✅শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্বাধ্যায় [১১] গীতা ২.৪৫-৪৬ ~ বেদ ত্যাগের উপদেশ নাকি বেদবিরোধী সাম্প্রদায়িকদের অপপ্রচার ?
ভারতীয় দর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনার মূল ভিত্তি হলো ত্রিগুণতত্ত্ব—সত্ত্ব, রজ ও তম। বেদ থেকে শুরু করে উপনিষদ এবং ভগবদ্গীতা পর্যন্ত এই তিন গুণের বর্ণনা ও এর মাধ্যমে মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে বেদ ও গীতার আলোকে ত্রিগুণতত্ত্বের স্বরূপ, এর প্রয়োগ এবং কীভাবে মানুষ তমোগুণ থেকে উঠে সত্ত্বগুণে স্থির হয়ে গুণাতীত অবস্থা লাভ করতে পারে—তা পর্যায়ক্রমে উপস্থাপন করা হলো। সাধারণভাবে সত্ত্ব, রজ ও তম—এই তিন গুণের স্বরূপ যারা বিশদভাবে জানতে চান, তারা ভগবদ্গীতার ১৭তম ও ১৮তম অধ্যায় অধ্যয়ন করতে পারেন।
🔰তমোগুণ: স্বরূপ ও পরিণাম
ভগবদ্গীতার ১৭তম ও ১৮তম অধ্যায়ে সত্ত্ব, রজ ও তম—এই ত্রিগুণের স্বরূপ বিস্তারিতভাবে বিবৃত হলেও বেদে রূপকের মাধ্যমে তমোগুণের বিনাশ ও আত্মজয়ের পরম রহস্য প্রস্ফুটিত হয়েছে। তমোগুণ হলো মূলত অজ্ঞানতা, অলসতা, প্রচ্ছন্ন জড়তা ও পরম অন্ধকারের প্রতীক, যা বেদসংহিতায় ‘বৃত্র’ বা ‘অহি’ রূপী অসুরের মাধ্যমে চিহ্নিত।
অতিষ্ঠন্তীনামনিবেশনানাং কাষ্ঠানাং মধ্যে নিহিতং শরীরম্ ।
বৃত্রস্য নিণ্যং বি চরন্ত্যাপো দীর্ঘং তম আশয়দিন্দ্রশত্রুঃ ॥
ঋগ্বেদ ১.৩২.১০
ঋগ্বেদের ১.৩২.১০ মন্ত্রটি মানুষের অবচেতন সত্তায় প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে থাকা কাম-বাসনার স্বরূপ উন্মোচন করে। কাম আপাতদৃষ্টে বিনষ্ট বা দমিত মনে হলেও তার সূক্ষ্ম উপস্থিতি নিরন্তর কর্মে ব্যাপ্ত প্রজাসাধারণের অবচেতন মনে প্রচ্ছন্নভাবে রয়ে যায়। জিতেন্দ্রিয় পুরুষ দ্বারা দমিত কাম সম্পূর্ণ মৃত নয়; বরং তা সুগভীর অন্ধকারে চেপে রাখা অবস্থায় শরীরে অবস্থান করে। এই সুপ্ত বাসনা যেন পুনরায় জাগ্রত হয়ে আত্মপতনের কারণ না হতে পারে, সেজন্য সচেতন ব্যক্তি ও সমাজকে সতত শুভ ও নিষ্কাম কর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হয়। নিষ্ক্রিয়তা ও আলস্য দেখা দিলেই এই বৃত্র = তমোগুণী রিপু ['পাপ্মা বৈ বৃত্রঃ' শত০ ১১।১।৫।৭, 'বৃত্রো বৃণোতেঃ.... য়দবৃণোৎ তদ্ বৃত্রস্য বৃত্রত্বমিতি বিজ্ঞায়তে' নিরু০ ২।৭] পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে; তাই নিরবচ্ছিন্ন শুভ কর্মই হলো কামকে উপড়ে ফেলার প্রধান অস্ত্র। পরমেশ্বর জীবকে কর্মের মূর্ত প্রতীক হিসেবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, অলসতাই কামের জয় ঘটায়, কিন্তু নিরন্তর কর্মযোগের মাধ্যমেই পরম আত্মজয় সুনিশ্চিত হয়।
এই কর্মযোগ ও আত্মসংযমের পরবর্তী পরম ফল বর্ণিত হয়েছে ঋগ্বেদের ১.৩২.৪ মন্ত্রে।
যদিন্দ্রাহন্প্রথমজামহীনামান্মায়িনামমিনাঃ প্রোত মায়াঃ ।
আৎসূর্যং জনয়ন্দ্যামুষাসং তাদীত্না শত্রুং ন কিলা বিবিৎসে ॥
ঋগ্বেদ ১.৩২.৪
= হে জিতেন্দ্রিয় সাধক, যখন তুমি রিপুকুলের প্রারম্ভিক ও প্রধান শত্রু এই ‘কাম’ বা ‘অহি’-কে সম্পূর্ণ সংহার করো, তখনই জীবন থেকে মায়াবীদের যাবতীয় ছলনা, কুটিলতা ও প্রপঞ্চ বিদূরিত হয়। কামের পতনের সাথে সাথেই প্রজ্ঞাময় মস্তিষ্কে প্রাদুর্ভাব ঘটে দিব্য জ্ঞান-সূর্যের এবং হৃদয়াকাশে উদয় হয় এক পরম জ্যোতির্ময় ভাস্বর উষার। প্রাতে সূর্যোদয়ে যেমন জাগতিক সমস্ত অন্ধকার নিমেষেই বিলীন হয়ে যায়, ঠিক তেমনি হৃদয়ে এই প্রজ্ঞাসূর্যের উদ্ভাস ঘটার সাথে সাথে অন্তরের যাবতীয় অনর্থকারী অন্ধতম বাসনা ভস্মীভূত হয়ে যায়। রিপুকুলের প্রধান সেনাপতি কাম পরাজিত হলে অবশিষ্ট অভ্যন্তরীণ শত্রুসেনারাও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে, এবং সেই মুহূর্ত থেকে কোনো বিনাশকারী আসক্তি আর সাধককে স্পর্শ করতে পারে না।
বৃত্রবধের এই রূপক কাহিনি প্রমাণ করে যে তমোগুণী শক্তির অন্তে বিনাশ ও অধোগতিই স্বাভাবিক পরিণতি। বেদমন্ত্রের এই গূঢ় উপদেশ শ্রবণ করে মানুষ নিজের ভেতরের তমোগুণ ও অলসতাকে দূর করতে প্রবৃত্তি লাভ করে এবং অনাসক্ত কর্ম ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে লাভ করে পরম স্থিতপ্রজ্ঞ জীবন।
🔰রজোগুণ: ইন্দ্রের পরাক্রম ও তার সীমাবদ্ধতা
তমোগুণ দূর করে মানুষ অধোগতি থেকে রক্ষা পায় এবং রজোগুণ গ্রহণ করে। উদাহরণস্বরূপ- ঋগ্বেদের ১.৩২.১–২ মন্ত্রদ্বয়ে "ইন্দ্র" শব্দটির প্রয়োগ একই সাথে আধিভৌতিক অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক স্তর এবং আধ্যাত্মিক অর্থাৎ আত্মসংযমের গভীর বার্তা বহন করে। মানুষ যখন ঘোর তমোগুণ ত্যাগ করে নিষ্ক্রিয়তা ও অধোগতি থেকে রক্ষা পায়, তখন তার মধ্যে কর্মের প্রেরণা হিসেবে রজোগুণের বিকাশ ঘটে। এই প্রারম্ভিক স্তরে সাধক বা শাসক ইন্দ্রের তেজ ও পরাক্রমের প্রতি আকর্ষিত হন এবং রাজ্য চালনায় সেই গুণের প্রয়োগ ঘটান।
ইন্দ্রস্য নু বীর্যাণি প্র বোচং যানি চকার প্রথমানি বজ্রী ।
অহন্নহিমন্বপস্ততর্দ প্র বক্ষণা অভিনৎপর্বতানাম্ ॥
অহন্নহিং পর্বতে শিশ্রিয়াণং ত্বষ্টাস্মৈ বজ্রং স্বর্যং ততক্ষ ।
বাশ্রা ইব ধেনবঃ স্যন্দমানা অঞ্জঃ সমুদ্রমব জগ্মুরাপঃ ॥
ঋগ্বেদ ১.৩২.১–২
= আধিভৌতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই মন্ত্রে ইন্দ্র হলেন পরম তেজস্বী রাজা বা সেনাপতি। সূর্য ও বায়ু যেভাবে মেঘকে চূর্ণ করে বর্ষণ ঘটায়, রাজা ঠিক সেভাবেই শত্রুর সুদৃঢ় পর্বততুল্য দুর্গ ও ব্যূহ ভেদ করে নিজের বীরত্ব প্রমাণ করেন। প্রজাকল্যাণে তিনি নদী ও খাল খনন করে জলধারা প্রবাহিত করেন এবং কারিগরের নির্মিত শক্তিশালী বজ্রতুল্য শস্ত্র দিয়ে অবাধ্য শত্রুকে বিনাশ করেন। ফলে, দুগ্ধবতী গাভী যেমন সাগ্রহে বাছুরের দিকে ধাবিত হয়, প্রজাহৃদয়ও তেমনি প্রেম ও শ্রদ্ধায় ন্যায়পরায়ণ রাজার চরণে পরম অনুরাগে সমর্পিত হয়।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন এই বাহ্যিক পরাক্রম ও রাজ্যবৈভব দেখে ব্যক্তি কেবল রজোগুণের বশে মোহিত হয়ে পড়ে। বৈভব বৃদ্ধির সাথে সাথে জন্ম নেয় ভোগস্পৃহা, আর 'ভোগে রোগভয়ম্' ন্যায়—অতিরিক্ত ভোগের ফলে আসে মানসিক অধীরতা ও শারীরিক ব্যাধি। একদিকে রাজনৈতিক শত্রু এবং অন্যদিকে ভেতরের শারীরিক ও মানসিক উদ্বেগ তাকে ঘিরে ধরে। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় পদ ও বৈভব ক্ষণস্থায়ী; আজ যে ইন্দ্রপদে আসীন, কাল সে চ্যুত হতে পারে। এই জাগতিক অনিশ্চয়তা ও দুঃখবোধই মানুষকে উপলব্ধি করায় যে, রজোগুণজাত বাহ্যিক আধিপত্য স্থায়ী সমাধান নয়। এই অনাসক্তিই তাকে পরবর্তীতে উচ্চতর সত্ত্বগুণের দিকে ধাবিত করে।
যখন সাধক বেদমন্ত্রের মূল অর্থাৎ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অনুধাবন করেন, তখন বাহ্যিক রাজত্বের স্থানে অন্তরের আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে ইন্দ্র হলেন স্বয়ং জিতেন্দ্রিয় সাধক, আর তাঁর ঈশ্বরমুখী নিরবচ্ছিন্ন কর্মশীলতাই হলো আসল 'বজ্র'। প্রজ্ঞাকে আবৃত করে রাখা ‘অহি’ বা ‘বৃত্র’ কোনো বাহ্যিক শত্রু নয়, বরং এটি হলো মানুষের ভেতরের কাম-বাসনা ও অজ্ঞানতা। ঈশ্বরপ্রদত্ত সাধনারূপ বজ্র দিয়ে সাধক যখন এই প্রজ্ঞাবিনাশী বাসনাকে চূর্ণ করেন, তখন তাঁর দেহের ওজঃ ও শক্তি ঊর্ধ্বগামী হয়। সূর্যের তীব্র আবির্ভাবে মেঘ ভেদ করে আলোকরশ্মির প্রকাশের মতো বিষয়-বাসনার মেঘ কেটে গেলে মেরুপর্বত অর্থাৎ মেরুদণ্ডে অবস্থিত ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না নাড়ী উন্মুক্ত হয়ে ওঠে। যোগদর্শনে অবিদ্যাকে যে 'পঞ্চপর্ব' বলা হয়েছে, সেই অজ্ঞানতার রূপক পর্বত বিদীর্ণ করে সাধকের হৃদয়ে পরম প্রজ্ঞার জ্ঞানধারা প্রবাহিত হতে শুরু করে।
এই স্তরে এসে সাধক ও পরমেশ্বরের সম্পর্কটি বাৎসল্য-ভক্তিতে রূপ নেয়, যা মন্ত্রের শেষ অংশে গাভী ও বাছুরের ব্যাকুল মিলনের উপমায় ব্যক্ত হয়েছে। বাৎসল্য-ভক্তিতে সাধকের কাছে পরমেশ্বর অত্যন্ত আপন ও প্রিয় হয়ে ওঠেন। একজন জননী যেমন সন্তানের সুরক্ষায় সিংহের সামনে দাঁড়িয়েও পরম নির্ভীক হয়ে ওঠে, তেমনি এই অনুরাগে আপ্লুত হয়ে সাধকও জীবনের সমস্ত ভয়, আসক্তি ও সংশয় জয় করে পরম বীরত্ব ও অভয় লাভ করেন। এভাবে বেদ প্রকাশ করে কীভাবে বাহ্যিক রাজ্য পরিচালনা ও রজোগুণের কর্মোদ্যমকে আসক্তিমুক্ত করে অন্তর্মুখী সাধনায় রূপান্তর করতে হয় এবং জাগতিক দুঃখ অতিক্রম করে সত্ত্বগুণের পরম প্রজ্ঞায় উন্নীত হতে হয়।
🔰সত্ত্বগুণ: অমর আত্মার উপলব্ধি
রজোগুণ থেকে বিরক্ত হয়ে মানুষ যখন সত্ত্বগুণের দিকে অগ্রসর হয়, তখন তার সামনে এমন মন্ত্র আসে:
অকামো ধীরো অমৃতঃ স্বয়ম্ভূ রসেন তৃপ্তো ন কুতশ্চনোনঃ।
তমেব বিদ্বান্ন বিভায় মৃত্যোরাত্মানং ধীরমজরং যুবানম্ ॥
অথর্ববেদ ১০.৮.৪৪
= পরমেশ্বর কামনারহিত, পরম প্রজ্ঞাবান ও ধৈর্যবান, মৃত্যুনীতিমুক্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ—অর্থাৎ তিনি কারও ওপর আশ্রিত নন, স্বয়ং-সত্তাবান। তিনি নিজ পরমানন্দ রসে নিত্য তৃপ্ত এবং কোনো দিক থেকেই অসম্পূর্ণ বা ন্যূন নন। তিনি সদা নিরাকার আত্মস্বরূপে অবস্থান করেন, কোনো স্থূল কায় বা শরীর ধারণ করেন না। তিনি পাপীকে তৎক্ষণাৎ উগ্র শাস্তি না দিয়ে উপযুক্ত সংস্কারের মাধ্যমে সংশোধন করেন—এটাই তাঁর পরম ধৈর্যের পরিচয়। প্রজ্ঞাবান, অজরা তথা ক্ষয়হীন এবং সদা-যুবা বা নিত্য-প্রদীপ্ত সেই পরমাত্মাকে সম্যক্ সমঝদার বিদ্বান ব্যক্তি জ্ঞাত হয়ে কখনোই মৃত্যুকে ভয় করেন না। পরমাত্মজ্ঞানী পুরুষ সম্যক অবগত থাকেন যে, স্থূল শরীর ত্যাগের পর তিনি পরমেশ্বরের পরম আনন্দরস ভোগ করবেন; তাই তিনি সর্বপ্রকার মৃত্য ভয় মুক্ত হয়ে আমৃত্যু পরম শান্তিতে অবস্থান করেন।
এই মন্ত্র পাঠের পর তার মধ্যে অমর ও সর্বতোভাবে পরিপূর্ণ আত্মাসত্তার বোধ জাগে এবং সে যেন নশ্বর জগৎ থেকে অমর জগতে প্রবেশ করে। এর আগে শুদ্ধ আত্মা, অজা, জ্যেষ্ঠ ব্রহ্ম, স্থাণু ইত্যাদি দেবতার মন্ত্র পাঠ করে এবং এগুলোর অধ্যয়নে তার মধ্যে সত্ত্বগুণের প্রকাশ ঘটে। এরপর সে রজোগুণ ও তমোগুণের দোষ এবং সত্ত্বগুণের মহত্ত্ব অবগত হয়। তখন সে নিত্য সত্ত্বগুণে স্থির হয়ে বাস করে।
🔰গীতায় ত্রিগুণতত্ত্ব ও গুণাতীত অবস্থা
বেদে এভাবেই সত্ত্ব, রজ ও তমোগুণের বর্ণনা রয়েছে। এই বেদমন্ত্র পাঠের মাধ্যমে মানুষ তমোগুণ থেকে ক্রমশ উপরে উঠে সত্ত্বগুণে এসে স্থির হয়। এ কারণেই গীতায় বলা হয়েছে:
ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুণ্যো ভবার্জুন।
নির্দ্বন্দ্বো নিত্যসত্ত্বস্থো নির্যোগক্ষেম আত্মবান্॥
গীতা ২.৪৫
= তিন গুণের বিষয় বেদে রয়েছে; তা দেখে তুমি নিস্ত্রৈগুণ্য হও; নির্দ্বন্দ্বো, নিত্যসত্ত্বস, নির্যোগক্ষেম, আত্মবান হও।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্যণীয়। তিন গুণের বর্ণনা বেদে আছে বলেই অনেকের ভুল ধারণা হয় যে, 'নিস্ত্রৈগুণ্য' বলতে বেদমার্গ ত্যাগ করার উপদেশ দেওয়া হচ্ছে! কিন্তু গীতার তাৎপর্য কখনোই এমন নয়। গীতার আশয় হলো—বেদের তিন গুণকে চিনে মানুষ প্রথমে তমোগুণ ত্যাগ করে, তারপর রজোগুণ ত্যাগ করে এবং শেষে কেবল সত্ত্বগুণে স্থির থাকে।
🔰গুণাতীত হওয়ার প্রকৃত অর্থ
'ত্রিগুণাতীত' হওয়ার অর্থ সত্ত্ব, রজ ও তম—এই তিন গুণই ত্যাগ করা নয়; কেবল সত্ত্বগুণের আশ্রয়ে অবস্থান করাই হলো ‘গুণাতীত’ হওয়া। যতক্ষণ তম ও রজোগুণ থাকে, ততক্ষণ সত্ত্বগুণও এদের দ্বারা দূষিত হয়; রজ ও তম সামান্য থাকলেও ভেতরের সত্ত্বগুণ যথাযথভাবে প্রকাশিত হতে পারে না। যেমন শুদ্ধ দর্পণে সামান্য ময়লা লাগলেও তার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়; একইভাবে শুদ্ধ সত্ত্বগুণের সাথে সামান্য রজ বা তম থাকলে সত্ত্বগুণের যথাযথ প্রকাশ হয় না। তম ও রজ সম্পূর্ণ দূর হলে সত্ত্বগুণই নিজের পূর্ণতায় প্রকাশিত হয়। মানুষের এটিই উচ্চ অবস্থা, আর এটিকেই গুণাতীত অবস্থা বলে।
'ঊর্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থাঃ' [গীতা ১৪.১৮] = সত্ত্বগুণী লোক উচ্চ গতি লাভ করে, এ কথা গীতায় বলা হয়েছে।
🔰গুণাতীত ব্যক্তির লক্ষণ
গীতায় গুণাতীত হওয়ার বর্ণনা এভাবে এসেছে:
অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন: 'এই গুণগুলো থেকে উপরে থাকা ব্যক্তির লক্ষণ কী? তার আচার কেমন? এবং সে কীভাবে তিন গুণ থেকে উপরে ওঠে?' [গীতা ১৪.২১]
শ্রীভগবান উত্তর দিলেন:
'হে অর্জুন! প্রকাশ, প্রবৃত্তি ও মোহ উপস্থিত হলেও যে দুঃখ বোধ করে না, আর অনুপস্থিত হলেও তাদের কামনা করে না; উদাসীনের মতো স্থির থাকে, যাকে গুণ বিচলিত করতে পারে না, যে মনে করে গুণই নিজের কাজ করছে; যে সুখ-দুঃখে সমান থাকে, স্থির থাকে, মাটির ঢেলা, পাথর ও সোনাকে সমান মনে করে, প্রিয় ও অপ্রিয় বস্তুর প্রতি সমভাব রাখে, নিজের নিন্দা ও স্তুতিতে সমান থাকে, মান-অপমানে একরকম থাকে, মিত্র ও শত্রুপক্ষের প্রতি সমভাব রাখে এবং যে সব কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ করেছে—সে গুণাতীত নামে পরিচিত।' [গীতা ১৪.২২–২৫]
এটিকেই এখানে 'নিস্ত্রৈগুণ্য' বলা হয়েছে; অর্থাৎ তিন গুণ থেকে উপরে থাকা। শুদ্ধ সত্ত্বগুণে স্থির থাকলেই এই অবস্থা লাভ সম্ভব। এ কারণেই বলা হয়েছে—'নিত্য-সত্ত্ব-স্থঃ' (নিত্য সত্ত্বগুণে স্থির থাকো)। সুতরাং যদি ‘বেদ = ত্রিগুণাত্মক মাত্র’ ও ‘নিস্ত্রৈগুণ্য = ত্রিগুণ ত্যাগ অর্থাৎ বেদত্যাগ’ হতো তবে ‘নিত্য-সত্ত্ব-স্থঃ’ কেন বলা হবে ? কারণ সত্ত্বগুণ নিজেও তো ৩ গুণের অন্তর্ভুক্ত। যদি বেদত্যাগের মাধ্যমে ত্রিগুণ = তম-রজ-সত্ত্ব সবই ত্যাগ করতে বলা হতো তবে আবার সত্ত্বগুণে নিত্য স্থিতির কথা বলার কী দরকার ছিল ? সুতরাং যেভাবে বেদের বিরুদ্ধে গিয়ে এই ব্যাখ্যা করা হয় তা সম্পূর্ণ কপোলকল্পিত ও বেদবিরোধী সাম্প্রদায়িকদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
🔰শব্দতত্ত্ব: নিস্ত্রৈগুণ্য, গুণাতীত ও নিত্যসত্ত্বস্থ
এই তিনটি শব্দের অর্থ একে অপরের আলোকেই ব্যাখ্যা করতে হবে-
- ১. নিস্ত্রৈগুণ্যঃ = তিন গুণ থেকে উপরে;
- ২. গুণাতীতঃ = গুণকে অতিক্রম করে;
- ৩. নিত্য-সত্ত্ব-স্থঃ = নিত্য সত্ত্বগুণে স্থির।
'নিস্ত্রৈগুণ্য' ও 'নিত্যসত্ত্বস্থ'- এই দুটি শব্দ পাশাপাশি থাকায় স্পষ্ট যে, সত্ত্বগুণ ত্যাগ করা এখানে উদ্দেশ্য নয়। সত্ত্বগুণ ত্যাগ করলে কিছুই থাকে না, আর উচ্চ অবস্থা তো সত্ত্বগুণেই সম্ভব; অতএব সত্ত্বগুণ ত্যাগ কখনোই উপযুক্ত নয়।
🔰নির্দ্বন্দ্ব ও নির্যোগক্ষেম
'নির্দ্বন্দ্ব' অর্থাৎ 'সুখ-দুঃখাদি দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত' হওয়া সত্ত্বগুণী হওয়ার পরেই সম্ভব। গুণাতীতের লক্ষণে বলা হয়েছে—
সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্টাশ্মকাঞ্চনঃ।
তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ো ধীরস্তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ॥
মানাপমানয়োস্তুল্যস্তুল্যো মিত্রারিপক্ষয়োঃ।
সর্বারম্ভপরিত্যাগী গুণাতীতঃ স উচ্যতে॥
[গীতা ১৪.২৪–২৫]
= সুখ, দুঃখ, মাটি, সোনা, প্রিয়, অপ্রিয়, নিন্দা, স্তুতি, মান, অপমান, মিত্র, শত্রু—এই সব দ্বন্দ্ব যার কাছে সমান, সে গুণাতীত; তাকেই এখানে 'নির্দ্বন্দ্ব' বলা হয়েছে।
'নির্যোগক্ষেম' অর্থাৎ যোগক্ষেমের জঞ্জাল নিজের পিছনে না রাখা মানুষই এখানে বর্ণিত। কোনো বস্তুর প্রাপ্তির নাম 'যোগ' এবং তার রক্ষার নাম 'ক্ষেম'। সংসারে সব মানুষ এই যোগ-ক্ষেম দায়িত্ব হিসেবে না নিয়ে আসক্তি হিসেবে নিয়ে মোহে আটকে থাকে। জাগতিক অপ্রাপ্ত বস্তু লাভ করা ও প্রাপ্ত বস্তু রক্ষা করার কাজে সবাই রাত-দিন ব্যস্ত থাকে। এই জড়জাগতিক প্রাপ্তি ও রক্ষার কাজে আসক্তি ও মোগের কারণে মানুষ সর্বদা সুখ-দুঃখ ও লাভ-ক্ষতিতে আটকে থাকে। যদি ভগবদ্-বুদ্ধিতে এই প্রাপ্তি ও রক্ষার আসক্তি মানুষ থেকে দূর হয়, তবে সে দ্বন্দ্বাতীত হতে পারে।
🔰আত্মবান্: আত্মিক বলের অধিকারী
শ্লোকের শেষে 'আত্মবান্' হওয়ার কথা বলা হয়েছে। 'আত্মবান্'-এর অর্থ বিশেষ প্রভাবশালী আত্মবলযুক্ত। প্রতিটি প্রাণীই আত্মাবিশিষ্ট; আত্মা না থাকলে কোনো প্রাণী জীবিত থাকতে পারে না। তাই সাধারণ অর্থে সব প্রাণীই আত্মবান্। কিন্তু এখানে তাৎপর্য ভিন্ন। যার মধ্যে আত্মার বল বিশেষভাবে প্রকাশিত, তাকেই আত্মবান্ বলে।
কীভাবে আত্মবান্ হওয়া যায়? গীতা ২.৪৫ শ্লোকটি সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখলে আত্মবান্ হওয়ার উপায় জানা যায়: 'যে মানুষ বেদে তিন গুণের বর্ণনা পাঠ করে, পাঠের পর তম ও রজ গুণ ত্যাগ করে গুণাতীত হয়ে, অর্থাৎ সর্বদা সত্ত্বগুণে স্থির থাকে, সুখ-দুঃখাদি দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত থাকে, বস্তুপ্রাপ্তি ও বস্তু রক্ষার জঞ্জালে আটকে থাকে না, সে প্রশস্ত আত্মিক বলে যুক্ত হয়।'
যে মানুষ চায় তার মধ্যে আত্মিক বল বিশেষভাবে প্রকাশিত হোক, সে এই নিয়মগুলো নিজের জীবনে পালনের চেষ্টা করুক।
🔰বেদের মাহাত্ম্য ও ভুল বোঝাবুঝি দূরীকরণ
আত্মবান মানুষের জন্য 'বিজানতঃ ব্রাহ্মণঃ' [২.৪৬] (বিজ্ঞানী ব্রাহ্মণ) শব্দ এসেছে। ব্রহ্মকে জানা ব্যক্তিই বিশেষ জ্ঞানী পুরুষ এবং ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত হন; তাকেই আত্মবান্ও বলে। কিছু লোক এই শ্লোকের অর্থ ঠিকভাবে বোঝেন না এবং মনে করেন এখানেও বেদের হীনতা দেখানো হয়েছে এবং ব্রহ্মপ্রাপ্তি বেদ দ্বারা হয় না—এমন অনুমান করেন!
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শ্লোকের অর্থ হলো, 'যে লাভ সম্পূর্ণ বেদ পাঠের মাধ্যমে মেলে, তা ব্রহ্মজ্ঞানীর কাছে স্বয়ংসিদ্ধ।' এতে বেদের নিন্দা নেই। ব্রহ্মজ্ঞানী হওয়ার সাধনই হলো বেদাধ্যয়ন। বেদের পূর্ণ জ্ঞান লাভের পর যখন সেই জ্ঞান অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়, তখন সেই মানুষ ব্রহ্মজ্ঞানী, ব্রাহ্মণ, জ্ঞানী, বিজ্ঞানবিৎ, আত্মবান্ ইত্যাদি নামে পরিচিত হন।
অন্তিম সিদ্ধি লাভের পর আগে করা অধ্যয়ন গৌণ হয়ে যায়। যেমন কেউ বলতে পারে—'এম.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মানুষের কাছে সেই জ্ঞান সহজলভ্য, যা প্রাথমিক শ্রেণীতে বর্ণমালার শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শেখান।' এতে পূর্বের অধ্যয়নক্রমের নিন্দা হয় না; বরং সেই অধ্যয়নক্রমের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে মানুষ ‘শাস্ত্রী’ তৈরি হয়; অর্থাৎ এই অধ্যয়নক্রম মানুষকে শাস্ত্রীর যোগ্যতা দান করে—এটি তার প্রশংসাই।
একইভাবে সম্পূর্ণ বেদের যথাযথ অধ্যয়নের মাধ্যমে মানুষ ব্রহ্মজ্ঞানী হয়; এবং যখন তার ব্রহ্মজ্ঞান হয়, তখন তার বেদজ্ঞান অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত থাকে। এই কথন তো বেদের অত্যন্ত প্রশংসাই। আশ্চর্যের বিষয় যে, যে শ্লোক বেদপ্রশংসায় লেখা, তাকেই কীভাবে কেউ বেদনিন্দা হিসেবে মনে করে!
সব থেকে বড় বিষয় হলো, বেদ নিজেই কী বলছে ? দেখুন-
ঋচো অক্ষরে পরমে ব্যোমন্যস্মিন্দেবা অধি বিশ্বে নিষেদুঃ।
যস্তন্ন বেদ কিমৃচা করিষ্যতি য ইত্তদ্বিদুস্ত ইমে সমাসতে ॥
ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৩৯
= যিনি অবিচল ও অবিনাশী, যিনি সর্বোচ্চ আকাশবৎ সর্বব্যাপী পরমাত্মা—যাঁতে ঋগ্বেদাদি চতুর্বেদের পরম সত্য প্রতিষ্ঠিত এবং যাঁর আশ্রয়ে পৃথিবী ও সূর্যলোকসহ সমস্ত দেব ও লোকসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে; যে ব্যক্তি সেই পরমেশ্বরকে জানে না, চার বেদ অধ্যয়ন করে তার কী লাভ হবে? কিন্তু যাঁরা সেই পরমব্রহ্মকে সম্যক্ অবগত হন, তাঁরাই কেবল সেই পরমাত্মার আমোদ ও আনন্দের মধ্যে সুদৃঢ়ভাবে স্থিত থাকেন।
একইভাবে কঠোপনিষদে বলা হয়েছে-
সর্বে বেদা য়ৎ পদমামনন্তি তপাংসি সর্বাণি চ য়দ্ বদন্তি।
য়দিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্য়ং চরন্তি তৎ তে পদং সংগ্রহেণ ব্রবীম্যোমিত্যেতৎ॥
কঠোপনিষদ ১.২.১৫
= ঋগাদি চতুর্বেদ যে পরমপদের প্রতিপাদন করে এবং সকল তপস্যা যাঁর বর্ণনা করে, যাঁকে পাবার ইচ্ছায় সাধকগণ ব্রহ্মচর্যের ব্রত পালন করেন, সেই পদ তোমাকে সংক্ষেপে বলছি— এই ‘ও৩ম্’ সেই পদ ।
এভাবে উপনিষদগুলোতে বেদের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। ‘বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো বেদান্তকৃদ্বেদবিদেব চাহম্’ ভগবদ্গীতায়ও [৫.১৫] এটিই বলা হয়েছে; অতএব এতে বেদের নিন্দা নেই।
যেখানে বেদকে গৌণ করা হয়েছে বলে আপাতদৃষ্টিতে বোধহয়, তা 'শব্দজ্ঞান ও অনুভবজ্ঞান'-এর ভেদ প্রকাশ করে; অনুভবজ্ঞানের তুলনায় শব্দজ্ঞানকে গৌণ বলা হয়েছে, আর তা যুক্তিসঙ্গত। কে বলবে যে অনুভবজ্ঞান থেকে কেবল শাব্দিক জ্ঞান অধিক শ্রেষ্ঠ?
বেদ ও গীতায় ত্রিগুণতত্ত্বের যে বর্ণনা রয়েছে, তা মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রদান করে। তমোগুণ থেকে শুরু করে রজোগুণ অতিক্রম করে সত্ত্বগুণে স্থির হওয়া এবং শেষে গুণাতীত অবস্থা লাভ করা—এই হলো আধ্যাত্মিক সাধনার ক্রমবিকাশ। এই পথে বেদপাঠ, মন্ত্রসাধনা, গুণতত্ত্বের বোধ এবং নিত্য সত্ত্বগুণে স্থির থাকা—এই সব উপাদান মানুষকে আত্মবান বা আত্মিক বলের অধিকারী করে তোলে।
পাঠক ভগবদ্গীতার বাক্যগুলো এই পদ্ধতিতে বুঝলে তাদের কাছে সব কথা স্পষ্ট হয়ে যাবে। এভাবেই এই শ্লোকগুলোতে সাধারণ মানুষের পরম উন্নতির উপায় অতি সংক্ষেপে বলা হয়েছে। বেদ ও গীতার এই বাণী আজও সমান প্রাসঙ্গিক এবং মানুষকে তম থেকে সত্ত্বে, অজ্ঞানতা থেকে জ্ঞানে, এবং মৃত্যুভয় থেকে অমরত্বের পথে পরিচালিত করে।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

0 মন্তব্য(গুলি)