বেদ হলো পরমেশ্বরের অপৌরুষেয় জ্ঞান ও রূপক বাণীর সমাহার। কিন্তু বেদশাস্ত্রের সঠিক ব্যাকরণ ও নিঘণ্টু-নিরুক্তভিত্তিক প্রয়োগ অনুধাবন না করে অনেকে বৈদিক পরিভাষার স্থূল ও লৌকিক অর্থ করে বিভ্রান্তি ছড়ান। এর অন্যতম বড় উদাহরণ হলো ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ২৮ সূক্তের ৩ নম্বর মন্ত্রটি। তথাকথিত কিছু অনুবাদক বেদমাতার ওপর কালিমা লেপন করতে গিয়ে কুযুক্তি দিয়ে দাবি করেন যে, এখানে জীবাত্মা বা রাজা যিনি ইন্দ্র-পদবাচ্য তাকে কিনা ‘ষাঁড়ের মাংস’ ভক্ষণ করতে বলা হয়েছে। অথচ নিঘণ্টু, নিরুক্ত, উণাদিকোশ এবং ব্যাকরণের মূল নীতি দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে 'বৃষভ' বা 'পচৎ' শব্দ দ্বারা কেবল কোনো পশু কিংবা পশুমাংস রাঁধাকে নির্দেশ করে না; বরং তা যথাক্রমে 'সুখ বা পুষ্টি বর্ষণকারী পদার্থ' এবং 'রন্ধন করা বা প্রস্তুত করা'-কে বোঝায়। বৈদিক ভাষাতত্ত্ব ও ঐতিহ্যবাহী প্রমাণের আলোকে এই মিথ্যাচারের অকাট্য জবাব নিচে সুবিন্যস্তভাবে উপস্থাপন করা হলো।
অদ্রিণা তে মন্দিন ইন্দ্র তুয়ান্তসুন্বন্তি সোমন্পিবসি ত্বমেষাম্। পচন্তি তে বৃষভাং অৎসি তেষা পৃক্ষেণ যন্মঘবন্হূয়মানঃ ॥
ঋগ্বেদ ১০।২৮।৩
- সায়ণভাষ্য অবলম্বনে করা অনুবাদ:
মানব সকলে (যজমানগণ) প্রস্তরফলক দ্বারা আনন্দদায়ক, তীব্র সোমরস তোমার উদ্দেশে নিষ্পেষণ করে। তুমি এই সকলের সোমপান কর। তোমারই জন্য বৃষসকল রন্ধন করা হয়, হে মঘবন্ (ইন্দ্র), যখন তোমাকে অন্নের (হব্যের) সহযোগে আহ্বান করা হয় তাদের (অংশ) ভক্ষণ কর।
[অনুবাদ: ঋগ্বেদ-সংহিতা, ৫ম ভাগ; রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার]
হে ইন্দ্র! যখন অন্ন কামনাতে তোমার উদ্দেশে হোম করা হয়, তখন তারা শীঘ্র শীঘ্র প্রস্তরফলক সহযোগ মাদকতাশক্তিযুক্ত সোমরস প্রস্তুত করে, তুমি তাহা পান কর। তাহারা বৃষভসমূহ পাক করে, তুমি তাহা ভোজন কর।
[অনুবাদ: ঋগ্বেদ সংহিতা, শ্রী রমেশ চন্দ্র দত্ত]
- প্রতি পদের অনুবাদ:
(ইন্দ্র) হে আত্মা বা রাজা! (তে অদ্রিণা) তোমার জন্য প্রশংসক ['অদ্রিরসি শ্লোককৃৎ' কাঠ০ স০ ১।৫] বৈদ্য বা পুরোহিত দ্বারা প্রেরিত (মন্দিনঃ) তোমার প্রসন্নকারী পারিবারিক জন বা রাজকর্মচারী (তুয়াৎ সোমাষ সুবন্তি) রসময় সোম প্রস্তুত করে ['তুয়ম্ উদকনাম' নিঘ০ ১।৯] (তেষাং ত্বং পিবসি) যা তুমি পান করো [ 'লিঙ্ অর্থে লেট্' অষ্টা০ ৩।৪।৭]এবং (তে) তোমার জন্য (বৃষভান্ পচন্তি) সুখবর্ষণক ['বৃষভো বর্ষিতাপাম্' নিরুক্ত ৪।৮, 'বৃষভঃ প্রজাং বর্ষতীতি বা। অতিবৃহতি রেত ইতি বা। তদ্বর্ষকর্মা বর্ষণাদ্বৃষভঃ। তস্যৈষা ভবতি' নিরুক্ত ৯।২২; 'ঋষিবৃষিভ্যাং কিৎ' উণাদি কোষ ৩।১২৩; 'বৃষভঃ = যো বর্ষতি সুখানি সঃ' ঋগ্বেদ ১।৩১।৫ দয়ানন্দঃ] ভোগসমূহ প্রস্তুত করে (মঘবন্ পৃক্ষেণ হূয়মানঃ) হে আত্মন! রাজন্! স্নেহের সাথে নিমন্ত্রিত করা (তেষাম্-অৎসি) সেসব তুমি উপভোগ করো।
সাধারণ লৌকিক সংস্কৃতিতে 'বৃষভ' বলতে পশু (ষাঁড়) বোঝানো হলেও বৈদিক সংস্কৃত হলো যৌগিক বা 'যৌগিক-রূঢ়' ভাষা। নিরুক্তকার মহর্ষি যাঙ্ক স্পষ্ট লিখেছেন— “বৃষভো বর্ষিতাপাম্” (নিরুক্ত ৪।৮) এবং “বৃষভঃ প্রজাং বর্ষতীতি বা... তদ্বর্ষকর্মা বর্ষণাদ্বৃষভঃ” (নিরুক্ত ৯।২২)। অর্থাৎ যা থেকে সুখ, জল, বীর্য বা শুভ ফল বর্ষিত হয়, তাকেই বৈদিক পরিভাষায় 'বৃষভ' বলা হয়।
উণাদি কোশ (৩।১২৩) এবং মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী— “যো বর্ষতি সুখানি সঃ”—যিনি বা যা সুখ বর্ষণ করে, তা-ই বৃষভ।
যদি কেউ কুতর্ক করতে চান বৃষভ অর্থ প্রচলিত 'ষাঁড়'ই হবে তবে সায়ণাচার্য নিজেও সর্বত্র বৃষভ অর্থ ষাঁড় করেননি এমন দেখা যায়, উদাহরণ— 'হে অগ্নে বৃষভ ফলস্য বর্ষিতস্ত্বং' = হে ফলবর্ষক অগ্নিদেব [ঋগ্বেদ ২.৩.১১], 'তথা বৃষভঃ অভিমতফলানাং বর্ষক ইন্দ্রঃ' = অভীষ্ট ফলবর্ষক ইন্দ্র [ঋগ্বেদ ৩.৩০.৯], 'বৃষভস্য বর্ষকস্য সোমস্য' = বর্ষক সোক [ঋগ্বেদ ৯.১৯.৪], 'যঃ পর্জন্যঃ বৃষভঃ অপাং বর্ষিতা' = জল বর্ষক পর্জন্য [ঋগ্বেদ ৫.৮৩.১], 'হে রুদ্র...হে বৃষভ কামানাং বর্ষিতর্দুষ্টুতী' = হে কামনা বর্ষক রুদ্র [ঋগ্বেদ ২.৩৩.৪], 'বৃষভাসঃ বর্ষিতারঃ রেতোধাঃ উদকস্য ধারকাঃ দ্যুমন্তঃ দীপ্তিমন্তোঽগ্নিবায়্বাদিত্যাঃ' = পৃথিবী, অন্তরিক্ষ ও দ্যুলোকেস্থিত জলবর্ষক দ্যুতিমান যথাক্রমে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য [ঋগ্বেদ ৫.৬৯.২], 'সহস্রশৃঙ্গঃ সহস্রকিরণঃ বৃষভঃ কামানাং বর্ষিতা যঃ সূর্যঃ' = সহস্র কিরণযুক্ত ও কামনাবর্ষক সূর্য [ঋগ্বেদ ৭.৫৫.৭], 'বৃষভস্য ফলস্য বর্ষিতুর্যজ্ঞস্য' = ফলবর্ষক যজ্ঞ [ঋগ্বেদ ১.১৬৬.১], 'বৃষভং সেক্তারং দ্যুলোকং' = জলীয় সিক্তকর্তা দ্যুলোক [ঋগ্বেদ ১.১৬০.৩], 'বৃষভায় তব যোনৌ রেতঃ সেক্ত্রে পুরুষায় আত্মীয়ং' = বীর্য সিঞ্চনকারী পুরুষ তথা পতি [ঋগ্বেদ ১০.১০.১০] ইত্যাদি ইত্যাদি। সুতরাং, মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী ও আর্যবিদ্বান বৃষভ অর্থ যদি যৌগিক পদ্ধতিতে ব্যাখ্যাপূর্বক বেদমাতার উপর আরোপিত সায়ণাদি ভাষ্যকারের কল্পিত কালিমা দূর করেন, তবে তার বিরোধীতা করার পূর্বে নিজস্ব ভাষ্যকারদের দিকেও তাকানো প্রয়োজন। অতএব, সর্বক্ষেত্রেই 'বৃষভ' মানে পশু ধরে মাংসের কল্পনা করা সম্পূর্ণ কুসংস্কার ও অর্থগত বিকৃতি।
মন্ত্রে ব্যবহৃত “বৃষভান্ পচন্তি” বাক্যাংশে 'পচ্' ধাতুর অর্থ কেবল মাংস সিদ্ধ করা নয়, বরং খাদ্যদ্রব্য, ওষধির রস বা ভোগ-সামগ্রী পাক করা, পরিপক্ক করা বা প্রস্তুত করা। আর 'পৃক্ষ' মানে অন্ন বা হব্যদ্রব্যের পুষ্টিকর মিল মিশিয়ে সমাদরে নিবেদন করা।
আলোচ্য মন্ত্রের পদার্থের সরলার্থ: হে আত্মা বা রাজা! প্রশংসাকারী বৈদ্য পুরোহিত কর্তৃক প্রেরিত এবং আপনাকে আনন্দ প্রদানকারী পরিজন বা রাজকর্মচারীগণ আপনার সন্তুষ্টির জন্য রসপূর্ণ সোমরস প্রস্তুত করেন, যা আপনি পান করে থাকেন। হে ধনবান বা ঐশ্বর্যশালী জীবাত্মা বা রাজা! আপনার জন্য সুখ প্রদানকারী নানা ভোগ-সামগ্রী প্রস্তুত করা হয় এবং পরম স্নেহে নিমন্ত্রিত হয়ে আপনি সেইসব ভোগসামগ্রী সানন্দে উপভোগ করেন।
এই মন্ত্রের প্রকৃত শিক্ষা দ্বিবিধ—
১. আধ্যাত্মিক পক্ষে (আত্মা): জীবাত্মা যখন মানব শরীরে অবস্থান করে, তখন তার ধারক শক্তি বা স্থায়িত্বের জন্য চিকিৎসক বা বৈজ্ঞানিকগণ (অদ্রি/স্তোতা) সুপরামর্শ দেন এবং পরিজনরা পুষ্টিকর সোমরস ও নানা সুখবর্ধক (বৃষভ) ভোজ্যপদার্থ প্রস্তুত করে (পচন্তি) আহার করান, যা আত্মাকে সুস্থ ও পুষ্ট রাখে।
২. আধিভৌতিক বা রাজনৈতিক পক্ষে (রাজা): রাজা যখন রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তখন বিশ্বস্ত প্রজা, পুরোহিত ও রাজকর্মচারীগণ রাজার সন্তুষ্টি ও শক্তির জন্য সুগন্ধি ওষধিসমৃদ্ধ সোমরস প্রস্তুত করেন। রাজাকে পরম স্নেহে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাষ্ট্রকে সুশাসিত রাখার উপযোগী নানা সুখকর ভোগ-সামগ্রী (বৃষভ) উপহার দেন, যা রাজা সানন্দে উপভোগ করেন।
পরিশেষে এটি সুস্পষ্ট ও প্রমাণিত হয় যে, ঋগ্বেদের ১০.২৮.৩ মন্ত্রে মাংসাহারের কোনো দূরতম উল্লেখও নেই। বেদমন্ত্রকে লৌকিক অর্থে বিচার করে ইন্দ্রের ওপর মাংস ভক্ষণের কাল্পনিক অপবাদ দেওয়া মূলত মধ্যকালীন ভাষ্যকার সায়ণ ও তাদের প্রাচ্য-পাশ্চাত্য অনুসারীদের অজ্ঞতা অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কুৎসার ফল। 'বৃষভ' শব্দটি এখানে পরমেশ্বরের কৃপায় তথা তদানুকূল প্রকৃতির নিয়মে প্রাপ্ত ‘সুখবর্ষী ভোগ-সামগ্রী ও পুষ্টিকর খাদ্যবস্তু’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বৈদিক ব্যাকরণ, নিঘণ্টু এবং স্বয়ং প্রাচ্য ভাষ্যকারদের প্রমাণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বেদ সর্বদা অহিংসা, পবিত্রতা এবং পুষ্টিকর সাত্ত্বিক ভোজনের কথাই প্রবর্তন করে। তাই অর্থ না বুঝে করা অসৎ কুতর্ক এড়িয়ে শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ ও সত্য-বিদ্যার আলোকেই বেদমন্ত্রের পরম কল্যাণময় শিক্ষাকে গ্রহণ করা প্রতিটি আর্য ও জ্ঞানপিপাসু মানুষের প্রকৃত কর্তব্য।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর







0 মন্তব্য(গুলি)