https://www.idblanter.com/search/label/Template
https://www.idblanter.com
BLANTERORBITv101

তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দুর্গা-তত্ত্ব

Friday, October 16, 2026

 

📚তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দুর্গা-তত্ত্ব
 
বেদ ও বৈদিক সাহিত্যে ব্যবহৃত কোনো শব্দের প্রকৃত তাৎপর্য নির্ণয় করতে হলে সেই শব্দের ভাষাগত অর্থ, ব্যাকরণগত গঠন, মন্ত্রের প্রসঙ্গ এবং বৈদিক দর্শনের আলোকে তার বিচার করা প্রয়োজন। কেবল কোনো শব্দের সাথে পরবর্তীকালীন পৌরাণিক সাহিত্যে প্রচলিত কোনো দেবতা বা দেবীমূর্তির নামের মিল রয়েছে বলেই উভয়কে অভিন্ন বলে ধরে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ, একটি শব্দের নিজস্ব অর্থ ও প্রয়োগ থাকতে পারে; আবার কালক্রমে সেই একই শব্দ পৌরাণিক আখ্যানের সাথে যুক্ত হয়ে ভিন্ন অর্থও লাভ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ‘শিব’, ‘লক্ষ্মী’, ‘সরস্বতী’ এই শব্দগুলি বৈদিক সাহিত্যে পাওয়া গেলেই সেগুলিকে সরাসরি পরবর্তীকালীন পুরাণে বর্ণিত সংশ্লিষ্ট দেবতা বা দেবীমূর্তির পরিচয়ের সঙ্গে অভিন্ন বলে ধরে নেওয়া অমূলক। প্রথমে দেখা উচিত সংশ্লিষ্ট বৈদিক মন্ত্রে শব্দটি কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, শব্দটির গুণ, স্বভাব, কার্য-শক্তি কোন সত্তাকে নির্দেশ করছে। বৈদিক সাহিত্যে শব্দের অর্থ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শব্দের ব্যুৎপত্তি ও প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— ‘শিব’ শব্দের সঙ্গে মঙ্গল বা কল্যাণের ভাব, ‘লক্ষ্মী’ শব্দের সঙ্গে শোভা বা ঐশ্বর্যের ধারণা এবং ‘সরস্বতী’ শব্দের সঙ্গে বাণী‌ ও জ্ঞানের ভাব যুক্ত হতে পারে। কিন্তু কোনো শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থই তার প্রতিটি প্রয়োগের চূড়ান্ত অর্থ নির্ধারণ করে না, সেই সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রের বাক্যগঠন ও প্রসঙ্গও বিবেচনা করতে হয়। একইভাবে, কোনো শব্দ পরবর্তী পৌরাণিক সাহিত্যে বিশেষ দেবতা বা দেবীর নাম হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও, বৈদিক সাহিত্যে তার প্রতিটি প্রয়োগে সেই পরবর্তী পরিচয়ই নিহিত ছিল, এমন সিদ্ধান্তে আসা অমূলক। বৈদিক সাহিত্যে কোনো শব্দের উল্লেখ পাওয়া যাওয়া এবং পরবর্তী পৌরাণিক সাহিত্যে সেই শব্দকে কেন্দ্র করে বিকশিত দেবতা বা দেবীর পূর্ণাঙ্গ রূপের অস্তিত্ব, এই দুটি বিষয় আলাদা। প্রথমটি সংশ্লিষ্ট বৈদিক পাঠের সাক্ষ্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে; দ্বিতীয়টির জন্য পরবর্তী সাহিত্য, আখ্যান ও ঐতিহাসিক বিকাশের প্রমাণ বিবেচনা করতে হয়। দুটি ধারার মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকলে তা পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা উচিত। 
 
বৈদিক সাহিত্যে ‘দুর্গা’ শব্দটির তাৎপর্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হলে প্রথমে বেদের ঈশ্বরতত্ত্ব ও দেবতাতত্ত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। পৌরাণিক সাহিত্যে দুর্গা নামে এক বিশেষ দেবীমূর্তি, মহিষাসুরমর্দিনী রূপ এবং তাঁকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিভিন্ন অলৌকিক কাহিনি সুপরিচিত। কিন্তু বৈদিক সাহিত্যে ‘দুর্গা’ শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য নির্ণয় করতে হলে পৌরাণিক ধারণার পরিবর্তে বেদের নিজস্ব তত্ত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিষয়টি বিচার করা আবশ্যক। সেজন্য প্রথমে বৈদিক দেবতাতত্ত্ব সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রয়োজন। বেদে দেবতার সংখ্যা প্রসঙ্গে তেত্রিশ দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন— “ত্রয়স্ত্রিংশতং” (ঋগ্বেদ ১।৪৫।২), “ত্রয়শ্চ ত্রিংশচ্চ” (ঋগ্বেদ ৮।৩০।২) এবং “ত্রয়স্ত্রিংশদ্দেবা” (অথর্ববেদ ১০।৭।১৩) প্রভৃতি। বৃহদারণ্যক উপনিষদেও এই তেত্রিশ দেবতার পরিচয় সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে— “ত্রয়স্ত্রিংশদিত্যষ্টৌ বসব একাদশ রুদ্রা দ্বাদশাদিত্যাস্ত একত্রিংশদিন্দ্রশ্চৈব প্রজাপতিশ্চ ত্রয়স্ত্রিংশাবিতি।” (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৩।৯।২) অর্থাৎ অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, ইন্দ্র ও প্রজাপতি মিলিয়ে তেত্রিশ দেবতা। বৈদিক দেবতাতত্ত্বের এই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন আকৃতি, অস্ত্রশস্ত্র ও অলংকারে সজ্জিত স্বতন্ত্র দেব-দেবীমূর্তির কল্পনাকে বেদের নিজস্ব দেবতাতত্ত্বের সঙ্গে এক করে দেখা সংগত নয়। বেদের বিভিন্ন মন্ত্রে ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, অগ্নি, সোম প্রভৃতি দেবতাসূচক নাম থাকলেও বৈদিক ব্যাখ্যা অনুসারে, এই নামগুলি পরমাত্মার বিভিন্ন গুণ, কর্ম ও স্বভাবের পরিচয় বহন করে। ঋগ্বেদের একটি মন্ত্রে বলা হয়েছে— “একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি।” (ঋগ্বেদ ১।১৬৪।৪৬) অর্থাৎ “ এক পরম সত্যকে জ্ঞানীরা বিভিন্ন নামে অভিহিত করেন।” মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর সত্যার্থ প্রকাশ গ্রন্থে ঈশ্বরের একশত নামের ব্যাখ্যা করেছেন। এই নামগুলির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার পর তিনি লিখেছেন— “পরমেশ্বরের এই শতনাম লিখিত হইল। কিন্তু এই সকল ব্যতীতও পরমেশ্বরের অসংখ্য নাম আছে। কারণ পরমেশ্বরের গুণ-কর্ম-স্বভাব যেরূপ অনন্ত, তাঁহার নামও সেইরূপ অনন্ত। সেই সকলের প্রত্যেকটির গুণ, কর্ম ও স্বভাব অনুসারে এক একটি নাম হইয়াছে। আমার লিখিত এই নামগুলি সমুদ্রে বিন্দুবৎ। কারণ, বেদাদি শাস্ত্রে পরমাত্মার অনন্ত গুণ-কর্ম-স্বভাব ব্যাখ্যাত হইয়াছে।” মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী ঈশ্বরের এই শতনামের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে শিব, লক্ষ্মী, সরস্বতী প্রভৃতি নামের ব্যাখ্যাও আলোচনা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যাকৃত শতনামের মধ্যে ‘দুর্গা’ নামটির উল্লেখ ও ব্যাখ্যা না থাকলেও, সেটি যে পরমাত্মার গুণবাচক নাম হিসেবে গৃহীত হবে না, এমন কোনো কথা নেই। কেননা, মহর্ষি নিজেই স্পষ্টভাবে বলেছেন যে পরমেশ্বরের গুণ, কর্ম ও স্বভাব অনন্ত এবং সেই অনুসারে তাঁর নামও অনন্ত। তিনি ঈশ্বরের অসংখ্য নামের মধ্য থেকে কেবল কয়েকটি নামের ব্যাখ্যা করেছেন। অতএব, মহর্ষি দয়ানন্দের উক্ত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ‘দুর্গা’ নামটিকেও পরমাত্মার কোনো বিশেষ গুণ, কর্ম বা স্বভাবের পরিচায়ক নাম হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ রয়েছে। বৈদিক সাহিত্যে ‘দুর্গা’ নামের সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় তৈত্তিরীয় আরণ্যকে। সেখানে বলা হয়েছে—
তাম॒গ্নিব॑ণা॒ তপ॑সা জ্বলন্তীং বৈরোচনীং কৈর্মফুলেষু জুষ্টবা॑ম্।
দুর্গা দে॒বী শর॑ণম॒হং প্রপ॑দ্যে সুতর॑সি তরসে নমঃ, ইতি ॥
(তৈত্তিরীয় আরণ্যক। ১০ম প্রপাঠক। ১ম অনুবাক। মন্ত্র ৫২)
তৈত্তিরীয় আরণ্যকের এই মন্ত্রে ‘দুর্গা’ নামের উল্লেখ শব্দটির তাৎপর্য অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এজন্য আমাদের তৈত্তিরীয় আরণ্যক নিয়ে মৌলিক কিছু ধারণা প্রয়োজন। কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় শাখার এই আরণ্যকটি প্রকৃতপক্ষে তার ব্রাহ্মণেরই একটি বিস্তৃত অংশ। বর্তমানে এই আরণ্যকটি ১০টি প্রপাঠকে পাওয়া যায়। মহর্ষি তিত্তিরি এর সংকলন করেছিলেন। এই আরণ্যকের প্রথম দুটি প্রপাঠক মূল তৈত্তিরীয় শাখার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে হয় না, কারণ এই আরণ্যকের প্রাচীন ভাষ্যকার ভট্ট ভাস্করমিশ্র প্রথম দুটি প্রপাঠককে কাঠক বলে উল্লেখ করেছেন (অত্র সন্ত্যষ্টৌ কাঠকে কাণ্ডানি কঠমুনিনা দৃষ্টানি)। তৈত্তিরীয় উপনিষদও এই আরণ্যকের অন্তর্গত। এই আরণ্যকের সপ্তম থেকে নবম প্রপাঠককে উপনিষদ বলা হয়। এই আরণ্যকে পরাশর ব্যাস ও বৈশম্পায়নের নাম পাওয়া যায়। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, এই আরণ্যকটি তাঁদের উভয়ের জীবদ্দশায় অথবা তাঁদের পরবর্তী সময়ে সংকলিত হয়েছিল। ‘যজ্ঞোপবীত’ শব্দটিরও প্রথম উল্লেখ এই আরণ্যকে পাওয়া যায়। ‘শ্রমণ’ শব্দটিও এই আরণ্যকে রয়েছে। এই আরণ্যকের দশম প্রপাঠকটি অত্যন্ত দুরবস্থার শিকার হয়েছে। আচার্য সায়ণ তাঁর ভাষ্যের শুরুতেই একে খিলকাণ্ড বলে উল্লেখ করেছেন। এই প্রপাঠকেই বিখ্যাত নারায়ণোপনিষদ রয়েছে, যাকে সায়ণ ও ভট্ট ভাস্কর, উভয়েই খিল বলে গণ্য করেছেন (তথেয়ং নারায়ণীয়াখ্যা যাজ্ঞিক্যুপনিষদপি খিলকাণ্ডরূপা তল্লক্ষণোপেতত্বাৎ)। দশম প্রপাঠকটি খিল হওয়ার পাশাপাশি, এর অনুবাকের সংখ্যা নিয়েও সর্বসম্মত মত নেই। সায়ণভাষ্য থেকে জানা যায়, এই আরণ্যকের দশম প্রপাঠকের দ্রাবিড় পাঠে ৬৪টি অনুবাক, আন্ধ্র পাঠে ৮০টি অনুবাক এবং কর্ণাটক পাঠে ৭৪টি ও ৮৬টি অনুবাক পাওয়া যায়। আজ পর্যন্ত কতগুলি প্রপাঠক যথার্থ, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। অতএব তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দশম প্রপাঠকে দেবী দুর্গার যে উল্লেখ পাওয়া যায়, তা মুলত খিলকাণ্ড। সুতরাং এই অংশ প্রামাণিক গণ্য করে দেবী দুর্গার বৈদিকী অনুসন্ধান যথাযথ নয়। তথাপি আমরা মন্ত্রগুলির অর্থ ও তাৎপর্য বোঝার মাধ্যমে জানার চেষ্টা করবো মন্ত্রোক্ত দেবী দুর্গা আসলে কোন সত্তাকে নির্দেশ করছে—
 
[তৈত্তিরীয় আরণ্যক। ১০ম প্রাপাঠক।১ম অনুবাক। মন্ত্র ৫১-৫৬]
জা॒তবে॑দসে সুনবাম॒ সোম॑মরাতীয়॒তো নির্দহাতি বেদঃ।
স নঃ পর্ষদর্তি দুর্গাণি বিশ্বা॑ না॒বেব॒ সিন্ধুং দুর॒তাঽত্যগ্নিঃ॥১॥
অর্থ— (জাতবেদসে) জাতবেদ অগ্নির উদ্দেশে [যজ্ঞের সময়], (সোমং সুনবাম) আমি সোম নিষ্পেষণ করি। (বেদঃ) যিনি সকলকে জানেন, সেই অগ্নি (আরাতীয়তঃ) শত্রুতা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের (নিদহাতি) দগ্ধ করে ভস্মীভূত করেন। (সঃ) সেই অগ্নি (বিশ্বা দুর্গাণি) আমাদের সমস্ত বিপত্তিসমূহ (অতিপর্ষতি) বিনষ্ট করে দেন। (অগ্নিঃ) অগ্নি আমাদের (দুরিতা) দুঃখদায়ক পাপগুলি থেকেও পার করিয়ে দেন, ঠিক যেমন (নাবা ইব সিন্ধুঃ) নৌকার সাহায্যে মাঝি সমুদ্র পার করে দেন।
 
তাম॒গ্নিব॑ণা॒ তপ॑সা জ্বলন্তীং বৈরোচনীং কৈর্মফুলেষু জুষ্টবা॑ম্।
দুর্গা দে॒বী শর॑ণম॒হং প্রপ॑দ্যে সুতর॑সি তরসে নর্মঃ॥২॥
অর্থ— (তপসা জ্বলন্তীম্) নিজের তেজের দ্বারা [আমাদের শত্রুদের] দগ্ধ ও বিনষ্ট করছেন যিনি; (বৈরোচনীম্) নিজের প্রকাশ দ্বারা বিশেষভাবে দীপ্তিমান; (কর্মফলেষু জুষ্টাম্) [স্বর্গ, পশু, পুত্রাদি লাভের নিমিত্তে] কর্মফলসমূহের মধ্যে উপাসকদের দ্বারা যিনি সেবিত; (অগ্নিবর্ণাম্) অগ্নির মতো রূপবিশিষ্ট; (তাম্ দুর্গা দেবীম্) সেই দিব্য দুর্গারূপ পরমাত্মার (অহং শরণং প্রপদ্যে) আমি শরণ গ্রহণ করি। (সুতরসি) হে সংসারসাগর পার হওয়ার উপায়স্বরূপা দুর্গে! (তরসে নমঃ) তারণকারিণী তোমাকে নমস্কার।
 
অগ্নে॒ ত্বং পা॑রয়া॒ নব্যয়ো অ॒স্মান্ত্স্ব॒স্তিভিরর্তি দুর্গাণি বিশ্বা ।  
পূশ্চ পৃথ্বী বেহুলা ন॑ উ॒র্বী ভবা॑ লো॒কায়॒ তন॑য়ায়॒ শংয়োঃ॥৩॥
অর্থ— (অগ্নে) হে অগ্নি! (নব্যঃ ত্বম) তুমি স্তব করার যোগ্য। (অস্মান্) আমাদের (স্বস্তিভিঃ) তোমার কল্যাণসমূহের দ্বারা (বিশ্বা দুর্গাণি) সমস্ত বিপদ-আপদ (অতিপারয়) অত্যন্ত সহজে সংসারসাগরের ওপারে পার করিয়ে দাও। (পূঃ চ) আর বসবাসের উপযোগী (পৃথিবী) বিস্তৃত পৃথিবী (নঃ) আমাদের জন্য (উর্বী) সকলকে উৎপন্ন ও ধারণ করার ক্ষমতাসম্পন্ন হোক। (তোকায় তনয়ায়) আমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তানসন্ততির জন্য (শংয়োঃ ভব) তুমি সুখ ও কল্যাণ প্রদানকারী হও।
 
বিশ্বানি নো দুর্গর্হা জাতবেদ্ঃ সিন্ধুং ন না॒বা দ॑র॒তাঽতি॑পর্ষ ।
অগ্নে॑ অত্রিবন্মন॑সা গৃণাননোঽস্মাকং বোধ্যবিতা ত॒নেনাম্॥৪॥
অর্থ— (জাতবেদঃ) হে জাতবেদ অগ্নি! (দুর্গহা) তুমি সমস্ত বিপদ-আপদের বিনাশকারী। তুমি (বিশ্বানি দুরিতা) আমাদের সমস্ত পাপ (অতিপর্ষি) সেইভাবে পার করিয়ে দাও, (নাবা সিন্ধুং ন) যেভাবে নৌকার সাহায্যে মাঝি সমুদ্র পার করিয়ে দেয়। (অগ্নে) হে অগ্নি! (অত্রিবৎ) অত্রির মতো [ত্রিবিধ তাপ থেকে মুক্ত এবং সকলের সুখের জন্য], (মনসা গৃণানঃ) মন থেকে স্তবের দ্বারা প্রশংসিত হয়ে, (অস্মাকং তনূনাম্) আমাদের সন্তানদের (অবিতা) রক্ষক হও। এভাবে (বোধি) আমাদের জানো। 
 
পৃত॒মা॒জিত॒ সহ॑মানমুগ্রম॒গ্নিঃ হুবেম পর॒মাৎস॒ধস্র্থাৎ ।
স নঃ পর্ষদর্তি দুর্গাণি বিশ্বা॒ ক্ষাম॑দ্দেবো অতি দুরিতাঽত্য॒গ্নিঃ॥৫॥
অর্থ—(পৃতনাজিতম্) শত্রুসেনাকে পরাজিতকারী, (সহমানম্) শত্রুদের পরাভূতকারী, (উগ্রম্) ভয়ের কারণস্বরূপ, (অগ্নিম্) সেই অগ্নিকে (পরমাৎ সধস্থাৎ) তাঁর উৎকৃষ্ট অবস্থান থেকে (হুবেম) আমরা আহ্বান করছি। (সঃ) সেই অগ্নি (নঃ) আমাদের (বিশ্বা দুর্গাণি) সমস্ত বিপদ-আপদকে (অতিপর্ষৎ) বিশেষভাবে পরাভূত ও বিনষ্ট করুন। (অগ্নিঃ দেবঃ) অগ্নিদেব (ক্ষামৎ) আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে (অতিদুরিতা) ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি গুরুতর পাপসমূহকে (অতি) অত্যন্তরূপে বিনষ্ট করেন।
 
প্রত্নোর্ষি কুমীড্যৌ অধ্ব॒রেষু॑ স॒নাচ্চ হোতা॒ নব্য॑শ্চ সৎসি ।
স্বাং চর্চাগ্নে ত॒নুর্বং প॒প্রয়॑স্ব॒স্মভ্য॑ চ॒ সৌভ॑রা॒মায়॑জস্ব॥৬॥
অর্থ— হে অগ্নি! (অধ্বরেষু) হিংসাবর্জিত যজ্ঞসমূহে (ইড্যঃ) তুমি স্তব করার যোগ্য। (কম্) সুখকে (প্রত্নোষি) তুমি বিস্তৃত ও বর্ধিত করো। তুমি (সনাচ্চ) প্রাচীনকাল থেকেই কর্মফল প্রদানকারী এবং (হোতা) হোমকার্য সম্পাদনকারী। (নব্যঃ) স্তব করার যোগ্য হয়ে তুমি (সৎসি) যজ্ঞস্থলে উপবেশন করো। (অগ্নে) হে অগ্নি! (স্বাং তনুয়াম্) তোমার নিজের শরীরকে (পিপ্রয়স্ব) আমাদের হব্যদ্রব্যের দ্বারা আনন্দিত করো। তারপর (অস্মভ্যম্) আমাদের জন্য (সৌভগম্) সৌভাগ্য (আয়জস্ব) সর্বতোভাবে প্রদান করো।
 
[ব্যাখ্যাকার— ডা০ জমুনাপাঠক, এম. এ., পি,এচ্. ডী. (সংস্কৃত), সংস্কৃত বিভাগ, কলা সঙ্কায় কাশী হিন্দূ বিশ্ববিদ্যালয়, বারাণসী। চৌখম্বা সংস্কৃত সিরিজ]
 
এখন মন্ত্রগুলোর তাৎপর্য পর্যায়ক্রমে বিচার করা প্রয়োজন। ১ম মন্ত্রটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেখানে ‘জাতবেদা অগ্নি’র উদ্দেশে প্রার্থনা করা হয়েছে— “তিনি যেন আমাদের সমস্ত আপদ-বিপদ, দুর্গতি ও দুঃখদায়ক পাপাচরণ থেকে পার করে দেন।” কিন্তু এখানে যে ‘জাতবেদা অগ্নি’র কথা বলা হয়েছে, তিনি কে? তাঁর স্বরূপ কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করলেই মন্ত্রগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। ‘জাতবেদস্’ শব্দটির অর্থে মহর্ষি যাস্ক একাধিক ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করেছেন—
“জাতবেদাঃ কস্মাৎ? জাতানি বেদ, জাতানি বৈনং বিদুঃ, জাতে জাতে বিদ্যুতে ইতি বা, জাতবিত্তো বো জাতধনঃ, জাতবিদ্যো বা জাতপ্রজ্ঞানঃ।” (নিরুক্ত ৭।১৯)
অর্থাৎ ‘জাতবেদস্’ কে?
(ক) যিনি উৎপন্ন পদার্থসমূহকে জানেন, তিনি ‘জাতবেদস্’ অর্থাৎ সর্বজ্ঞ পরমেশ্বর।
(খ) যাঁকে উৎপন্ন জীব ও মানুষ জানে, তিনি ‘জাতবেদস্’; অর্থাৎ, পরমেশ্বর। ‘জাত’ শব্দের সঙ্গে ‘বিদ্ জ্ঞানে’ ধাতু যুক্ত করে, কর্তৃবাচ্য বা কর্মবাচ্যে ‘অসি’ প্রত্যয় (উণাদি ৪।২২৭) প্রয়োগ করলে এই দুটি ব্যুৎপত্তি পাওয়া যায়।
(গ) যিনি প্রত্যেক উৎপন্ন পদার্থে বিদ্যমান, তিনি ‘জাতবেদস্’। অর্থাৎ পরমেশ্বর সর্বব্যাপক। এখানে ‘জাত’ এবং ‘বিদ্ সত্তায়’ ধাতুর সঙ্গে ‘অসি’ প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে।
(ঘ) ‘জাতং বিত্তং ধনং যস্মাৎ যস্য বা স জাতবেদাঃ’ অর্থাৎ যাঁর থেকে ধনসম্পদ উৎপন্ন হয় অথবা যাঁর ধনসম্পদ রয়েছে, তিনি ‘জাতবেদাঃ’। ‘জাত’ শব্দের সঙ্গে ‘বিদুল্-লাভে’ ধাতু ও ‘অসি’ প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে। এই ব্যুৎপত্তি অনুসারে, যিনি ধনপ্রদানকারী অথবা ঐশ্বর্যশালী, তাঁকে ‘জাতবেদস্’ বলা হয়। পরমেশ্বরের মধ্যে এই দুটি গুণই বিদ্যমান।
(ঙ) ‘জাতা বিদ্যা প্রজ্ঞানং যস্মাৎ যস্য বা স জাতবেদাঃ’ অর্থাৎ যাঁর থেকে বিদ্যা ও প্রজ্ঞার উৎপত্তি হয় অথবা যাঁর মধ্যে বিদ্যা ও প্রজ্ঞা রয়েছে, তিনি ‘জাতবেদাঃ’। এখানে ‘জাত’ শব্দের সঙ্গে ‘বিদ্ জ্ঞানে’ ধাতু ও ‘অসি’ প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে। পরমেশ্বর জ্ঞানপ্রদানকারী ও সর্বজ্ঞ।
 
মহর্ষি যাস্কের এই ব্যাখ্যাগুলো থেকে বোঝা যায়, ‘জাতবেদস্’ শব্দটি কেবল ভৌতিক অগ্নির নাম নয়, বরং এর দ্বারা সর্বজ্ঞ, সর্বব্যাপক, জ্ঞানপ্রদানকারী ও ঐশ্বর্যের উৎস পরমেশ্বরকেও বোঝানো হয়। আলোচ্য মন্ত্রের প্রসঙ্গে এই অর্থটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, মন্ত্রে যে সত্তার কাছে সমস্ত দুর্গতি ও পাপাচরণ থেকে উদ্ধার লাভের প্রার্থনা করা হয়েছে, তাঁর মধ্যে সর্বজ্ঞতা এবং জীবকে বিপদমুক্ত করার সামর্থ্য থাকা আবশ্যক। ভৌতিক অগ্নি তাপ ও আলো প্রদান করতে পারে এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষের উপকারে আসে; কিন্তু সে নিজে সর্বজ্ঞ নয়, মানুষের কর্মফলের বিধাতাও নয়। একইভাবে, কেবল জাগতিক শক্তির সাহায্যে সমস্ত পাপাচরণ থেকে মুক্তি এবং সংসারবন্ধন অতিক্রম করে মোক্ষলাভ সম্ভব নয়। অতএব, এই মন্ত্রে ‘জাতবেদা অগ্নি’ যে জগদীশ্বর বা পরমাত্মা, এতে সন্দেহ নেই। 
 
তৈত্তিরীয় আরণ্যকের আলোচ্য প্রথম মন্ত্রটি ঋগ্বেদেও উল্লিখিত আছে। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর ভাষ্যে মন্ত্রটির অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘জাতবেদা অগ্নি’কে বিজ্ঞানস্বরূপ জগদীশ্বর হিসেবে নির্দেশ করেছেন। তাঁর ভাষ্যের মর্মার্থ নিম্নরূপ—
ভাষ্যার্থ— (জাতবেদসে) যিনি উৎপন্ন স্থাবর ও জঙ্গম জগৎকে জানেন, সকলের দ্বারা প্রাপ্ত হন অথবা উৎপন্ন সমস্ত পদার্থের মধ্যে বিদ্যমান, সেই জগদীশ্বরের উদ্দেশে আমরা (সোমম্) সমস্ত ঐশ্বর্যসম্পন্ন জাগতিক পদার্থের (সুতশাম) নির্যাস নিংড়ে বের করি; অর্থাৎ, সবকিছুকে যথাযথভাবে কাজে নিযুক্ত করি। আর যিনি (অরাতীয়তঃ) অধার্মিকদের মতো আচরণকারী দুষ্ট ব্যক্তিদের (বেদঃ) ধনসম্পদ (নি, দহাতি) নিরন্তর বিনষ্ট করেন, (সঃ) সেই (অগ্নিঃ) বিজ্ঞানস্বরূপ জগদীশ্বর, যেমন কোনো মাঝি (নাবেব) নৌকার সাহায্যে (সিন্ধুম্) নদী বা সমুদ্র পার করিয়ে দেন, তেমনই (নঃ) আমাদের (অতি) অত্যন্ত দুর্গম (দুর্গাণি) দুরবস্থা এবং (অতিদুরিতা) অতিশয় দুঃখদায়ক (বিশ্বা) সমস্ত পাপাচরণ থেকে (পর্ষৎ) পার করেন। তিনিই এই জগতে অনুসন্ধান ও উপলব্ধি করার যোগ্য। (ঋগ্বেদ০ ১।৯৯।১, মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী) 
 
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট যে, এখানে অগ্নিকে কেবল দহনশক্তিসম্পন্ন ভৌতিক পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি; বরং তাঁকে জ্ঞানস্বরূপ, সর্বজ্ঞ ও উদ্ধারকর্তা জগদীশ্বর হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মন্ত্রে ‘দুর্গাণি’ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মন্ত্রে প্রার্থনা করা হয়েছে, জাতবেদা অগ্নি যেন আমাদের সমস্ত দুর্গাণি অর্থাৎ দুর্গম ও অতিক্রম করা কঠিন অবস্থা থেকে পার করে দেন। নিরুক্তকার মহর্ষি যাস্ক এই শব্দটির ব্যাখ্যা করেছেন— “দুর্গাণি দুর্গমনি স্থানানি।” (নিরুক্ত ১৪।৩৩) অর্থাৎ, ‘দুর্গাণি’ বলতে দুর্গম স্থানসমূহকে বোঝায়। দুর্গমতা বলতে এমন সমস্ত অবস্থা বোঝানো হয়েছে, যা অতিক্রম করা কঠিন এবং যা মানুষকে দুঃখ, বিপদ ও দুর্দশার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে। সেই অবস্থাগুলো থেকে উত্তরণের জন্যই জগদীশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে। যেমন একজন দক্ষ মাঝি নৌকার সাহায্যে যাত্রীকে উত্তাল নদী বা সমুদ্রের বিপদসংকুল পথ অতিক্রম করিয়ে নিরাপদে অপর পারে পৌঁছে দেন, তেমনই পরমাত্মা তাঁর বিধান ও জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষকে জীবনের দুর্গম পথ অতিক্রম করতে সহায়তা করেন। এই উপমার মাধ্যমে মন্ত্রে পরমাত্মার রক্ষাকারী ও উদ্ধারকর্তা স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে। অতএব, প্রথম মন্ত্রে ‘জাতবেদা অগ্নি’ এবং ‘দুর্গাণি’ এই দুটি শব্দ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একদিকে জাতবেদা অগ্নি হলেন সেই জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মা, যাঁর কাছে মানুষ আশ্রয় প্রার্থনা করে; অন্যদিকে ‘দুর্গাণি’ হলো সেই সমস্ত দুর্গম অবস্থা, যেগুলো থেকে মানুষ তাঁর সাহায্যে উত্তরণ কামনা করে। 
 
এরপর দ্বিতীয় মন্ত্রে সেই জাতবেদা অগ্নি = বিজ্ঞানস্বরূপ জগদীশ্বরের স্বরূপ বর্ণনা করে বলা হয়েছে— তিনি তপসা জ্বলন্তীম্ = নিজের তেজের দ্বারা শত্রুদের দগ্ধ করেন; তিনি বৈরোচনীম্ = নিজের প্রকাশ দ্বারা বিশেষভাবে দীপ্তিমান; তিনি অগ্নিবর্ণাম্= অগ্নির মতো রূপবিশিষ্ট; সেই দুর্গা দেবীম্ = দিব্য দুর্গারূপ পরমাত্মার আমি শরণ গ্রহণ করি। মন্ত্রোক্ত এই বিশেষণগুলোর দ্বারা এমন এক সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়, যিনি তেজস্বী, স্বপ্রকাশ এবং বিপদ থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম। এখানে ‘দুর্গা দেবী’র শরণ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। আলোচ্য বৈদিক ব্যাখ্যা অনুসারে, এই দুর্গা হলেন বিপদ থেকে উদ্ধারকারী পরমাত্মা, যিনি মানুষকে দুঃখ, দুর্গতি ও অতিক্রম করা কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তির পথ দেখান। প্রথম মন্ত্রে জাতবেদা অগ্নির কাছে সমস্ত দুর্গম অবস্থা থেকে পার করে দেওয়ার প্রার্থনা করা হয়েছে; দ্বিতীয় মন্ত্রে সেই উদ্ধারকর্তা সত্তার তেজ, দীপ্তি ও শরণদায়ক স্বরূপ বর্ণনা করে তাঁর আশ্রয় গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এই দুই মন্ত্রের ভাবগত সংযোগ থেকে বোঝা যায়, ‘দুর্গা’ নামটি এখানে বিপদ থেকে উদ্ধারকারী পরমাত্মার গুণ ও কার্মকে প্রকাশ করছে। যজুর্বেদেও পরমাত্মার তেজোময় স্বরূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। যথা— “বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্ আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ। তমেব বিদিত্বাহতি মৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেঽয়নায়॥ (যজু০ ৩১।১৮)” অর্থাৎ “অবিদ্যারূপ অন্ধকারের অতীত, সূর্যের ন্যায় স্বপ্রকাশ-স্বরূপ, এই মহান পরমাত্মাকে আমি জানি। তাঁকে জেনেই মনুষ্য মৃত্যুরূপ দুঃখকে অতিক্রম করতে পারে; মোক্ষপ্রাপ্তির জন্য অন্য কোনো পথ নেই”। এই মন্ত্রে পরমাত্মাকে মহান, জ্যোতির্ময় ও অন্ধকারের অতীত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর জ্ঞান লাভের মাধ্যমে মানুষ মৃত্যুর বন্ধন অতিক্রম করতে পারে। আলোচ্য দুর্গা-মন্ত্রে যে তেজস্বী, দীপ্তিমান ও উদ্ধারকর্তা সত্তার শরণ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে এই বৈদিক বর্ণনার ভাবগত সাদৃশ্য রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই পরমাত্মার তেজ, জ্যোতি এবং দুঃখমুক্তির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রকাশিত হয়েছে। অতএব এই প্রসঙ্গে ‘দুর্গা’ শব্দকে পরমাত্মার একটি গুণবাচক নাম হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়, যে নামের মধ্যে দুর্গম বিপদ থেকে উদ্ধার, দুঃখ-কষ্ট অতিক্রম এবং নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। ডা. জমুনাপাঠকজিও আরণ্যকের উক্ত মন্ত্রের ভাষ্যর ‘দুর্গা’ নামটিকে বিপদ থেকে উদ্ধারকারী পরমাত্মার গুণবাচক নাম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অতএব এটি যে শুধু আমাদের একক সিদ্ধান্ত, এমন ধারণা অমূলক। 
 
পরবর্তী মন্তগুলোর অন্তর্নিহিত পাঠগুলো বিচার করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যায়। তৃতীয় মন্ত্রে পুনরায় সেই জাতবেদা অগ্নির উদ্দেশে প্রার্থনা করা হয়েছে— ‘অগ্নে’ = হে অগ্নিদেব! ‘বিশ্বা দুর্গাণি’ = সমস্ত বিপদ-আপদ ও দুর্গম অবস্থা থেকে ‘অতিপারয়’ = আমাদের পার করে দাও। একইভাবে চতুর্থ মন্ত্রে জাতবেদা অগ্নির উদ্দেশে বলা হয়েছে— ‘জাতবেদঃ’ = হে জাতবেদ অগ্নি! তুমি ‘দুর্গহা’ = সমস্ত বিপদ-আপদের বিনাশকারী। তুমি ‘বিশ্বানি দুরিতা’ = আমাদের সমস্ত দুঃখদায়ক পাপাচরণ থেকে ‘অতিপর্ষি’ = আমাদের পার করে দাও। এরপর পঞ্চম মন্ত্রেও একই প্রার্থনার ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। সেখানে বলা হয়েছে— ‘সঃ’ = সেই অগ্নিদেব ‘নঃ’ = আমাদের ‘বিশ্বা দুর্গাণি’ = সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে ‘অতিপর্ষৎ’ = বিশেষভাবে পার করে দিন। পরিশেষো ষষ্ঠ মন্ত্রে অগ্নির অন্য কয়েকটি গুণের বর্ণনা করে বলা হয়েছে— ‘অধ্বরেষু’ = হিংসাবর্জিত যজ্ঞসমূহে ‘ইড্যঃ’ = তুমি স্তব করার যোগ্য। ‘কম্’ = সুখকে ‘প্রত্নোষি’ =তুমি বিস্তৃত ও বর্ধিত করো। ‘সনাচ্চ’ = প্রাচীনকাল থেকেই তুমি কর্মফল প্রদানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই মন্ত্রে স্পষ্ট যে অগ্নিদেব কর্মফলের দাতা, আর বিশেষণ কেবল পরমাত্মার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। এভাবে মন্ত্রগুলোর ধারাবাহিক আলোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি মন্ত্রেই জাতবেদা অগ্নির উদ্দেশে প্রার্থনা, স্তব অথবা তাঁর গুণের বর্ণনা করা হয়েছে। কোথাও তাঁকে সমস্ত দুর্গম অবস্থা থেকে উদ্ধারকারী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, কোথাও পাপাচরণ থেকে পার করে দেওয়ার প্রার্থনা জানানো হয়েছে, আবার কোথাও তাঁর কল্যাণপ্রদ ও স্তবযোগ্য স্বরূপের প্রশংসা করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতার মধ্যে দ্বিতীয় মন্ত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, সেখানেই জাতবেদা অগ্নির তেজোময় ও দীপ্তিমান স্বরূপের বর্ণনা দিয়ে তাঁকে ‘দুর্গা দেবী’ নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং তাঁর শরণ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।  তাই কেবল বৈদিক মন্ত্রে এই শব্দের প্রয়োগকে পরবর্তী পৌরাণিক সাহিত্যে প্রচলিত বিশেষ দেবীমূর্তির পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, শব্দটির অর্থ, মন্ত্রের নিজস্ব বক্তব্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিবেচনা করা প্রয়োজন। 
 
ইত্যোম্
বাংলাদেশ অগ্নিবীর