https://www.idblanter.com/search/label/Template
https://www.idblanter.com
BLANTERORBITv101

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্বাধ্যায় [১০] গীতা ২.৪২-৪৪ ~ বেদনিন্দা নাকি বেদবিরোধী নাস্তিকদের অপব্যাখ্যা ?

Monday, September 21, 2026

✅শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্বাধ্যায় [১০] গীতা ২.৪২-৪৪ ~ বেদনিন্দা নাকি বেদবিরোধী নাস্তিকদের অপব্যাখ্যা ?

ভোগবাদ এবং ত্যাগবাদ—এই দুটি ‘বাদ’ অনাদিকাল থেকেই প্রচলিত। বৈদিক ধর্ম জগৎকে ত্যাগের বার্তা দিয়েছে। সেই কারণে যজুর্বেদের নির্দেশ—‘ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ’ যজুর্বেদ ৪০।১, অর্থাৎ ত্যাগের মাধ্যমে ভোগ করো। পক্ষান্তরে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা বলে—যতদিন বেঁচে আছ, সুখে ভোগ করো। এই দুই প্রবণতার মধ্যে বৈদিক আদর্শ হলো ত্যাগের ভিত্তিতে ভোগ, অর্থাৎ আসক্তিপূর্ণ স্বার্থপর ভোগ নয়; কর্তব্য, দান ও যজ্ঞের মাধ্যমে প্রাপ্ত বস্তুর যথাযথ ব্যবহার।

ভোগবৃত্তি পশুপাখির মধ্যে জন্মসিদ্ধ এবং পাশবিক প্রবৃত্তিসম্পন্ন মানুষের মধ্যেও তা দেখা যায়। কিন্তু মানুষের বিশেষত্ব তার বিচারবুদ্ধি ও আত্মোন্নতির ক্ষমতায়। তাই ভোগবাদের পরিবর্তে ত্যাগের আদর্শকে মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করাই বৈদিক ধর্মের অভীষ্ট। ভগবদ্গীতাতেও এই বৈদিক সিদ্ধান্তেরই প্রচার করা হয়েছে। সেখানে ভোগবৃত্তিসম্পন্ন মানুষের যে লক্ষণগুলি বলা হয়েছে, সেগুলি অন্যের দোষ দেখার জন্য নয়; বরং নিজের চরিত্রের মধ্যেও এই প্রবৃত্তি আছে কি না, তা বিচার করে দূর করার জন্য।

যামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতঃ ।

বেদবাদরতাঃ পার্থ নান্যদস্তীতি বাদিনঃ ॥ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৪২॥

কামাত্মানঃ স্বর্গপরা জন্মকর্মফলপ্রদাম্ ।

ক্রিয়াবিশেষবহুলাং ভোগৈশ্বর্যগতিং প্রতি ॥ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৪৩॥

প্রথম লক্ষণ হলো ‘অবিপশ্চিতঃ’। ‘অবিপশ্চিৎ’ অর্থ—যে কোনো বিষয়কে বিশেষভাবে দেখে না এবং দেখা বিষয় নিয়ে ভালোভাবে বিচার করে না। যে বিচার করে, তাকে বিপশ্চিত্ বা জ্ঞানী বলা হয়; আর যে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে না, সে অ-বিপশ্চিৎ বা অজ্ঞানী। মানুষের কর্তব্য কেবল চোখ দিয়ে দেখা নয়, দেখা বিষয়কে বিচার করা—কী সত্য, কী অসত্য, কী কল্যাণকর এবং কী অকল্যাণকর। পশু চোখ দিয়ে দেখে, কিন্তু মানুষের মতো বিচার করে না। তাই যে মানুষ বিচারবুদ্ধি পরিত্যাগ করে কেবল আহার, নিদ্রা ও মৈথুনের মতো পাশবিক প্রবৃত্তির মধ্যে জীবন কাটায়, সে মনুষ্যদেহ ধারণ করেও পশুবৃত্তির ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না।

দ্বিতীয় লক্ষণ ‘বেদবাদরতাঃ’। এর অর্থ বেদের নিন্দা নয়; বরং বেদের নামে কেবল কথার তর্ক-বিতর্কে আসক্ত থাকা। কোনো ব্যক্তি বেদ নিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে আলোচনা করতে পারে, শাস্ত্রার্থে নিজেকে পণ্ডিত বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং মনে করতে পারে—‘আমি বেদের তত্ত্ব যথাযথ জেনেছি।’ কিন্তু সেই জ্ঞান যদি তার চরিত্র ও কর্মে প্রকাশিত না হয়, তবে তা প্রকৃত জ্ঞান নয়। কেবল শব্দ, তর্ক ও পাণ্ডিত্য নিয়ে অহংকার করা অজ্ঞানেরই অন্য রূপ। আর এই বিষয়টি গীতাতেই প্রথম বলা হয়েছে এমন কিন্তু মোটেও নয়। বরং গীতা যে বেদেরই প্রতিধ্বনি রূপে আমরা বলছি সেই বেদই বলেছে-

ন তং বিদাথ য ইমা জজানান্যদ্যুষ্মাকমন্তরং বভূব ।

নীহারেণ প্রাবৃতা জল্প্যা চাসুতৃপ উক্থশাসশ্চরন্তি ॥

ঋগ্বেদ ১০.৮২.৭

= হে মানবগণ! তোমরা কি সেই পরমাত্মাকে চেনো না, নাকি তোমরা তাঁকে জানতেও আগ্রহী নও, যিনি এই নিখিল ভুবন সৃজন করেছেন? যিনি পরম সূক্ষ্মভাবে তোমাদের অন্তরে বিদ্যমান থেকেও আত্মিক সত্তা ও প্রকৃতির নিয়ম অপেক্ষা সম্পূর্ণ পৃথক ও অনাসক্ত। মানুষ আজ বিবেক ও জ্ঞানকে হরণকারী ঘোর অজ্ঞানের কুয়াশায় আবৃত হয়ে রয়েছে। তারা কেবল দৈহিক জীবনধারণ, শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া ও সামান্য প্রাণপোষণেই পরম তৃপ্ত থাকছে; প্রকৃত প্রজ্ঞা বা আধ্যাত্মিক সুগভীর সুশ্রুত জ্ঞান অর্জন না করে কেবল শাস্ত্র ও বেদবাক্যের উপরিউপরি বাচনিক আবৃত্তি করে চলেছে। তারা মুখের বাচালতা ও বাগ্ধাড়ম্বরে পরিবেষ্টিত হয়ে সংসারচক্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরমব্রহ্ম ও আত্মতত্ত্ব সম্পর্কে কেবল অগভীর দীর্ঘ আলোচনা বা বিতর্কই তারা করতে পারে, কিন্তু সেই পরম সত্তার প্রকৃত আত্মসাক্ষাৎকার তাদের অন্তরে কখনোই ঘটে না।

এই কারণেই তৃতীয় লক্ষণ হিসেবে বলা হয়েছে—‘ন অন্যৎ অস্তি’ অর্থাৎ, ‘এর বাইরে আর কিছু নেই’—এই ধরনের মতবাদে স্থির থাকা। এমন ব্যক্তি শাস্ত্রের নানা সিদ্ধান্ত, মুক্তি, ঈশ্বর, প্রলয় ইত্যাদি বিষয়ে বড় বড় কথা বলতে পারে; কিন্তু নিজের উন্নতির জন্য যে কর্তব্য পালন করা প্রয়োজন, তা পালন করে না। তার ধারণা হয়, বেদের সিদ্ধান্ত জানা হয়ে গেলে আর কোনো কর্তব্য অবশিষ্ট থাকে না। অথচ জ্ঞানের সার্থকতা তার আচরণে। শুধু জানা এবং সেই অনুযায়ী জীবনযাপন করা এক বিষয় নয়।

চতুর্থ লক্ষণ ‘কামাত্মানঃ’। কামাত্মা অর্থ—যার আত্মা বা জীবন কামনায় আবদ্ধ, যার সমস্ত চিন্তা ও কর্ম ইন্দ্রিয়সুখের চারদিকে আবর্তিত। এই ব্যক্তি বিষয়ভোগ ছাড়া জীবনের কোনো উচ্চতর উদ্দেশ্য দেখতে পায় না। অজ্ঞানতার কারণে সে আত্মোন্নতির পরিবর্তে শরীর ও ইন্দ্রিয়ের প্রবৃত্তিকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য মনে করে। ফলে তার জীবন ক্রমশ পাশবিক ভোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

পঞ্চম লক্ষণ ‘স্বর্গপরাঃ’। অর্থাৎ যে ব্যক্তি জাগতিক সুখলাভ ও সুখকর ভোগকেই মানুষের সর্বোচ্চ লক্ষ্য মনে করে। সে সুখ লাভের উদ্দেশ্যে নানা যজ্ঞ ও ক্রিয়া করতে পারে, কিন্তু মানুষের ইহলোকীয় কর্তব্য, সামাজিক দায়িত্ব ও আত্মোন্নতির বিষয়কে উপেক্ষা করতে পারে। এখানে সুখের গুরুত্বকে অস্বীকার করা উদ্দেশ্য নয়; বরং সুখকেও কেবল ভোগের ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করাই সমস্যার বিষয়। বিষয়ভোগ যেমন আসক্তির কারণ, তেমনি কেবল সুখের আকাঙ্ক্ষাও ভোগাসক্তি থেকে মুক্ত নয়।

পাতঞ্জল যোগদর্শনের ভাষ্যকার ব্যাসমুনিও বৈরাগ্যের ব্যাখ্যায় দৃষ্ট ও শ্রুত—উভয় প্রকার বিষয় থেকে আসক্তি দূর করার কথা বলেছেন—

স্ত্রিয়োঽন্নপানমৈশ্বর্যমিতি দৃষ্টবিষয়ে বিতৃষ্ণস্য স্বর্গবৈদেহ্যপ্রকৃতিলয়ত্বপ্রাপ্তাবানুশ্রবিকবিষয়ে বিতৃষ্ণস্য দিব্যাদিব্যবিষয়সম্প্রয়োগেঽপি চিত্তস্য বিষয়দোষদর্শিনঃ প্রসঙ্খ্যানবলাদনাভোগাত্মিকা হেয়োপাদেয়শূন্যা বশীকারসংজ্ঞা বৈরাগ্যম্ ॥ যোগ ১।১৫ ব্যাসভাষ্য
অর্থাৎ, স্ত্রী, অন্নপান, ঐশ্বর্য প্রভৃতি দৃষ্ট বিষয় এবং স্বর্গ প্রভৃতি শ্রুত বিষয়—উভয়ের প্রতিই আসক্তি ত্যাগ করে চিত্তকে সংযত রাখাই বৈরাগ্য। আত্মোন্নতির পথে চলতে হলে মানুষকে ভোগের দাস না হয়ে ইন্দ্রিয় ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

ষষ্ঠ লক্ষণ হলো—‘ভোগৈশ্বর্যগতিং প্রতি জন্মকর্মফলপ্রদাং ক্রিয়াবিশেষবহুলাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্তি।’ অর্থাৎ ভোগ ও ঐশ্বর্য লাভের উদ্দেশ্যে জন্ম-কর্মফলপ্রদ বিভিন্ন ক্রিয়ার কথা বলে তারা আকর্ষণীয় ও মনোহর ভাষণ প্রচার করে। বাহ্যিকভাবে সুন্দর ও চমকপ্রদ কথার মাধ্যমে তারা অজ্ঞ মানুষকে আকৃষ্ট করে এবং ভোগকেন্দ্রিক জীবনদর্শনের প্রতি প্রবৃত্ত করে। ফলে নিজে অন্ধ হয়েও অন্য অন্ধদের সঙ্গে নিয়ে পতনের দিকে এগিয়ে যায়।

এর পরিণতি সপ্তম লক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে—‘তয়া অপহৃতচেতসাং ভোগৈশ্বর্যপ্রসক্তানাং বুদ্ধিঃ ব্যবসায়াত্মিকা সমাধৌ ন বিধীয়তে।’ অর্থাৎ এই পুষ্পিত বাক্যে যাদের চিত্ত হরণ হয়েছে এবং যারা ভোগ ও ঐশ্বর্যের প্রতি আসক্ত হয়েছে, তাদের বুদ্ধি স্থির ও একাগ্র থাকে না। অতিরিক্ত ভোগাসক্তি মানুষের বিচারশক্তিকে দুর্বল করে; সে ভালো-মন্দের যথাযথ বিচার করতে পারে না, কোনো একটি সৎ কর্মে দৃঢ়ভাবে স্থির হতে পারে না এবং তার মন এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে ছুটে বেড়ায়। ফলে জীবনে প্রকৃত উন্নতি সাধিত হয় না।

এখানে বিশেষভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, ‘বেদবাদরতাঃ’ শব্দটি কোনোভাবেই পরম পবিত্র বেদের প্রামাণ্য বা মাহাত্ম্যকে খণ্ডন বা নিন্দা করে না। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান স্বয়ং বেদের পরম মর্যাদা স্বীকার করে ঘোষণা করেছেন—‘আমি বেদসমূহের মধ্যে সামবেদ’ (‘বেদানাং সামবেদোঽস্মি’ গীতা ১০।২২), ‘সমস্ত বেদের দ্বারা মূলত আমারই স্বরূপ জ্ঞাত হওয়া যায়’ (‘বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো’ গীতা ১৫।১৫), ‘আমিই প্রকৃত বেদজ্ঞ’ (‘বেদান্তকৃদ্বেদবিদেব চাহম্’ গীতা ১৫।১৫) এবং ‘আমিই ঋক্, সাম ও যজুঃ’ (‘বেদ্যং পবিত্রমোঙ্কার ঋক্সাম যজুরেব চ’ গীতা ৯।১৭)। সুতরাং গীতায় বর্ণিত এই অনুশাসন বা তত্ত্ব কোনো অবস্থাতেই মূল বেদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়; বরং বেদের প্রকৃত আধ্যাত্মিক ও তত্ত্বগত মর্ম উপলব্ধি না করে কেবল বাহ্যিক শাব্দিক তর্ক, অগভীর শুষ্ক পাণ্ডিত্য এবং ভৌতিক ভোগসুখ লাভের উদ্দেশ্যে বেদের অপব্যাখ্যায় লিপ্ত ব্যক্তিদের (যেমন ২।৪২-৪৩ শ্লোকে বলা হয়েছে) ভোগকেন্দ্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধেই গীতার এই পরম উপদেশ।


শাস্ত্রের শব্দ জানা এবং শাস্ত্রের তত্ত্ব উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। অন্ন শব্দটি জানা যেমন ক্ষুধা দূর করে না, তেমনি কেবল শাস্ত্রের শব্দ মুখস্থ করলেও তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। সরাসরি বেদেই এই সত্য প্রকাশিত হয়েছে—

ঋচো অক্ষরে পরমে ব্যোমন্যস্মিন্দেবা অধি বিশ্বে নিষেদুঃ।

যস্তন্ন বেদ কিমৃচা করিষ্যতি য ইত্তদ্বিদুস্ত ইমে সমাসতে ॥

ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৩৯

= যিনি অবিচল ও অবিনাশী, যিনি সর্বোচ্চ আকাশবৎ সর্বব্যাপী পরমাত্মা—যাঁতে ঋগ্বেদাদি চতুর্বেদের পরম সত্য প্রতিষ্ঠিত এবং যাঁর আশ্রয়ে পৃথিবী ও সূর্যলোকসহ সমস্ত দেব ও লোকসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে; যে ব্যক্তি সেই পরমেশ্বরকে জানে না, চার বেদ অধ্যয়ন করে তার কী লাভ হবে? কিন্তু যাঁরা সেই পরমব্রহ্মকে সম্যক্ অবগত হন, তাঁরাই কেবল সেই পরমাত্মার আমোদ ও আনন্দের মধ্যে সুদৃঢ়ভাবে স্থিত থাকেন।


এবং—

উত ত্বঃ পশ্যন্ন দদর্শ বাচমুত ত্বঃ শৃণ্বন্ন শৃণোত্যেনাম্ ।

উতো ত্বস্মৈ তন্বং বি সস্রে জায়েব পত্য উশতী সুবাসাঃ ॥

ঋগ্বেদ ১০.৭১.৪

= অনেক সময় কেউ দেখেও এই পরম বেদবাণীকে প্রকৃতপক্ষে দেখতে পায় না এবং কেউ শুনেও একে অনুধাবন করতে পারে না। যে ব্যক্তি বেদবাণীকে দেখে বা শুনে তোতাপাখির মতো কেবল হুবহু উচ্চারণ করে কিন্তু তার অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝে না, সে মূলত দেখেও অন্ধ এবং শুনেও বধির। অর্থ না বুঝে কেবল বাণী উচ্চারণ করা সম্পূর্ণ অর্থহীন ও নিরর্থক। অপরপক্ষে, একজন সত্যিকারের প্রজ্ঞাবান ও সুমেধা পুরুষ সর্বতোভাবে বেদবাণীর মর্মার্থ অনুধাবনের চেষ্টা করেন। বেদের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনাকে তিনি পরম ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন এবং কেবল তোতাপাখির মতো না আবৃত্তি করে বা চন্দন কাঠ বহনকারী গাধার মতো না হয়ে সত্যজ্ঞানের অনুসন্ধানী হন। পরম কল্যাণকামী ও সুন্দর পোশাকে সুসজ্জিত অনুরাগী স্ত্রী যেভাবে পরম প্রেমে স্বামীর কাছে নিজ রূপ উন্মোচিত করে, ঠিক তেমনি এই বেদবাণীও সেই অর্থজ্ঞ ও শ্রদ্ধাশীল পুরুষের সম্মুখে নিজের পরম সুষমা ও বাস্তবিক রহস্য প্রকাশ করে দেয়। একমাত্র তত্ত্বজ্ঞ পুরুষই বেদবাণীর প্রকৃত স্বরূপ প্রত্যক্ষ করতে সমর্থ হন এবং তা থেকে পরম আনন্দ ও প্রজ্ঞা লাভ করেন।

অর্থাৎ কেবল দেখা বা শোনা যথেষ্ট নয়; বাণীর প্রকৃত তত্ত্ব উপলব্ধি করতে হবে। তাই বেদের শব্দজ্ঞানকে জীবনের জ্ঞান ও কর্মে রূপান্তর করাই প্রকৃত উদ্দেশ্য।


  • এই আলোচনার মূল শিক্ষা হলো—মানুষের জীবন কেবল ভোগের জন্য নয়। ভোগাসক্তি মানুষকে বিচারহীনতা, কামনা, চঞ্চলতা ও কর্তব্যবিমুখতার দিকে নিয়ে যায়; আবার কেবল শাস্ত্রের শব্দ ও তর্কে আসক্তিও তাকে প্রকৃত জ্ঞান থেকে দূরে রাখতে পারে। বৈদিক আদর্শ হলো জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করা, ত্যাগ ও সংযমের মাধ্যমে ভোগকে নিয়ন্ত্রিত করা এবং স্বকর্তব্যে স্থির থাকা।


অর্জুনও বহু গভীর কথা বলেছিলেন, কিন্তু স্বকর্তব্য পালন থেকে সরে যেতে চেয়েছিলেন। তাই তাকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল—শুধু কথায় নয়, কর্তব্যকর্মের মধ্যেই জ্ঞানের সার্থকতা। আমাদেরও তাই শাস্ত্রের শব্দ নিয়ে কেবল বাদ-বিতর্কে মগ্ন না হয়ে তার তত্ত্বকে চিন্তা, চরিত্র ও কর্মে প্রকাশ করতে হবে। মনুষ্যজন্মের সার্থকতা পাশবিক ভোগে নয়, বরং জ্ঞান, ত্যাগ, সংযম ও কর্তব্যনিষ্ঠ জীবনে।

🖋 শ্রী দীপংকর সিংহ দীপ

ব্যাকরণ-বেদান্ত-স্মৃতি-পৌরোহিত্য-আয়ুর্বেদতীর্থ

শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর