দান মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কর্তব্য । বেদে যেমন সৎভাবে অর্থোপার্জন , সম্পদের সংরক্ষণ এবং সেই সম্পদ যথার্থ ক্ষেত্রে দানের নির্দেশ পাওয়া যায় , তেমনি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতেও দানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্ম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে । তবে গীতা কেবল কত বেশি দান করা হলো তার বিচার করেনি , বরং কোন উদ্দেশ্যে , কাকে , কখন , কোথায় এবং কী মানসিকতায় দান করা হচ্ছে তার ভিত্তিতে দানের প্রকৃতি নির্ণয় করেছে । এই কারণেই গীতায় দানকে সাত্ত্বিক , রাজসিক ও তামসিক এই তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে ।
অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ।
দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- ১৬.১
গীতায় দানের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৬.১এই শ্লোকে দানকে দৈবী সম্পদের একটি গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ।
আহারস্ত্বপি সর্বস্য ত্রিবিধো ভবতি প্রিয়ঃ।
যজ্ঞস্তপস্তথা দানং তেষাং ভেদমিমং শৃণু॥ ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৭.৭
অনুবাদ: সকল প্রাণীর প্রিয় আহারও তিন প্রকারের হয়ে থাকে ।তেমনই যজ্ঞ , তপস্যা এবং দানও তিন প্রকারের । তাদের
এই পার্থক্য শ্রবণ করো ।
গীতায় দানকে সাত্ত্বিক , রাজসিক ও তামসিক এই তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে ।
দাতব্যমিতি যদ্দানং দীযতেঽনুপকারিণে।
দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্॥
যত্ত প্রত্যুপকারার্থং ফলমুদ্দিশ্য বা পুনঃ।
দীয়তে চ পরিক্লিষ্টং তদ্দানং রাজসং স্মৃতম্॥ ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- ১৭.২০-২১
অনুবাদ: 'দান করা কর্তব্য'-এই মনোভাব নিয়ে উপকারের বিনিময়ে উপকার আশা না করে উপযুক্ত স্থানে ও উপযুক্ত সময়ে এবং যোগ্য ব্যক্তিকে যে দান দেওয়া হয়, সেই দানকে সাত্ত্বিক বলা হয় । কিন্তু যে দান প্রতিদানের আশায় বা ফলের উদ্দেশ্য করে এবং অনিচ্ছাসত্ত্বে দেওয়া হয়, সেই দানকে রাজস বলা হয় ।
অদেশকালে যদ্দানমপাত্রেভ্যশ্চ দীয়তে।
অসৎকৃতমবজ্ঞাতং তত্তামসমুদাহৃতম্॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- ১৭.২২
অনুবাদ: অশুচি স্থানে ও অনুপযুক্ত সময়ে, অযোগ্য ব্যক্তিকে , অশ্রদ্ধা ও অবজ্ঞার সাথে যে দান দেওয়া হয় , সেই দানকে তামস বলা হয় ।
গীতায় দানের মূল্য শুধু কতটা দান করা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না , কী উদ্দেশ্যে, কাকে, কখন, কোথায় এবং কী মনোভাব নিয়ে দান করা হচ্ছে তার ওপরও দানের প্রকৃতি নির্ভর করে। তাই শ্রীভগবান দানকে সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিকএই তিন ভাগে ব্যাখ্যা করেছেন ।
১। সাত্ত্বিক দান : হলো কর্তব্যবোধ থেকে, কোনো প্রত্যুপকার বা ব্যক্তিগত ফলের আকাঙ্ক্ষা না রেখে, উপযুক্ত দেশ, কাল ও পাত্র বিবেচনা করে দান করা । এখানে দানের পরিমাণের চেয়ে দাতার উদ্দেশ্য ও মানসিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দান করে বিনিময়ে প্রশংসা, সম্মান, প্রতিদান কিংবা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা না থাকাই সাত্ত্বিক দানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বৈদিক ভাবনাতেও উপার্জনের পাশাপাশি সম্পদকে বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহারের শিক্ষা রয়েছে ❝শতহস্তং সমাহর, সহস্রহস্তং সং কির❞ অথর্ববেদ ৩.২৪.৫ অর্থাৎ শত হাতে সংগ্রহ করো এবং সহস্র হাতে বিতরণ করো । আবার ❝দাতা রাধাংসি শুম্ভতি।❞ ঋগ্বেদ ১.১৭.৪-এ দাতার সঙ্গে কল্যাণের ভাবনা যুক্ত হয়েছে । ❝যো মে পৃণাদ্ যো দদদ্ যো নিবোধাৎ।❞ ঋগ্বেদ ২.৩০.৭-এ দান ও কল্যাণের সঙ্গে প্রকৃত মিত্রতার ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে । ❝দক্ষিণাং বর্ম কৃণুতে বিজানন্।❞ ঋগ্বেদ ১০.১০৭.৭ এবং ❝দক্ষিণাবন্তো অমৃতং ভজন্তে।❞ ঋগ্বেদ ১.১২৫.৬-এ দান ও দক্ষিণার গুরুত্ব প্রকাশিত হয়েছে । ❝রায়ে চ নঃ স্বপত্যায় দেব দিতিং চ রাস্বাদিতিমুরুষ্য ।❞ ঋগ্বেদ ৪.২.১১-এ দানের প্রবৃত্তির জন্য প্রার্থনার ভাবও পাওয়া যায় । অর্থাৎ সাত্ত্বিক দান কেবল নিজের সম্পদ কমিয়ে দেওয়া নয়; বরং অর্জিত সম্পদকে যথার্থ পাত্রে, যথার্থ উদ্দেশ্যে এবং বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহার করার একটি নৈতিক কর্তব্য ।
২। রাজসিক দান : হলো প্রত্যুপকার, কোনো নির্দিষ্ট ফল বা ব্যক্তিগত লাভের প্রত্যাশায় করা দান, অথবা অনিচ্ছা ও কষ্টসহকারে দান করা । দানের বাহ্যিক রূপ থাকলেও যদি তার পেছনে স্বার্থ, প্রতিদান, খ্যাতি বা ফললাভের আকাঙ্ক্ষাই প্রধান হয়ে ওঠে, গীতা তাকে রাজসিক বলে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ কেউ যদি মনে করে - ‘আমি দান করছি, তাই আমাকেও এর বিনিময়ে কিছু পেতে হবে’, অথবা দান করে সম্মান , পরিচিতি কিংবা কোনো বিশেষ সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা রাখে , তাহলে দানের বাহ্যিক মহত্ত্ব থাকলেও তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সাত্ত্বিক থাকে না । বৈদিক সাহিত্যে ধন-সম্পদের অস্থায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে । ❝অন্যমন্যমুপ তিষ্ঠন্ত রায়ঃ।❞ ঋগ্বেদ ১০.১১৭.৫ অর্থাৎ ধন-সম্পদ এক ব্যক্তির কাছে চিরকাল স্থির থাকে না । আবার ❝উতো রয়িঃ পৃণতো নোপ দস্যতি।❞ ঋগ্বেদ ১০.১১৭.১-এ দানশীলতার সঙ্গে সম্পদের সম্পর্কের কথা এসেছে । ❝মা গৃধঃ কস্যস্বিদ্ধনম্।❞ যজুর্বেদ ৪০.১-এ অন্যের ধনের প্রতি লোভ না করার নির্দেশ রয়েছে । ফলে ধনকে কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ , প্রতিপত্তি বা ভোগের উপকরণ হিসেবে না দেখে তার সঠিক ব্যবহার ও কল্যাণকর বণ্টনের দিকে দৃষ্টি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ । দানের উদ্দেশ্য যদি আত্মপ্রচার বা প্রত্যাশিত লাভে পরিণত হয় , তবে দানের মূল নিঃস্বার্থ ভাবটি ক্ষীণ হয়ে যায় ।
৩। তামসিক দান : হলো অনুপযুক্ত স্থান ও সময়ে , অযোগ্য পাত্রকে, যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা ছাড়া কিংবা অবজ্ঞার সঙ্গে দান করা। এখানে শুধু দান করার ইচ্ছা থাকলেই যথেষ্ট নয়; দানটি সঠিক ব্যক্তি, সঠিক পরিস্থিতি এবং সঠিক মনোভাবের সঙ্গে হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচ্য । কারণ ভুল পাত্রে বা ভুল উদ্দেশ্যে করা দান কখনো কখনো উপকারের পরিবর্তে অনর্থের কারণও হতে পারে । বেদে দান যেন অনর্থ বা পাপকর্মের কারণ না হয় , সেই সতর্কতাও দেখা যায় ❝রদাবসো ন পাপত্বায় রাসীয়।❞ অথর্ববেদ ২০.৮২.১ অর্থাৎ দান যেন পাপকর্মের বৃদ্ধির কারণ না হয় । ❝ন স্রেধন্তং রয়ির্নশৎ ।❞ সামবেদ ৮৬৮-এর মাধ্যমে সম্পদ ও তার যথাযথ ব্যবহারের বিষয়টি স্মরণ করা যায় । ❝উতাধীতং বি নশ্যতি ।❞ঋগ্বেদ ১.১৭০.১-এ অর্জিত সম্পদেরও নশ্বরতার কথা প্রকাশিত হয়েছে । ❝অধ স্বপ্নস্য নির্বিদেঽভুঞ্জতশ্চ রেবতঃ... নশ্যতঃ।❞ ঋগ্বেদ ১.১২০.১২-এ অকর্মণ্য ও ভোগমাত্রে আসক্ত ব্যক্তির সম্পদের নষ্ট হওয়ার ভাবনা পাওয়া যায় । ❝সর্বৈঃ সংস্রাবৈর্ধনং সং স্রাবয়ামসি ।❞ অথর্ববেদ ১.১৫.৩ এবং ❝সং গৃভায় পুরূ শতোভয়াহস্ত্যা বসু।❞ অথর্ববেদ ২০.৫৬.৪-এর মতো মন্ত্রগুলোও সম্পদ অর্জন ও ব্যবহারের বৃহত্তর বৈদিক ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। তাই তামসিক দানের ক্ষেত্রে শুধু ‘দান করেছি’ এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়; দানের পাত্র, সময়, স্থান, পদ্ধতি এবং দাতার শ্রদ্ধাবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ ।
গীতার দৃষ্টিতে দানের প্রকৃত মূল্য শুধু কতটা দান করা হলো তার মধ্যে নয় ; কেন দিচ্ছি , কাকে দিচ্ছি , কখন ও কোথায় দিচ্ছি এবং কী মানসিকতা নিয়ে দিচ্ছি তার ওপরও নির্ভর করে । কর্তব্যবোধে , উপযুক্ত পাত্রে এবং প্রত্যুপকারের আশা ছাড়া করা দান সাত্ত্বিক; ফল , প্রতিদান বা ব্যক্তিগত স্বার্থের আকাঙ্ক্ষায় করা দান রাজসিক; আর অনুপযুক্ত সময়ে , অযোগ্য পাত্রকে, অশ্রদ্ধা বা অবজ্ঞার সঙ্গে করা দান তামসিক। তাই দান করলেই দান পবিত্র হয় না দানের পবিত্রতা নির্ধারিত হয় দাতার উদ্দেশ্য , দানের পাত্র , দেশ-কাল এবং দাতার মানসিকতার দ্বারা ।
গীতায় যখন অযোগ্য পাত্রে দানের বিষয়টি তামসিক দান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে , তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে , সুপাত্র কে এবং কুপাত্র কে ? কাকে দান করা উচিত এবং কাকে দান করা উচিত নয় ? মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর ❝সত্যার্থ প্রকাশ❞ গ্রন্থে এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ।
প্রশ্ন : আপনার কথামতো তো মনে হচ্ছে , কাউকে গরু দান করা বা কোনো ধরনের দান করে পুণ্য অর্জন করাই উচিত নয় ।
উত্তর : তোমার এই কথা সম্পূর্ণ ভুল । কারণ , সুপাত্র ও পরোপকারী ব্যক্তিকে মানুষের কল্যাণের জন্য স্বর্ণ , রৌপ্য , হীরা , মুক্তা-মাণিক্য , অন্ন , জল , বাসস্থান , বস্ত্র ইত্যাদি অবশ্যই দান করা উচিত । কিন্তু কুপাত্রকে কখনো দান করা উচিত নয় ।
প্রশ্ন : কুপাত্র ও সুপাত্রের লক্ষণ কী ?
উত্তর : যারা ছলনা , কপটতা ও স্বার্থপরতায় ভরা , বিষয়াসক্ত , কাম , ক্রোধ , লোভ ও মোহে আক্রান্ত , অন্যের ক্ষতি করে , লম্পট , মিথ্যাবাদী , বিদ্যাহীন , কুসঙ্গী ও অলস , তারা কুপাত্র ।
যারা দাতার কাছে বারবার দান চায় এবং দানের জন্য চাপ দিতে থাকে , দাতা দান না করলেও জেদ করে চাইতেই থাকে , দান পেয়েও সন্তুষ্ট হয় না , যে দান করে না তার নিন্দা করে , তাকে অভিশাপ দেয় বা গালি দেয় , তারাও কুপাত্র ।
যে ব্যক্তি কেউ বহুবার তার সেবা করার পর আর সেবা না করলে তার শত্রু হয়ে যায় , বাইরে সাধুর বেশ ধারণ করে মানুষকে বিভ্রান্ত ও প্রতারণা করে , নিজের কাছে অর্থ থাকা সত্ত্বেও ❝আমার কাছে কিছুই নেই❞ বলে , সবাইকে ফুসলিয়ে নিজের স্বার্থ পূরণ করে এবং দিনরাত ভিক্ষা করে বেড়ায় , তারাও কুপাত্র ।
নিমন্ত্রণ পেয়ে ভাঙ , সিদ্ধি ইত্যাদি মাদকদ্রব্য অতিরিক্ত পরিমাণে সেবন করে এবং অন্যের অর্থে অতিরিক্ত ভোজন করে , উন্মত্ত ও অসতর্ক থাকে , সত্যের পথের বিরোধিতা করে এবং নিজের স্বার্থ পূরণের জন্য অসত্যের পথ অনুসরণ করে , তারাও কুপাত্র ।
যে ব্যক্তি তার শিষ্যদের শুধু নিজের সেবা করতে বলে এবং অন্য কোনো যোগ্য ব্যক্তির সেবা করতে নিষেধ করে , সৎ ও বিদ্যামূলক কাজের বিরোধিতা করে , স্ত্রী-পুরুষ , পিতা-মাতা , সন্তান , রাজা-প্রজা এবং আত্মীয়-বন্ধুদের মধ্যে অশান্তি ও বিরোধ সৃষ্টি করে এবং ❝সবকিছুই মিথ্যা , এই জগতও মিথ্যা❞ এরূপ ভুল ও ক্ষতিকর উপদেশ দেয় , সেও কুপাত্রের অন্তর্ভুক্ত ।
অন্যদিকে , যাঁরা ব্রহ্মচারী ও ইন্দ্রিয়সংযমী , যাঁরা বেদসহ বিভিন্ন বিদ্যা অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করেন , যাঁরা সুশীল , সত্যবাদী , পরোপকারী , কর্মঠ , উদার এবং বিদ্যা ও ধর্মে ক্রমাগত উন্নতি করতে থাকেন , যাঁরা ধর্মপরায়ণ , শান্ত এবং নিন্দা ও প্রশংসায় অতিরিক্ত আনন্দ বা দুঃখ পান না , যাঁরা নির্ভয় , উৎসাহী , যোগী ও জ্ঞানী , তাঁরা সুপাত্র ।
যাঁরা সৃষ্টির নিয়ম , বেদের নির্দেশ এবং নিজের গুণ , কর্ম ও স্বভাব অনুযায়ী আচরণ করেন , যাঁরা ন্যায়পরায়ণ ও পক্ষপাতহীন , যাঁরা সত্যের উপদেশ দেন , যাঁরা সত্যশাস্ত্র অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করেন এবং সেই কাজের যোগ্য ব্যক্তিদের পরীক্ষা করেন , যাঁরা বিভিন্ন প্রশ্নের যথাযথ উত্তর ও সমাধান দিতে পারেন , তাঁরাও সুপাত্র ।
যাঁরা নিজের মতো করে অন্যের সুখ-দুঃখ এবং লাভ-ক্ষতি অনুভব করেন , যাঁদের মধ্যে অবিদ্যা , মানসিক দুর্বলতা , জেদ , অযৌক্তিক জেদ বা অহংকার নেই , যাঁরা নিজেকে অমৃতের মতো মূল্যবান এবং সম্মানকে বিষের মতো তুচ্ছ মনে করেন এবং যাঁরা সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত , তাঁরা সুপাত্র ।
অর্থাৎ , যে ব্যক্তি সৎ , সংযমী , বিদ্বান , সত্যবাদী , পরোপকারী , ন্যায়নিষ্ঠ ও ধর্মপরায়ণ এবং যার দ্বারা সমাজ ও মানুষের প্রকৃত কল্যাণ হয় , তাকেই দানের উপযুক্ত বা ❝সুপাত্র❞ বলা হয় । আর যে ব্যক্তি দানকে নিজের স্বার্থ , ভোগ , প্রতারণা বা অন্যের ক্ষতির জন্য ব্যবহার করে , সে ❝কুপাত্র❞ ।
অতপাস্তুনধীযানঃ প্রতিগ্রহরুচিদ্বিজঃ ।
অন্তস্যশ্মপ্লবেনৈব সহ তেনৈব মজ্জতি ॥ ১ ॥
প্রথমত , ❝অতপাঃ❞ অর্থাৎ ব্রহ্মচর্য , সত্যভাষণ ইত্যাদি তপস্যাবিহীন ব্যক্তি । দ্বিতীয়ত , ❝নধীযানঃ❞ অর্থাৎ অধ্যয়নহীন ব্যক্তি । তৃতীয়ত , ❝প্রতিগ্রহরুচি❞ অর্থাৎ ধর্মের জন্য অন্যের কাছ থেকে অতিরিক্ত দান গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তি । এই তিনজন পাথরের তৈরি নৌকায় সমুদ্র পার হতে যাওয়া ব্যক্তির মতো নিজের দুষ্কর্মের সঙ্গে দুঃখের সাগরে ডুবে যায় । সে নিজে তো ডুবেই থাকে , সেই সঙ্গে দাতাকেও ডুবিয়ে দেয় । ॥ ১ ॥
ত্রিস্বপ্যেতেষু দত্তং হি বিধিনাপ্যর্জিতং ধনম্ ।
দাতুর্ভবত্যনর্থায পরত্রাদাতুরেব চ ॥ ২ ॥
উপরোক্ত তিনজনকে ধর্মসম্মতভাবে উপার্জন করা ধন দান করলে , সেই দান দাতার ইহজীবনে এবং গ্রহীতার পরজীবনে অনর্থের কারণ হয় । ॥ ২ ॥
যথা প্লবেনৌপলেন নিমজ্জত্যুদকে তরন্ ।
তথা নিমজ্জতোऽধস্তাদজ্ঞৌ দাতৃপ্রতীচ্ছকৌ ॥ ৩ ॥
যেমন পাথরের নৌকায় বসে জলের ওপর দিয়ে পার হতে গেলে সেই নৌকাসহ নিজেই ডুবে যায় , তেমনি অজ্ঞ দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই অধোগতি লাভ করে , অর্থাৎ দুঃখ ও অনর্থের মধ্যে পতিত হয় । ॥ ৩ ॥
যাঁরা কেউ ভালোবেসে সামান্য কিছু দান করলেও তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন , বিপদের সময় একবার সাহায্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত বা ফিরিয়ে দেওয়া হলেও দুঃখ পান না , কোনো খারাপ কাজ করেন না এবং সেখান থেকে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসেন , এবং যিনি সাহায্য করেননি তাঁর নিন্দাও করেন না , তাঁরাও সুপাত্র ।
যাঁরা জ্ঞানী ও ভালো মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন , দুঃখী মানুষের প্রতি করুণা দেখান , পুণ্যবান মানুষের সাফল্য ও আনন্দে আনন্দিত হন এবং পাপী মানুষের প্রতি রাগ বা ঘৃণা না রেখে নিরপেক্ষ থাকেন , তাঁরা সুপাত্র ।
যাঁরা সত্য নিয়ে চিন্তা করেন , সত্য কথা বলেন এবং সত্য অনুযায়ী কাজ করেন , যাঁদের মধ্যে কোনো ছলনা নেই , যাঁরা ঈর্ষা , রাগ ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত , যাঁদের স্বভাব শান্ত ও গভীর , যাঁরা সজ্জন , ধর্মনিষ্ঠ এবং সব ধরনের খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকেন , যাঁরা নিজেদের শরীর , মন ও সম্পদ মানুষের উপকারে কাজে লাগান এবং অন্যের সুখের জন্য প্রয়োজনে নিজের জীবন পর্যন্ত ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকেন , এই ধরনের গুণসম্পন্ন মানুষকেই ❝সুপাত্র❞ বলা হয় ।
তবে দুর্ভিক্ষ বা অন্য কোনো বড় বিপদের সময় মানুষসহ সব প্রাণীরই অন্ন , জল , বস্ত্র , ঔষধ , প্রয়োজনীয় পথ্য এবং আশ্রয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে । এ ক্ষেত্রে সাহায্য করার জন্য সুপাত্র-কুপাত্রের বিচার প্রযোজ্য নয় ।
প্রশ্ন : দাতা কত প্রকার ?
উত্তর : দাতা তিন প্রকার , উত্তম , মধ্যম ও অধম ।
যিনি দেশ , কাল ও পাত্র বিবেচনা করে সত্যবিদ্যার প্রসার , ধর্মের উন্নতি এবং মানুষের উপকারের উদ্দেশ্যে দান করেন , তিনি ❝উত্তম দাতা❞ ।
যিনি নিজের খ্যাতি বা স্বার্থসিদ্ধির জন্য দান করেন , তিনি ❝মধ্যম দাতা❞ ।
আর যিনি নিজের বা অন্যের কোনো প্রকৃত উপকার করতে পারেন না , কিন্তু বেশ্যাগমন ইত্যাদি কাজে ভাঁড় ও ভাটদের দান করেন এবং দান করার সময়ও অন্যকে তিরস্কার , অপমান বা কষ্ট দেওয়ার মতো আচরণ করেন , তিনি ❝নীচ দাতা❞ ।
যিনি সুপাত্র ও কুপাত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না এবং এমনভাবে দানের বিষয় নিয়ে দর-কষাকষি করেন , যেন বাজারে জিনিস বিক্রি করার সময় ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে , আবার ধর্মপরায়ণ মানুষকে কষ্ট দিয়ে নিজে সুখী হওয়ার উদ্দেশ্যেও দান করেন , তিনিও ❝অধম দাতা❞ ।
যিনি পরীক্ষা করে বিদ্বান ও ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের সম্মান করেন এবং তাঁদের দান করেন , তিনি ❝উত্তম দাতা❞ ।
যিনি পাত্রের যোগ্যতা পরীক্ষা করুন বা না করুন , শুধু নিজের প্রশংসা পাওয়ার জন্য দান করেন , তিনি ❝মধ্যম দাতা❞ ।
আর যিনি কোনো পরীক্ষা বা বিচার না করে অন্ধের মতো যেখানে সেখানে অর্থ দান করেন এবং সেই দানের কোনো প্রকৃত উপকার হয় না , তিনি ❝নীচ দাতা❞ ।
অতএব , মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী , দানের ক্ষেত্রে শুধু দান করার ইচ্ছাই যথেষ্ট নয় । দানের পাত্র , দাতার উদ্দেশ্য , দানের প্রয়োজনীয়তা এবং দানের ফল সমাজ ও মানুষের জন্য কী হচ্ছে , সেগুলিও বিবেচনা করা জরুরি ।
তদিত্যনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞতপঃক্রিয়াঃ।
দানক্রিয়াশ্চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৭.২৫
অনুবাদ: 'তৎ' এই শব্দ উচ্চারণ করে ফলে আকাঙ্ক্ষা না করে মোক্ষকামিগণ কর্তৃক বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞ, তপস্যাদি কর্ম এবং দানাাদি কর্ম অনুষ্ঠিত হয় ।
এই শ্লোকে দানের প্রকৃত উদ্দেশ্য আরও স্পষ্ট করা হয়েছে । দান এমন হওয়া উচিত নয় যে , তার বিনিময়ে কোনো ব্যক্তিগত লাভ , প্রশংসা বা ফল পাওয়ার প্রত্যাশা থাকবে । বরং কর্তব্যবোধে এবং পরম সত্যকে স্মরণ করে , ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে দান করাই এখানে নির্দেশিত হয়েছে । অর্থাৎ দানের মূল্য শুধু দানের পরিমাণে নয় , দাতার উদ্দেশ্য ও মানসিকতার মধ্যেও নিহিত ।
অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপস্তপ্তং কৃতং চ যৎ ।
অসদিত্যুচ্যতে পার্থ ন চ তৎ প্রেত্য নো ইহ ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৭.২৮
অনুবাদ অশ্রদ্ধাপূর্বক যজ্ঞ, দান , অনুষ্ঠিত তপস্যা এবং যা কিছু অনুষ্ঠিত হয় । সে সমস্তই 'অসৎ-'এরূপ কথিত হয় হে পার্থ ! সেগুলো না এজন্মে আর না মৃত্যুর পর ফলদায়ক হয় ।
এই শ্লোকে দানের ক্ষেত্রে শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে । শুধু দান করলেই তা মহৎ হয়ে যায় না দানের পেছনে যদি যথার্থ শ্রদ্ধা, উদ্দেশ্য ও সৎভাবনা না থাকে , তবে তার প্রকৃত মূল্য থাকে না । তাই দানের বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে কী মানসিকতা নিয়ে দান করা হচ্ছে সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ । যেমন বেদে বলা হয়েছে - যো মে পৃণাদ্ যো দদদ্ যো নিবোধাৎ
ঋগ্বেদ ২.৩০.৭ যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে , সে-ই প্রকৃত মিত্র ।
ত্যাজ্যং দোষবদিত্যেকে কর্ম প্রাহুর্মনীষিণঃ ।
যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যমিতি চাপরে ॥ ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- ১৮.৩
অনুবাদ: কোন কোন পণ্ডিত এরূপ বলেন , কর্মদোষ যুক্ত তাই তা পরিত্যাজ্য । অপর কেউ এরূপ বলেন যজ্ঞ , দান ও তপস্যাদি কর্ম পরিত্যাজ্য নয় ।
শ্লোকগুলোতে শ্রীভগবান স্পষ্টভাবে জানান যে, যজ্ঞ, দান ও তপস্যার মতো কর্তব্যকর্ম ত্যাগ করা উচিত নয় ।
যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যং কার্য্যমেব তৎ ।
যজ্ঞো দানং তপশ্চৈব পাবনানি মনীষিণাম্ ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- ১৮.৫
অনুবাদ: যজ্ঞ , দান ও তপস্যাদি কর্ম ত্যাগ করা উচিত নয় । এগুলো পলান করা অবশ্যই কর্তব্য । কারণ যজ্ঞ , দান ও তপস্যা জ্ঞানী ব্যক্তিদের পবিত্রকারী ।
এই শ্লোকে দানের গুরুত্ব সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । দান কোনো অপ্রয়োজনীয় বা পরিত্যাজ্য কর্ম নয়; বরং যথাযথভাবে সম্পাদিত দান মানুষের অন্তঃকরণকে পরিশুদ্ধ করতে সহায়তা করে । তাই দান করতে হবে, তবে তা যেন কর্তব্যবোধ ও সৎ উদ্দেশ্যের সঙ্গে হয় ।
এতান্যপি তু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলানি চ ।
কর্তব্যাণীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমম্ ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮.৬
অনুবাদ হে পার্থ! এই কর্মগুলোও আসক্তি ও ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে কর্তব্য মনে করে সম্পাদন করা উচিত এটাই আমার নিশ্চিত ও শ্রেষ্ঠ মত ।
এখানে গীতার দানের শিক্ষাটি পূর্ণতা পায় । দান ত্যাগ নয়, বরং আসক্তি ও ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করাই মূল কথা । অর্থাৎ দান করতে হবে কর্তব্যবোধে , কিন্তু তার বিনিময়ে প্রশংসা, প্রতিদান বা ব্যক্তিগত ফল পাওয়ার আশা রাখা উচিত নয় ।
১৭.৭→ দন তিন প্রকার ।
১৭.২০→ কর্তব্যবোধে , উপযুক্ত পাত্রে ও প্রত্যুপকারহীন দান = সাত্ত্বিক ।
১৭.২১→ ফল , প্রত্যুপকার বা স্বার্থের উদ্দেশ্যে দান = রাজসিক
১৭.২২→ অযোগ্য পাত্রে , অনুপযুক্ত সময়-স্থানে ও অবজ্ঞার সঙ্গে দান = তামসিক ।
১৮.৫–৬→ দান ত্যাগ নয় ; আসক্তি ও ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে কর্তব্য হিসেবে দান করাই গীতার শিক্ষা ।
❝দান করলেই দান পবিত্র হয় না; দানের পবিত্রতা নিহিত থাকে দাতার উদ্দেশ্য , বিবেক, শ্রদ্ধা ও নিঃস্বার্থতার মধ্যে ।❞
অতঃ গীতার শিক্ষা অনুযায়ী , দান করলেই দান পবিত্র হয় না ; দানের পবিত্রতা নির্ভর করে দাতার উদ্দেশ্য, দানের পাত্র, দেশ-কাল এবং দাতার মানসিকতার ওপর । কর্তব্যবোধে, শ্রদ্ধার সঙ্গে, যথার্থ পাত্রে এবং কোনো প্রত্যুপকার বা ফলের আকাঙ্ক্ষা ছাড়া করা দানই সাত্ত্বিক দানের আদর্শ । তাই দানের বাহ্যিক পরিমাণের চেয়ে দানের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও মানসিকতাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ । দান হবে কর্তব্যে , শ্রদ্ধায় , বিবেকে এবং নিঃস্বার্থভাবে । এটাই গীতায় দানের প্রকৃত শিক্ষা ।'ভদ্রা রাতিঃ' সামবেদ - ১৫৫৯ আমাদের দ্বারা প্রদত্ত দান কল্যাণময়ী ও কল্যাণদাতা হোক।
বাংলাদেশ অগ্নিবীর
সত্য প্রকাশে নির্ভীক সৈনিক ।

0 মন্তব্য(গুলি)