বহির্ভূত।
অশ্বমেধ যজ্ঞকে কেন্দ্র করে শতপথ ব্রাহ্মণ, বিভিন্ন শ্রৌতসূত্র এবং পরবর্তী সাহিত্যে যে অশ্লীল আচারের বর্ণনা পাওয়া যায়, সেগুলিকে সরাসরি বৈদিক ঈশ্বরবাণী বা বৈদিক বিধান বলে গ্রহণ করা যায় কি না—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ণয়ে বেদ, ব্রাহ্মণগ্রন্থ, কল্পসূত্র এবং পরবর্তী ভাষ্য ও সাহিত্যের প্রামাণ্যতার পার্থক্য বিবেচনা করা জরুরি। দেখা যায়, শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.৫.২.১–৩-এ অশ্বমেধের একটি অংশে অশ্ব ও রাজমহিষীকে কেন্দ্র করে অশ্লীল আচারের বর্ণনা রয়েছে এবং হরিস্বামীর ভাষ্যেও তার আক্ষরিক অর্থই করা হয়েছে।
এতেঽউক্ত্বা যদধ্রিগোঃ পরিশিষ্টং ভবতি তদাহ বাসোঽধিবাসং হিরণ্যমিত্যশ্বায়োপস্তৃণন্তি তস্মিন্নেনমধি সঞ্জ্ঞপয়ন্তি সঞ্জ্ঞপ্তেষু পশুষু পত্ন্যঃ পান্নেজনৈরুদায়ন্তি চতস্রশ্চ জায়াঃ কুমারী পঞ্চমী চত্বারি চ শতান্যনুচরীণাম্। নিষ্ঠিতেষু পান্নেজনেষু মহিষীমশ্বায়োপনিপাদয়ন্ত্যথৈনাবধিবাসেন সম্প্রোর্ণুবন্তি স্বর্গে লোকে প্রোর্ণুবাথামিত্যেষ বৈ স্বর্গো লোকো যত্র পশুং সঞ্জ্ঞপয়ন্তি নিরায়ত্যাশ্বস্য শিশ্নং মহিষ্যুপস্থে নিধত্তে বৃষা বাজী রেতোধা রেতো দধাত্বিতি মিথুনস্যৈব সর্বত্বায়।
শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.৫.২.১-২
= এই মন্ত্র দুটি উচ্চারণ করে তিনি (অধ্বর্যু) ‘অঙ্ঘ্রিগু’-র জন্য যা অবশিষ্ট থাকে তার ঘোষণা দেন (এভাবে)—‘একটি পোশাক, একটি উপরের পোশাক এবং স্বর্ণ’— এসব যা তারা অশ্বের জন্য বিছিয়ে দেন; অতঃপর একে (অশ্বটিকে) তার উপর ‘শান্ত’ (বধ) করেন। বধযোগ্য পশুগণকে বধ করার পর (রাজার) পত্নীগণ এদের পা ধুইয়ে দেবার জন্য জল নিয়ে হাজির হন, এরা চারজন রাজপত্নী এবং একজন যুবতী নারী—সব মিলে পাঁচজন এবং এদের সাথে আরো চারশ জন পরিচারিকা । পা ধোয়ার জল প্রস্তুত হলে পর তাঁরা মহিষীকে অশ্বের সমীপে শায়িত করেন এবং তাঁকে উপরের বস্ত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত করে ‘স্বর্গে তুমি নিজেকে এভাবে আচ্ছাদিত কর’—একথা বলেন; যেহেতু প্রকৃতপক্ষে ঐ হচ্ছে স্বর্গ যেখানে তাঁরা বধ্য অশ্বটিকে দেবোদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। ‘বিজয়ী পুরুষ, বীর্য-স্থাপক, বীর্য স্থাপন কর’—তিনি (মহিষী) যৌনমিলনের পূর্ণতার জন্য এরূপ কথা বলেন ।
একই ধরনের বিধি তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭.৪.১৯, আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র ২০.১৭.১২–১৭ ও ২০.১৮.৪, বৌধায়ন শ্রৌতসূত্র ১৫.২৯, শাঙ্খায়ন শ্রৌতসূত্র ১৬.৩.৩৩–৩৬ এবং কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র ২০.৬.১৪–১৬-তেও পাওয়া যায়; বিশেষত কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্রে অশ্বের জননেন্দ্রিয়কে মহিষীর জননেন্দ্রিয়ের সঙ্গে যুক্ত করার নির্দেশের আক্ষরিক উল্লেখ রয়েছে। শতপথ ব্রাহ্মণে উল্লিখিত অশ্ববধ এবং মৃত অশ্বের সমীপে মহিষীর শায়িত হয়ে যৌনমিলনের প্রতীকি আচারের এই বিবরণটি বৈদিক দর্শনের মৌলিক নীতিগুলোর বিচারে স্পষ্টতই বেদ-বিরুদ্ধ, রূপক ব্যাখ্যার অপভ্রংশ এবং পরবর্তীতে যুক্ত হওয়া প্রক্ষিপ্ত অংশ। প্রথমত, সনাতন প্রথা অনুযায়ী কেবল মূল মন্ত্র সংহিতাই পরম স্বতঃপ্রমাণ ও অপৌরুষেয় ‘বেদ’; শতপথ ব্রাহ্মণের মতো ব্যাখ্যাগ্রন্থ বা আচার-নির্দেশিকাগুলো মানব রচিত হওয়ায় মূল বেদের সাথে কোনো দ্বিমত তৈরি হলে সংহিতাই চূড়ান্ত প্রমান হিসেবে গণ্য হয়। দ্বিতীয়ত, ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদে ‘অশ্বমেধ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ কোনো অশ্ব বা ঘোড়াকে হত্যা করা নয়, বরং নিরুক্ত শাস্ত্র প্রণেতা আচার্য জাস্ক ও পরবর্তীতে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মতে 'অশ্ব' মানে জাতি বা রাষ্ট্রের ক্ষমতা/রাষ্ট্রযন্ত্র এবং 'মেধ' অর্থ সমৃদ্ধি বা পালন করা; অর্থাৎ রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাই হলো বৈদিক অশ্বমেধ। তৃতীয়ত, বেদ সংহিতায় পশুর প্রতি হিংসা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং নারীর মর্যাদা সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত; সেখানে মৃত অশ্বের সাথে মহিষীর এ জাতীয় জুগুপ্সিত বা অশ্লীল আচারের বিবরণ বৈদিক সভ্যতার পবিত্রতার সাথে চরম সংঘর্ষপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে, পরবর্তীকালে বামমার্গী বা যজ্ঞীয় জটিলতার যুগে কতিপয় ব্যাখ্যাদাতা ও লিপিকরদের হাত ধরে প্রাচীন উপমা ও প্রতীকী বৈদিক রূপকগুলোকে (যা মূলত রাষ্ট্রীয় উর্বরতা ও সুরক্ষার প্রতীক ছিল) আক্ষরিক ও বিকৃত রূপ দিয়ে ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে প্রক্ষিপ্ত (Interpolated) হিসেবে অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে, যা বৈদিক সংহিতার আলোর সম্পূর্ণ অসিদ্ধ ও বেদ-বহির্ভূত।
ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলি মূলত বেদমন্ত্রের বিনিয়োগ, ব্যাখ্যা ও সাংকেতিক অর্থ প্রকাশকারী ক্রমবিকাশমান বৈদিক সাহিত্য; এগুলিতে প্রাচীন ও পরবর্তী উভয় সময়ের বহু আচার্য, রাজা, গুরু-শিষ্যপরম্পরা ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। শতপথ ব্রাহ্মণ ১১।৬।২।১-এ বিদেহের জনক, শ্বেতকেতু আরুণেয়, সোমশুষ্ম সাত্যযজ্ঞি ও যাজ্ঞবল্ক্যের সমকালীনতার উল্লেখ আছে; শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪।৯।৩।১৫-২০, ১৪।৯।৪।৩৪-এ উদ্দালক আরুণি ও যাজ্ঞবল্ক্যের গুরু-শিষ্য সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়। শ্বেতকেতু ও উদ্দালকের সম্পর্ক ছান্দোগ্য উপনিষদ ৬।১।১ ও ৬।৮।১-এ, সত্যকাম জাবালের প্রসঙ্গ শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪।৬।১০।১৪-তে, চিত্র গার্গ্যায়ণি কৌষীতকি উপনিষদ ১।১-এ, কহোল কৌষীতক শাঙ্খ্যায়ন আরণ্যক ১৫।১-এ এবং হারিদ্রুমত গৌতম ছান্দোগ্য উপনিষদ ৪।৪।৩-এ উল্লিখিত। একইভাবে প্রবাহণ জৈবলি শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪।৯।১।১, শিলক শালাবত্য ও চৈকিতায়ন দাল্ভ্য ছান্দোগ্য উপনিষদ ১।৮।১, কবষ ঐলুষ ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২।৮।১ ও কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১২।৩, মৌদ্গল্য গোপথ ব্রাহ্মণ পূর্বভাগ ১।৩১, কেশী দার্ভ্য মৈত্রেয়াণী সংহিতা ২।১।৩ ও কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ৭।৪, শৌনক স্বৈদায়ন শতপথ ব্রাহ্মণ ১১।৪।১।১-২ ও গোপথ ব্রাহ্মণ পূর্বভাগ ৩।৬, কুসুরবিন্দ তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭।২।২, ষড়বিংশ ব্রাহ্মণ ১।৪।১৬, তাণ্ড্য ব্রাহ্মণ ২২।১৫।১০ ও জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ ১।৭৫-এ পাওয়া যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, ছান্দোগ্য উপনিষদ ৫।১১।১-২ এবং শতপথ ব্রাহ্মণ ১০।৬।১।১-২, ১৪।৮।১৫।১১-তে উদ্দালক আরুণির নিকট প্রাচীনশাল ঔপমন্যব, সত্যযজ্ঞ পৌলুষি, ইন্দ্রদ্যুম্ন ভাল্লবেয়, জন শার্করাক্ষ্য ও বুড়িল আশ্বতরাশ্বির সমবেত হওয়ার উল্লেখ আছে; মহারাজ অশ্বপতি ছান্দোগ্য উপনিষদ ৫।১১।৪-এ, জনমেজয় ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৮।২১ ও শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩।৫।৪।১-এ, দিবোদাস কাঠক সংহিতা ৭।৮-এ, ব্যাস পারাশর্য তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১।৯।৬-এ এবং মহিদাস ঐতরেয় জৈমিনীয় উপনিষদ ব্রাহ্মণ ৪।২।১১ ও ঐতরেয় আরণ্যক ২।১।৮-এ উল্লেখিত। বিশেষভাবে শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩।৫।৪।১১, ১৩, ১৪-তে দুষ্মন্ত, শকুন্তলা ও ভরত এবং ১৩।৫।৪।২১-এ শতানীক সাত্রাজিত ও ভরতের প্রসঙ্গ রয়েছে। ফলে অগ্নিবীরের আলোচ্য নিবন্ধটির মূল বক্তব্য হলো—ব্রাহ্মণগ্রন্থকে যদি সরাসরি অনাদি, নিত্য ও সর্বকালীন বেদ বলে অভিহিত করা হয়, তবে তাতে জনক-যাজ্ঞবল্ক্য থেকে শুরু করে ব্যাস, পরীক্ষিত, জনমেজয়, ভরত প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের উল্লেখ থাকার বিষয়টি বেদের অনাদিত্বের ধারণার সঙ্গে অসঙ্গতি তৈরি করবে; অতএব ব্রাহ্মণগ্রন্থকে বেদমন্ত্রের ব্যাখ্যা ও বিনিয়োগমূলক বৈদিক সাহিত্য হিসেবে পৃথকভাবে বোঝা প্রয়োজন।
ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোকে অন্ধভাবে 'বেদ' হিসেবে মেনে নেওয়ার এই মানসিকতা সনাতন চিন্তা এবং ঐতিহাসিক সত্যের ওপর এক বিরাট আঘাত। মূল বৈদিক সংহিতায় যেখানে অদ্বৈত পরমেশ্বর, সর্বজীবের প্রতি অহিংসা, বিজ্ঞানভিত্তিক জীবনচেতনা এবং নারীর সর্বোচ্চ মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, সেখানে রাজকীয় স্বার্থ ও মধ্যযুগীয় যজ্ঞীয় অন্ধবিশ্বাসের যুগে রচিত ব্রাহ্মণ গ্রন্থের কুসংস্কার, পশুহিংসা ও অশ্লীল রূপকগুলোকে 'ঈশ্বরীয় বাণী' বা 'বেদ' বলে চালিয়ে দেওয়া এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব। এই অন্ধ অনুসরণের ফলে সনাতন সংস্কৃতি নিজস্ব বিশুদ্ধ বৈদিক দর্শন হারিয়ে এক কুসংস্কারাচ্ছন্ন যজ্ঞসর্বস্ব ধর্মে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, তথাকথিত স্বঘোষিত মূলধারার সনাতন সমাজ তাদের নিজেদের এই মৌলিক ক্ষতি বা অপমানের ব্যাপারে প্রায় সম্পূর্ণ উদাসীন ও অচেতন। যে বেদ তাদের 'অঘ্ন্যা' বলে পশুকুলকে রক্ষা করতে শিখিয়েছিল, যে বেদ নারীকে 'ব্রহ্মবাদিনী'র আসনে বসিয়েছিল—সেই বেদের নাম ভাঙিয়ে শতপথ ব্রাহ্মণের মতো গ্রন্থে যখন বীভৎস পশুবলি বা মহিষীর অশ্বের সাথে অশালীন রীতির প্রক্ষিপ্ত বিধান লেখা হলো, তখনও সমাজ তা মুখ বুজে 'মহাপবিত্র' বলে গিলে চলেছে। তাদের কোনো বৈদিক সংহিতার প্রতি শ্রদ্ধা নেই, অনুশোচনা নেই, আর সত্য অনুসন্ধানের ইচ্ছাও নেই; কারণ সত্যের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে প্রথাকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরে রাখাই তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ।
তবে ইতিহাস প্রমাণ করে, তাদের এই উদাসীনতা ও আত্মতুষ্টি বৈদিক সংস্কৃতির কতটা অপূরণী য় ক্ষতি করেছে। ব্রাহ্মণ গ্রন্থের এসব কুৎসিত ও প্রক্ষিপ্ত অংশকেই ভিত্তি করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিধর্মী ও পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিক প্রাচ্যবিদরা (Orientalists) মূল বেদ সংহিতাকে আক্রমণ করেছে, বৈদিক সভ্যতাকে 'বর্বর' বলে চিহ্নিত করেছে এবং সনাতন সমাজকে হীনমন্যতায় ডুবিয়েছে। তবুও যদি এখনো সনাতন সমাজ ঘুম ভেঙে মূল বৈদিক সংহিতা ও প্রক্ষিপ্ত ব্রাহ্মণের পার্থক্য বুঝতে না চায়, তবে তাতে মূল বেদের সার্বভৌম সত্যতার বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয় না; ক্ষতি কেবল তাদেরই, যারা ঈশ্বরপ্রদত্ত যুক্তি ও বিবেক বিসর্জন দিয়ে মিথ্যাচার আর কলঙ্ককে 'বেদ' বলে মাথায় তুলে রেখে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

0 মন্তব্য(গুলি)